সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

  বানিজ্য বানিজ্য

টেসলার দাপট শেষ, বৈদ্যুতিক গাড়ির সিংহাসনে এখন চীনের বিওয়াইডি

সাশ্রয়ী দাম ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতায় ইলন মাস্কের টেসলাকে পেছনে ফেলে বিশ্ববাজারে দাপট দেখাচ্ছে চীনা জায়ান্ট বিওয়াইডি। আধুনিক চিপ ও এআই প্রযুক্তিতে নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

টেসলার দাপট শেষ, বৈদ্যুতিক গাড়ির সিংহাসনে এখন চীনের বিওয়াইডি
ছবি -সংগৃহীত

অটোমোবাইল শিল্পের গত একশো বছরের ইতিহাস উল্টে দিয়ে বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি। জার্মানি, জাপান এবং আমেরিকার দীর্ঘদিনের দাপটকে ম্লান করে ইলন মাস্কের টেসলাকে সিংহাসনচ্যুত করেছে এই চীনা জায়ান্ট। কেবল সাশ্রয়ী গাড়ি নির্মাণেই নয়, চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতেও প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন বিশ্বশক্তি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বার্ষিক বিক্রির হিসাবে টেসলাকে পেছনে ফেলে বিওয়াইডি এখন বিশ্বের এক নম্বর বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা। এক বছরে টেসলার বিক্রি যেখানে ৯ শতাংশ কমেছে, সেখানে বিওয়াইডির ব্যাটারিচালিত গাড়ির বিক্রি ২৮ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।

মূলত টেসলার আভিজাত্য বনাম বিওয়াইডির সাশ্রয়ী মূল্যের লড়াইয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি ক্রমশ বাজার হারাচ্ছে। টেসলার একটি গাড়ির গড় মূল্য যেখানে ৪৫ হাজার ডলার, সেখানে বিওয়াইডির গড় মূল্য মাত্র ২২ হাজার ৪০০ ডলার। বিশেষ করে মাত্র ১০ হাজার ডলারের ‘সিগাল’ মডেলটি এখন বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে বড় এক আতঙ্কের নাম। যুক্তরাজ্যের বাজারেও গত এক বছরে বিওয়াইডির বিক্রি বেড়েছে ৮৮০ শতাংশ। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের মতে, বারবার দাম কমিয়েও টেসলা আর বাজার ধরে রাখতে পারছে না।

বিওয়াইডির এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের ‘ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন’ বা স্বনির্ভর কৌশল। জনপ্রিয় ‘সিল’ মডেলের ৭৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ প্রতিষ্ঠানটি নিজের কারখানায় তৈরি করে। চিপসেট থেকে শুরু করে গাড়ির সিট ও ব্যাটারি—সবই তারা নিজেরা তৈরি করায় করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকটেও তাদের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিওয়াইডি বাজারে এনেছে অত্যাধুনিক ব্লেড ব্যাটারি। এছাড়া, তাদের ফ্ল্যাশ চার্জিং সিস্টেমের মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিট চার্জেই ৪০০ কিলোমিটার পথ চলা সম্ভব। বিশ্বজুড়ে গাড়ি পৌঁছে দিতে ‘বিওয়াইডি এক্সপ্লোরার ১’-এর মতো নিজস্ব কার্গো জাহাজও তৈরি করেছে তারা, যা পরিবহন খরচ বিপুল পরিমাণে কমিয়ে এনেছে।

টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক যখন জাঁকজমকপূর্ণ জীবন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত, তখন বিওয়াইডির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং চুয়ানফু চলেন একেবারেই প্রচারের আড়ালে। ব্লুমবার্গ তাঁকে ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ১৯৯৫ সালে মাত্র ৩ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করা চুয়ানফু আজও কারখানার সাধারণ ক্যানটিনে কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খান। ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে বিওয়াইডির গাড়ি দেখে মাস্ক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেও, আজ সেই মিতব্যয়ী প্রকৌশলীর কাছেই বাজার হারিয়েছে টেসলা।

লন্ডনের ডাবল-ডেকার বাস থেকে শুরু করে মেক্সিকো সিটি, হংকং কিংবা নয়াদিল্লির ট্যাক্সি—সবখানেই এখন বিওয়াইডির শক্তিশালী উপস্থিতি। এই অগ্রযাত্রা রুখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনা ইভির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে বিওয়াইডি এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতেই বেশি মনোযোগী।

এই বাণিজ্য যুদ্ধের পেছনে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর প্রশ্নও। পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, ডজনখানেক ক্যামেরা, রাডার ও সেন্সরযুক্ত এই আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়িগুলো আসলে চাকার ওপর একেকটি স্মার্টফোন। এগুলো মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ডেটা ও চালকদের কথোপকথন রেকর্ড করে বেইজিংয়ের কাছে পাঠাতে পারে এবং দূর থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাড়িগুলো অকেজো করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির করে দেওয়া সম্ভব।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিওয়াইডির প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘ইয়াংওয়াং ইউ-এইট’ গাড়িটি জরুরি অবস্থায় পানির ওপর নৌকার মতো ভাসতে পারে এবং এক জায়গায় দাঁড়িয়েই ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম। এর ছাদে রয়েছে ড্রোন স্টেশন। ২০২৭ সালের মধ্যেই পুরোপুরি চালকহীন গাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়তে কারিগরিভাবে প্রস্তুত বিওয়াইডি; এখন কেবল চীন সরকারের আইনি অনুমোদনের অপেক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আভিজাত্যের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসাই বিওয়াইডিকে বৈশ্বিক পরিবহন বিপ্লবের মূল কারিগরে পরিণত করছে।

