সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

  বানিজ্য বানিজ্য

ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিতর্কিতরা: আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের পথে সরকার

সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে চূড়ান্ত হয়েছে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং প্রবল জনরোষের চাপে শেষ পর্যন্ত পিছু হটল অর্থ মন্ত্রণালয়।

ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিতর্কিতরা: আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের পথে সরকার
ছবি -সংগৃহীত

ব্যাংক খাত নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় সামাল দিতে অবশেষে নমনীয় হয়েছে সরকার। দেশের পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামি ব্যাংকের মালিকানায় বিতর্কিত ব্যবসায়ী বা পুরোনো পরিচালকদের ফিরে আসার যে পথ তৈরি হয়েছিল, তা বন্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে মূলত এস আলম গ্রুপের মতো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথ রুদ্ধ হতে চলেছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আইনটি সংসদে পাসের আগে শেষ মুহূর্তে যোগ করা এই ধারাটি ব্যাংক খাতের সংস্কারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ধারার আওতায় ব্যাংক রেজোল্যুশনের আগে যেসব শেয়ারধারী ছিলেন, তাঁরা চাইলেই আবেদন সাপেক্ষে ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নতুন করে বুঝে পাওয়ার সুযোগ পেতেন। মূলত এই আইনি ফাঁকফোকরের কারণেই এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে এই ধারা বাতিলের জোরালো দাবি উঠেছিল, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

এই ধারা বাতিলের পেছনে সরকারের সামনে দুটি বড় চাপ ছিল। একদিকে জনমতের প্রবল চাপ, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার শর্ত। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলে আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। মূলত আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যেই এই আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আনার তাগিদ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি।

এদিকে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী—এই পাঁচ ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশই এখন খেলাপি, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ফার্স্ট সিকিউরিটির মতো ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। এই ভঙ্গুর অবস্থার ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে হয়েছে। এমতাবস্থায় পুরোনো মালিকদের পুনর্বাসন করা হলে ব্যাংক খাত আবারও দুর্নীতি ও লুটপাটের দুষ্টচক্রে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

অর্থনীতিবিদরা এবং টিআইবির মতো সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এই ধারা বাতিলের পক্ষে কথা বলেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে সতর্কতার সঙ্গে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হওয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, কেবল বিদেশি সংস্থার শর্তে নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে এই বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করা অপরিহার্য ছিল। এখন দেখার বিষয়, বাজেট অধিবেশনে বা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সরকার কত দ্রুত এই সংশোধনটি কার্যকর করে এবং ব্যাংক খাতের হারানো শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কতটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারে।

 

বিষয় : ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল

ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিতর্কিতরা: আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের পথে সরকার
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬


ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিতর্কিতরা: আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের পথে সরকার

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

featured Image

ব্যাংক খাত নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় সামাল দিতে অবশেষে নমনীয় হয়েছে সরকার। দেশের পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামি ব্যাংকের মালিকানায় বিতর্কিত ব্যবসায়ী বা পুরোনো পরিচালকদের ফিরে আসার যে পথ তৈরি হয়েছিল, তা বন্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে মূলত এস আলম গ্রুপের মতো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথ রুদ্ধ হতে চলেছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আইনটি সংসদে পাসের আগে শেষ মুহূর্তে যোগ করা এই ধারাটি ব্যাংক খাতের সংস্কারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ধারার আওতায় ব্যাংক রেজোল্যুশনের আগে যেসব শেয়ারধারী ছিলেন, তাঁরা চাইলেই আবেদন সাপেক্ষে ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নতুন করে বুঝে পাওয়ার সুযোগ পেতেন। মূলত এই আইনি ফাঁকফোকরের কারণেই এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে এই ধারা বাতিলের জোরালো দাবি উঠেছিল, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

এই ধারা বাতিলের পেছনে সরকারের সামনে দুটি বড় চাপ ছিল। একদিকে জনমতের প্রবল চাপ, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার শর্ত। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলে আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। মূলত আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যেই এই আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আনার তাগিদ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি।

এদিকে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী—এই পাঁচ ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশই এখন খেলাপি, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ফার্স্ট সিকিউরিটির মতো ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। এই ভঙ্গুর অবস্থার ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে হয়েছে। এমতাবস্থায় পুরোনো মালিকদের পুনর্বাসন করা হলে ব্যাংক খাত আবারও দুর্নীতি ও লুটপাটের দুষ্টচক্রে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

অর্থনীতিবিদরা এবং টিআইবির মতো সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এই ধারা বাতিলের পক্ষে কথা বলেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে সতর্কতার সঙ্গে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হওয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, কেবল বিদেশি সংস্থার শর্তে নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে এই বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করা অপরিহার্য ছিল। এখন দেখার বিষয়, বাজেট অধিবেশনে বা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সরকার কত দ্রুত এই সংশোধনটি কার্যকর করে এবং ব্যাংক খাতের হারানো শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কতটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারে।

 


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত