বিনোদন
একটি কণ্ঠ, একটি গিটার, শরীরী ভঙ্গির এক নতুন ভাষা—আর তাতেই বদলে গিয়েছিল জনপ্রিয় সংগীতের পৃথিবী। তিনি এলভিস প্রিসলি। কেউ তাঁকে শুধু গায়ক বলেছেন, কেউ অভিনেতা; কিন্তু কোটি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘দ্য কিং’—রক অ্যান্ড রোলের রাজা। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪২ বছর বয়সে তাঁর জীবন থেমে যায়। আজ, ১৬ আগস্ট, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে চার দশকেরও বেশি সময় পরও বিশ্বজুড়ে ফিরে ফিরে আসে সেই প্রশ্ন—এলভিস কি সত্যিই চলে গেছেন? নাকি তাঁর গানেই তিনি এখনও বেঁচে আছেন?
দরিদ্র ঘর থেকে কিংবদন্তির পথে
১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির টুপেলোতে জন্ম এলভিস অ্যারন প্রিসলির। তাঁর শৈশবে ছিল না সচ্ছলতার গল্প। পরিবার পরে মেমফিসে চলে যায়। সেখানেই ধীরে ধীরে সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়।
১৯৪৬ সালে ১১তম জন্মদিনে পাওয়া একটি গিটার হয়ে ওঠে তাঁর ভবিষ্যতের সঙ্গী। কৈশোর পেরিয়ে তিনি যখন সংগীতের জগতে পা রাখছেন, তখন তাঁর চারপাশে ছিল গসপেল, কান্ট্রি ও আফ্রিকান-আমেরিকান রিদম অ্যান্ড ব্লুজের প্রবল প্রভাব।
১৯৫৪ সালে সান রেকর্ডসে রেকর্ড করেন ‘That's All Right’। গানটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
যে তরুণ মঞ্চে উঠেই ঝড় তুলেছিলেন
পঞ্চাশের দশকে এলভিসের মঞ্চ পরিবেশনা ছিল তৎকালীন আমেরিকার জন্য প্রায় বিস্ফোরণের মতো। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শরীরী নাচ, অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস এবং এমন এক যৌন আবেদন, যা তাঁকে রাতারাতি তরুণ প্রজন্মের আইডলে পরিণত করে।
তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত বাড়ছিল, তেমনি তৈরি হচ্ছিল বিতর্কও। সমালোচকেরা তাঁর নাচ ও পরিবেশনাকে অশালীন বলে আক্রমণ করেন। টেলিভিশনে তাঁকে কখনও কখনও কোমরের নিচ থেকে না দেখানোর মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা যেন জনপ্রিয়তাকেই আরও বাড়িয়ে দেয়।
১৯৫৬ সালে ‘Heartbreak Hotel’ হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম গোল্ড রেকর্ড। একই বছর হলিউডেও অভিষেক ঘটে ‘Love Me Tender’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে তিনি ৩১টি ফিচার ফিল্ম ও দুটি কনসার্ট ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেন।
খ্যাতি, অর্থ আর ‘গ্রেসল্যান্ড’
এলভিসের সাফল্য শুধু গানের চার্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। পোশাক, চুলের স্টাইল, নাচ, গাড়ি—সবকিছুই অনুসরণ করতে শুরু করে পৃথিবীজুড়ে তরুণ প্রজন্ম।
১৯৫৭ সালে তিনি মেমফিসে কিনেছিলেন তাঁর বিখ্যাত বাড়ি গ্রেসল্যান্ড। বাড়িটি পরবর্তীতে শুধু একটি বাসভবন নয়, এলভিস-ভক্তদের কাছে এক ধরনের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
সেনাবাহিনী থেকে হলিউড
১৯৫৮ সালে এলভিস যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিশ্বখ্যাত তারকা হয়েও তিনি সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আবার শুরু করেন সংগীত ও চলচ্চিত্রের কাজ।
ষাটের দশকে তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ‘Blue Hawaii’, ‘Viva Las Vegas’-সহ একাধিক সিনেমা বক্স অফিসে সাফল্য পায়। কিন্তু একই সময়ে তাঁর সংগীতজীবনে কিছুটা স্থবিরতাও দেখা দেয়। ব্রিটিশ ব্যান্ডগুলোর উত্থান, বিশেষ করে বিটলস-নেতৃত্বাধীন ‘ব্রিটিশ ইনভেশন’, জনপ্রিয় সংগীতের চিত্র বদলে দেয়।
ব্যক্তিজীবনে প্রেম, বিয়ে ও বিচ্ছেদ
এলভিসের ব্যক্তিজীবনও ছিল তাঁর তারকা জীবনের মতোই আলোচিত।
প্রিসিলা বোলিয়ুকে তিনি বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১ মে লাস ভেগাসের আলাদিন হোটেলে। পরের বছর তাঁদের একমাত্র সন্তান লিসা মেরি প্রিসলি জন্ম নেন।
কিন্তু তারকাখ্যাতির আলো ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকারকে ঢেকে রাখতে পারেনি। এলভিস ও প্রিসিলার দাম্পত্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ১৯৭৩ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবে বিচ্ছেদের পরও মেয়ের সঙ্গে এলভিসের সম্পর্ক তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ছিল।
‘৬৮ কামব্যাক’—মঞ্চে রাজার প্রত্যাবর্তন
ষাটের দশকের শেষদিকে এলভিস যেন নিজেকেই আবার খুঁজে পান। ১৯৬৮ সালের টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠান ‘Elvis’-এর মাধ্যমে তাঁর শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ঘটে। কালো চামড়ার পোশাকে সেই পারফরম্যান্স আজও সংগীত ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
এরপর শুরু হয় তাঁর লাস ভেগাস অধ্যায়। বিশাল মঞ্চ, ঝলমলে পোশাক, ব্যান্ড ও অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে আবারও শীর্ষে নিয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি Grammy Lifetime Achievement Award লাভ করেন। জীবদ্দশায় ১৪টি গ্র্যামি মনোনয়নের মধ্যে তিনটি পুরস্কার জেতেন—সবগুলোই গসপেল সংগীতের জন্য।
সাফল্যের আড়ালে জমতে থাকে অন্ধকার
কিন্তু বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে তখন এলভিসের জীবন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল।
শারীরিক অসুস্থতা, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ এবং প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতার অভিযোগ তাঁর শেষ বছরগুলোকে ঘিরে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। মঞ্চে তাঁর শেষ দিকের কিছু পরিবেশনাও তাঁর আগের প্রাণশক্তির সঙ্গে তুলনা করে সমালোচিত হয়েছিল।
তাঁর দীর্ঘদিনের ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কার-কে ঘিরেও নানা বিতর্ক ছিল। এলভিসের ক্যারিয়ারকে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দিতে পার্কারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, আবার তাঁদের সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা হয়েছে।
এলভিসের জীবন তাই কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এটি খ্যাতির মূল্য নিয়েও একটি কঠিন প্রশ্ন।
শেষ দিন: যে সফর আর শুরু হয়নি
১৯৭৭ সালের আগস্টে এলভিসের আরও কনসার্ট করার কথা ছিল। ১৭ আগস্ট মেইনের পোর্টল্যান্ডে তাঁর অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেই সফর আর শুরু হয়নি।
১৬ আগস্ট সকালে গ্রেসল্যান্ডে নিজের কক্ষে বিশ্রামে যান তিনি। পরে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। বিকেলের আগেই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই অবিশ্বাস্য খবর—এলভিস প্রিসলি আর নেই।
গ্রেসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪২ বছর এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ব্যর্থতা উল্লেখ করা হয়। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে পরবর্তী দশকগুলোতে নানা প্রশ্ন, তত্ত্ব ও বিতর্কও তৈরি হয়েছে; তবে সরকারি নথি ও ঐতিহাসিক বিবরণে হৃদ্যন্ত্র-সংক্রান্ত কারণই প্রধানভাবে উঠে আসে।
মৃত্যু থামাতে পারেনি এলভিসকে
এলভিসের মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর কিংবদন্তি আরও বড় হয়েছে।
গ্রেসল্যান্ড আজও এলভিসের স্মৃতির অন্যতম কেন্দ্র। তাঁর গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গেয়েছেন, নতুনভাবে রিমিক্স হয়েছে তাঁর পুরোনো গান, তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ও অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র।
তিনি রক অ্যান্ড রোল, কান্ট্রি ও গসপেল—তিন ভিন্ন সংগীত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতির অংশ হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি Country Music Hall of Fame এবং ২০০১ সালে Gospel Music Hall of Fame-এ অন্তর্ভুক্ত হন। ফলে রক, কান্ট্রি ও গসপেল—তিন ক্ষেত্রেই হল অব ফেমে জায়গা পাওয়া প্রথম শিল্পী হিসেবে তাঁর অনন্য অবস্থান তৈরি হয়।
‘দ্য কিং’ কি সত্যিই মারা গেছেন?
৪২ বছরের জীবন খুব ছোট। কিন্তু কিছু মানুষ বয়স দিয়ে নয়, প্রভাব দিয়ে সময়কে মাপেন। এলভিস প্রিসলি ছিলেন তেমনই একজন।
তিনি সংগীতের পুরোনো দেয়াল ভেঙেছিলেন। মঞ্চে নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। তরুণদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। একই সঙ্গে খ্যাতির উন্মাদনা, ব্যক্তিগত ভাঙন ও আত্মসংগ্রামের মূল্যও দিয়েছেন।
আজ ১৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর ৪৯ বছর পূর্ণ হলো। তবু পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো বাজছে ‘Can't Help Falling in Love’, ‘Suspicious Minds’, ‘Jailhouse Rock’ কিংবা ‘Love Me Tender’।
মানুষ চলে যায়। মঞ্চ একদিন নিস্তব্ধ হয়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময়ের ক্যালেন্ডার মানে না। এলভিস প্রিসলি তেমনই এক কণ্ঠ।
2.png)
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
একটি কণ্ঠ, একটি গিটার, শরীরী ভঙ্গির এক নতুন ভাষা—আর তাতেই বদলে গিয়েছিল জনপ্রিয় সংগীতের পৃথিবী। তিনি এলভিস প্রিসলি। কেউ তাঁকে শুধু গায়ক বলেছেন, কেউ অভিনেতা; কিন্তু কোটি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘দ্য কিং’—রক অ্যান্ড রোলের রাজা। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪২ বছর বয়সে তাঁর জীবন থেমে যায়। আজ, ১৬ আগস্ট, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে চার দশকেরও বেশি সময় পরও বিশ্বজুড়ে ফিরে ফিরে আসে সেই প্রশ্ন—এলভিস কি সত্যিই চলে গেছেন? নাকি তাঁর গানেই তিনি এখনও বেঁচে আছেন?