বিষয় : টেসলা বিওয়াইডি

টেসলার দাপট শেষ, বৈদ্যুতিক গাড়ির সিংহাসনে এখন চীনের বিওয়াইডি
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


টেসলার দাপট শেষ, বৈদ্যুতিক গাড়ির সিংহাসনে এখন চীনের বিওয়াইডি

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

অটোমোবাইল শিল্পের গত একশো বছরের ইতিহাস উল্টে দিয়ে বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি। জার্মানি, জাপান এবং আমেরিকার দীর্ঘদিনের দাপটকে ম্লান করে ইলন মাস্কের টেসলাকে সিংহাসনচ্যুত করেছে এই চীনা জায়ান্ট। কেবল সাশ্রয়ী গাড়ি নির্মাণেই নয়, চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতেও প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন বিশ্বশক্তি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বার্ষিক বিক্রির হিসাবে টেসলাকে পেছনে ফেলে বিওয়াইডি এখন বিশ্বের এক নম্বর বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা। এক বছরে টেসলার বিক্রি যেখানে ৯ শতাংশ কমেছে, সেখানে বিওয়াইডির ব্যাটারিচালিত গাড়ির বিক্রি ২৮ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।

মূলত টেসলার আভিজাত্য বনাম বিওয়াইডির সাশ্রয়ী মূল্যের লড়াইয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি ক্রমশ বাজার হারাচ্ছে। টেসলার একটি গাড়ির গড় মূল্য যেখানে ৪৫ হাজার ডলার, সেখানে বিওয়াইডির গড় মূল্য মাত্র ২২ হাজার ৪০০ ডলার। বিশেষ করে মাত্র ১০ হাজার ডলারের ‘সিগাল’ মডেলটি এখন বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে বড় এক আতঙ্কের নাম। যুক্তরাজ্যের বাজারেও গত এক বছরে বিওয়াইডির বিক্রি বেড়েছে ৮৮০ শতাংশ। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের মতে, বারবার দাম কমিয়েও টেসলা আর বাজার ধরে রাখতে পারছে না।

বিওয়াইডির এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের ‘ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন’ বা স্বনির্ভর কৌশল। জনপ্রিয় ‘সিল’ মডেলের ৭৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ প্রতিষ্ঠানটি নিজের কারখানায় তৈরি করে। চিপসেট থেকে শুরু করে গাড়ির সিট ও ব্যাটারি—সবই তারা নিজেরা তৈরি করায় করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকটেও তাদের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিওয়াইডি বাজারে এনেছে অত্যাধুনিক ব্লেড ব্যাটারি। এছাড়া, তাদের ফ্ল্যাশ চার্জিং সিস্টেমের মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিট চার্জেই ৪০০ কিলোমিটার পথ চলা সম্ভব। বিশ্বজুড়ে গাড়ি পৌঁছে দিতে ‘বিওয়াইডি এক্সপ্লোরার ১’-এর মতো নিজস্ব কার্গো জাহাজও তৈরি করেছে তারা, যা পরিবহন খরচ বিপুল পরিমাণে কমিয়ে এনেছে।

টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক যখন জাঁকজমকপূর্ণ জীবন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত, তখন বিওয়াইডির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং চুয়ানফু চলেন একেবারেই প্রচারের আড়ালে। ব্লুমবার্গ তাঁকে ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ১৯৯৫ সালে মাত্র ৩ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করা চুয়ানফু আজও কারখানার সাধারণ ক্যানটিনে কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খান। ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে বিওয়াইডির গাড়ি দেখে মাস্ক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেও, আজ সেই মিতব্যয়ী প্রকৌশলীর কাছেই বাজার হারিয়েছে টেসলা।

লন্ডনের ডাবল-ডেকার বাস থেকে শুরু করে মেক্সিকো সিটি, হংকং কিংবা নয়াদিল্লির ট্যাক্সি—সবখানেই এখন বিওয়াইডির শক্তিশালী উপস্থিতি। এই অগ্রযাত্রা রুখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনা ইভির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে বিওয়াইডি এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতেই বেশি মনোযোগী।

এই বাণিজ্য যুদ্ধের পেছনে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর প্রশ্নও। পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, ডজনখানেক ক্যামেরা, রাডার ও সেন্সরযুক্ত এই আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়িগুলো আসলে চাকার ওপর একেকটি স্মার্টফোন। এগুলো মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ডেটা ও চালকদের কথোপকথন রেকর্ড করে বেইজিংয়ের কাছে পাঠাতে পারে এবং দূর থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাড়িগুলো অকেজো করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির করে দেওয়া সম্ভব।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিওয়াইডির প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘ইয়াংওয়াং ইউ-এইট’ গাড়িটি জরুরি অবস্থায় পানির ওপর নৌকার মতো ভাসতে পারে এবং এক জায়গায় দাঁড়িয়েই ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম। এর ছাদে রয়েছে ড্রোন স্টেশন। ২০২৭ সালের মধ্যেই পুরোপুরি চালকহীন গাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়তে কারিগরিভাবে প্রস্তুত বিওয়াইডি; এখন কেবল চীন সরকারের আইনি অনুমোদনের অপেক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আভিজাত্যের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসাই বিওয়াইডিকে বৈশ্বিক পরিবহন বিপ্লবের মূল কারিগরে পরিণত করছে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত