লাইফ স্টাইল
‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’—নামটা শুনতে যেমন নিরীহ, এর ভেতরের বাস্তবতা ততটাই জটিল। অনেকটা স্যান্ডউইচের সেই স্লাইসড পাউরুটির মাঝে থাকা মাংসের টুকরোটির মতো অবস্থা এই প্রজন্মের মানুষের। একদিকে বার্ধক্যের জাঁতাকলে পিষ্ট বাবা-মা, অন্যদিকে বেড়ে ওঠা সন্তানদের অশেষ চাহিদা। আর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই জাঁতাকল সামলাচ্ছেন মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষ। তারা যেন সংসারের সেই অদৃশ্য পিলার, যার ওপর ভর করেই টিকে আছে দুটি প্রজন্ম। কিন্তু এই দায়িত্বের চাপে তারা নিজেদের অস্তিত্বকে প্রায় ভুলতেই বসেছেন।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবার ভেঙে এখন নিউক্লিয়ার বা একক পরিবারে রূপান্তর এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। আগে দাদা-দাদি বা যৌথ পরিবারের অন্য সদস্যরা সন্তানদের দেখভাল করতেন কিংবা অসুস্থ বয়োজ্যেষ্ঠদের পাশে থাকতেন। এখন সেই দায়িত্বের পুরোটা এসে পড়েছে দম্পতিদের ওপর। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা একজন মানুষ যখন অফিসে কাজের চাপে পিষ্ট, ঠিক তখনই হয়তো ফোনের ওপারে হাসপাতাল থেকে আসছে বাবার অসুস্থতার খবর, আর এদিকে স্কুল থেকে এসে সন্তান জানতে চাচ্ছে বিকালের নাস্তার কথা। এই ‘মাল্টি-টাস্কিং’-এর রোলারকোস্টারে চড়তে চড়তে এই প্রজন্ম হারিয়ে ফেলছে নিজের মানসিক শান্তি।
স্যান্ডউইচ প্রজন্মের এই সংকটের সবচেয়ে বড় দিক হলো ‘সময় দারিদ্র্য’। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অফিস, সন্তানদের কোচিং, বাবা-মায়ের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সবকিছু সামলে নিজের জন্য একটি মুহূর্ত অবশিষ্ট থাকে না। মাসের শেষে বেতনের বড় একটা অংশ চিকিৎসা আর পড়াশোনার পেছনে খরচ করতে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে টান পড়ে। আর্থিক টানাপোড়েনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মানসিক ক্লান্তি। যাকে বলা হয় ‘কেয়ারগিভার বার্নআউট’। পরিবারের সবাই সবার প্রয়োজনে তাদের দিকে হাত বাড়ায়, কিন্তু এই মানুষটির ক্লান্ত কাঁধের ভার বোঝার মতো কেউ যেন পাশে নেই।
গবেষকরা বলছেন, স্যান্ডউইচ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে। দিনের পর দিন চাহিদা আর প্রত্যাশার চাপে তারা বিষণ্নতা, অনিদ্রা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তারা নিজের অজান্তেই ভুলে যাচ্ছেন ‘নিজের যত্ন নেওয়া’র কথা। পরিবারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়েও তারা যেন দিনশেষে একাকীত্বের সাগরে ডুবছেন।
তবে এই প্রজন্মের সংকটটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এখন সামাজিকও বটে। কর্মক্ষেত্রে নমনীয় কাজের সময় বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের যত্নে কমিউনিটি সেন্টারগুলোর অভাব এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্যান্ডউইচ প্রজন্মকে পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথাগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের শিক্ষা কিংবা বয়স্কদের যত্ন—এগুলো কেবল কোনো একক দম্পতির দায় নয়, এটি পরিবারের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কেয়ার গিভিং সুবিধা সম্প্রসারণ। নতুবা ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’ নামের এই অদৃশ্য বোঝাটি কেবল তাদের ক্যারিয়ার নয়, ধ্বংস করবে পুরো একটি পরিবারের মানসিক ভিত্তি।
SEO Meta Tags:
বিষয় : ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’
2.png)
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’—নামটা শুনতে যেমন নিরীহ, এর ভেতরের বাস্তবতা ততটাই জটিল। অনেকটা স্যান্ডউইচের সেই স্লাইসড পাউরুটির মাঝে থাকা মাংসের টুকরোটির মতো অবস্থা এই প্রজন্মের মানুষের। একদিকে বার্ধক্যের জাঁতাকলে পিষ্ট বাবা-মা, অন্যদিকে বেড়ে ওঠা সন্তানদের অশেষ চাহিদা। আর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই জাঁতাকল সামলাচ্ছেন মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষ। তারা যেন সংসারের সেই অদৃশ্য পিলার, যার ওপর ভর করেই টিকে আছে দুটি প্রজন্ম। কিন্তু এই দায়িত্বের চাপে তারা নিজেদের অস্তিত্বকে প্রায় ভুলতেই বসেছেন।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবার ভেঙে এখন নিউক্লিয়ার বা একক পরিবারে রূপান্তর এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। আগে দাদা-দাদি বা যৌথ পরিবারের অন্য সদস্যরা সন্তানদের দেখভাল করতেন কিংবা অসুস্থ বয়োজ্যেষ্ঠদের পাশে থাকতেন। এখন সেই দায়িত্বের পুরোটা এসে পড়েছে দম্পতিদের ওপর। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা একজন মানুষ যখন অফিসে কাজের চাপে পিষ্ট, ঠিক তখনই হয়তো ফোনের ওপারে হাসপাতাল থেকে আসছে বাবার অসুস্থতার খবর, আর এদিকে স্কুল থেকে এসে সন্তান জানতে চাচ্ছে বিকালের নাস্তার কথা। এই ‘মাল্টি-টাস্কিং’-এর রোলারকোস্টারে চড়তে চড়তে এই প্রজন্ম হারিয়ে ফেলছে নিজের মানসিক শান্তি।
স্যান্ডউইচ প্রজন্মের এই সংকটের সবচেয়ে বড় দিক হলো ‘সময় দারিদ্র্য’। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অফিস, সন্তানদের কোচিং, বাবা-মায়ের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সবকিছু সামলে নিজের জন্য একটি মুহূর্ত অবশিষ্ট থাকে না। মাসের শেষে বেতনের বড় একটা অংশ চিকিৎসা আর পড়াশোনার পেছনে খরচ করতে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে টান পড়ে। আর্থিক টানাপোড়েনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মানসিক ক্লান্তি। যাকে বলা হয় ‘কেয়ারগিভার বার্নআউট’। পরিবারের সবাই সবার প্রয়োজনে তাদের দিকে হাত বাড়ায়, কিন্তু এই মানুষটির ক্লান্ত কাঁধের ভার বোঝার মতো কেউ যেন পাশে নেই।
গবেষকরা বলছেন, স্যান্ডউইচ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে। দিনের পর দিন চাহিদা আর প্রত্যাশার চাপে তারা বিষণ্নতা, অনিদ্রা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তারা নিজের অজান্তেই ভুলে যাচ্ছেন ‘নিজের যত্ন নেওয়া’র কথা। পরিবারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়েও তারা যেন দিনশেষে একাকীত্বের সাগরে ডুবছেন।
তবে এই প্রজন্মের সংকটটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এখন সামাজিকও বটে। কর্মক্ষেত্রে নমনীয় কাজের সময় বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের যত্নে কমিউনিটি সেন্টারগুলোর অভাব এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্যান্ডউইচ প্রজন্মকে পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথাগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের শিক্ষা কিংবা বয়স্কদের যত্ন—এগুলো কেবল কোনো একক দম্পতির দায় নয়, এটি পরিবারের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কেয়ার গিভিং সুবিধা সম্প্রসারণ। নতুবা ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’ নামের এই অদৃশ্য বোঝাটি কেবল তাদের ক্যারিয়ার নয়, ধ্বংস করবে পুরো একটি পরিবারের মানসিক ভিত্তি।
SEO Meta Tags:
2.png)