দরিদ্র ঘর থেকে কিংবদন্তির পথে
১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির টুপেলোতে জন্ম এলভিস অ্যারন প্রিসলির। তাঁর শৈশবে ছিল না সচ্ছলতার গল্প। পরিবার পরে মেমফিসে চলে যায়। সেখানেই ধীরে ধীরে সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়।
১৯৪৬ সালে ১১তম জন্মদিনে পাওয়া একটি গিটার হয়ে ওঠে তাঁর ভবিষ্যতের সঙ্গী। কৈশোর পেরিয়ে তিনি যখন সংগীতের জগতে পা রাখছেন, তখন তাঁর চারপাশে ছিল গসপেল, কান্ট্রি ও আফ্রিকান-আমেরিকান রিদম অ্যান্ড ব্লুজের প্রবল প্রভাব।
১৯৫৪ সালে সান রেকর্ডসে রেকর্ড করেন ‘That's All Right’। গানটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
যে তরুণ মঞ্চে উঠেই ঝড় তুলেছিলেন
পঞ্চাশের দশকে এলভিসের মঞ্চ পরিবেশনা ছিল তৎকালীন আমেরিকার জন্য প্রায় বিস্ফোরণের মতো। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শরীরী নাচ, অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস এবং এমন এক যৌন আবেদন, যা তাঁকে রাতারাতি তরুণ প্রজন্মের আইডলে পরিণত করে।
তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত বাড়ছিল, তেমনি তৈরি হচ্ছিল বিতর্কও। সমালোচকেরা তাঁর নাচ ও পরিবেশনাকে অশালীন বলে আক্রমণ করেন। টেলিভিশনে তাঁকে কখনও কখনও কোমরের নিচ থেকে না দেখানোর মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা যেন জনপ্রিয়তাকেই আরও বাড়িয়ে দেয়।
১৯৫৬ সালে ‘Heartbreak Hotel’ হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম গোল্ড রেকর্ড। একই বছর হলিউডেও অভিষেক ঘটে ‘Love Me Tender’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে তিনি ৩১টি ফিচার ফিল্ম ও দুটি কনসার্ট ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেন।
খ্যাতি, অর্থ আর ‘গ্রেসল্যান্ড’
এলভিসের সাফল্য শুধু গানের চার্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। পোশাক, চুলের স্টাইল, নাচ, গাড়ি—সবকিছুই অনুসরণ করতে শুরু করে পৃথিবীজুড়ে তরুণ প্রজন্ম।
১৯৫৭ সালে তিনি মেমফিসে কিনেছিলেন তাঁর বিখ্যাত বাড়ি গ্রেসল্যান্ড। বাড়িটি পরবর্তীতে শুধু একটি বাসভবন নয়, এলভিস-ভক্তদের কাছে এক ধরনের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
সেনাবাহিনী থেকে হলিউড
১৯৫৮ সালে এলভিস যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিশ্বখ্যাত তারকা হয়েও তিনি সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আবার শুরু করেন সংগীত ও চলচ্চিত্রের কাজ।
ষাটের দশকে তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ‘Blue Hawaii’, ‘Viva Las Vegas’-সহ একাধিক সিনেমা বক্স অফিসে সাফল্য পায়। কিন্তু একই সময়ে তাঁর সংগীতজীবনে কিছুটা স্থবিরতাও দেখা দেয়। ব্রিটিশ ব্যান্ডগুলোর উত্থান, বিশেষ করে বিটলস-নেতৃত্বাধীন ‘ব্রিটিশ ইনভেশন’, জনপ্রিয় সংগীতের চিত্র বদলে দেয়।
ব্যক্তিজীবনে প্রেম, বিয়ে ও বিচ্ছেদ
এলভিসের ব্যক্তিজীবনও ছিল তাঁর তারকা জীবনের মতোই আলোচিত।
প্রিসিলা বোলিয়ুকে তিনি বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১ মে লাস ভেগাসের আলাদিন হোটেলে। পরের বছর তাঁদের একমাত্র সন্তান লিসা মেরি প্রিসলি জন্ম নেন।
কিন্তু তারকাখ্যাতির আলো ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকারকে ঢেকে রাখতে পারেনি। এলভিস ও প্রিসিলার দাম্পত্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ১৯৭৩ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবে বিচ্ছেদের পরও মেয়ের সঙ্গে এলভিসের সম্পর্ক তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ছিল।
‘৬৮ কামব্যাক’—মঞ্চে রাজার প্রত্যাবর্তন
ষাটের দশকের শেষদিকে এলভিস যেন নিজেকেই আবার খুঁজে পান। ১৯৬৮ সালের টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠান ‘Elvis’-এর মাধ্যমে তাঁর শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ঘটে। কালো চামড়ার পোশাকে সেই পারফরম্যান্স আজও সংগীত ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
এরপর শুরু হয় তাঁর লাস ভেগাস অধ্যায়। বিশাল মঞ্চ, ঝলমলে পোশাক, ব্যান্ড ও অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে আবারও শীর্ষে নিয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি Grammy Lifetime Achievement Award লাভ করেন। জীবদ্দশায় ১৪টি গ্র্যামি মনোনয়নের মধ্যে তিনটি পুরস্কার জেতেন—সবগুলোই গসপেল সংগীতের জন্য।
সাফল্যের আড়ালে জমতে থাকে অন্ধকার
কিন্তু বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে তখন এলভিসের জীবন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল।
শারীরিক অসুস্থতা, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ এবং প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতার অভিযোগ তাঁর শেষ বছরগুলোকে ঘিরে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। মঞ্চে তাঁর শেষ দিকের কিছু পরিবেশনাও তাঁর আগের প্রাণশক্তির সঙ্গে তুলনা করে সমালোচিত হয়েছিল।
তাঁর দীর্ঘদিনের ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কার-কে ঘিরেও নানা বিতর্ক ছিল। এলভিসের ক্যারিয়ারকে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দিতে পার্কারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, আবার তাঁদের সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা হয়েছে।
এলভিসের জীবন তাই কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এটি খ্যাতির মূল্য নিয়েও একটি কঠিন প্রশ্ন।
শেষ দিন: যে সফর আর শুরু হয়নি
১৯৭৭ সালের আগস্টে এলভিসের আরও কনসার্ট করার কথা ছিল। ১৭ আগস্ট মেইনের পোর্টল্যান্ডে তাঁর অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেই সফর আর শুরু হয়নি।
১৬ আগস্ট সকালে গ্রেসল্যান্ডে নিজের কক্ষে বিশ্রামে যান তিনি। পরে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। বিকেলের আগেই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই অবিশ্বাস্য খবর—এলভিস প্রিসলি আর নেই।
গ্রেসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪২ বছর এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ব্যর্থতা উল্লেখ করা হয়। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে পরবর্তী দশকগুলোতে নানা প্রশ্ন, তত্ত্ব ও বিতর্কও তৈরি হয়েছে; তবে সরকারি নথি ও ঐতিহাসিক বিবরণে হৃদ্যন্ত্র-সংক্রান্ত কারণই প্রধানভাবে উঠে আসে।
মৃত্যু থামাতে পারেনি এলভিসকে
এলভিসের মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর কিংবদন্তি আরও বড় হয়েছে।
গ্রেসল্যান্ড আজও এলভিসের স্মৃতির অন্যতম কেন্দ্র। তাঁর গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গেয়েছেন, নতুনভাবে রিমিক্স হয়েছে তাঁর পুরোনো গান, তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ও অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র।
তিনি রক অ্যান্ড রোল, কান্ট্রি ও গসপেল—তিন ভিন্ন সংগীত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতির অংশ হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি Country Music Hall of Fame এবং ২০০১ সালে Gospel Music Hall of Fame-এ অন্তর্ভুক্ত হন। ফলে রক, কান্ট্রি ও গসপেল—তিন ক্ষেত্রেই হল অব ফেমে জায়গা পাওয়া প্রথম শিল্পী হিসেবে তাঁর অনন্য অবস্থান তৈরি হয়।
‘দ্য কিং’ কি সত্যিই মারা গেছেন?
৪২ বছরের জীবন খুব ছোট। কিন্তু কিছু মানুষ বয়স দিয়ে নয়, প্রভাব দিয়ে সময়কে মাপেন। এলভিস প্রিসলি ছিলেন তেমনই একজন।
তিনি সংগীতের পুরোনো দেয়াল ভেঙেছিলেন। মঞ্চে নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। তরুণদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। একই সঙ্গে খ্যাতির উন্মাদনা, ব্যক্তিগত ভাঙন ও আত্মসংগ্রামের মূল্যও দিয়েছেন।
আজ ১৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর ৪৯ বছর পূর্ণ হলো। তবু পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো বাজছে ‘Can't Help Falling in Love’, ‘Suspicious Minds’, ‘Jailhouse Rock’ কিংবা ‘Love Me Tender’।
মানুষ চলে যায়। মঞ্চ একদিন নিস্তব্ধ হয়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময়ের ক্যালেন্ডার মানে না। এলভিস প্রিসলি তেমনই এক কণ্ঠ।
2.png)