আন্তর্জাতিক
বুদাপেস্টের সেই গোপন আড্ডা
২০২৪ সালের শুরুর দিকে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরকে সরকারের শীর্ষ এক কর্মকর্তার কাছ থেকে অদ্ভুত এক ফোন এলো। বলা হলো, জলবায়ু সম্মেলনের আড়ালে আসলে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সাথে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের গোপন বৈঠকের আয়োজন করতে হবে।
আসলে, ওই সম্মেলনটি ছিল কেবলই চোখের আড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি পরে স্বীকার করেছেন, তিনি জানতেন এটি তার সুনাম নষ্ট করতে পারে। কিন্তু এক পক্ষ যদি আরেক পক্ষের সাথে কথা বলতে চায়, তবে সেই সুযোগ করে দেওয়া ভালো—এই ভেবেই তিনি রাজি হয়েছিলেন। ঘটনাটি প্রমাণ করে, রাজনীতির পর্দার আড়ালে কত কীই না ঘটে!
ইসরায়েলের এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল সহজ—ইরানে শাসন ব্যবস্থা বদলে দেওয়া এবং আহমাদিনেজাদকে নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইমান একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় খুবই ব্যতিক্রমধর্মী ধারাবাহিক কয়েকটি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল। আহমাদিনেজাদও সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ ছিলেন।"
সোজা কথায়, দুই দেশ এক ছাদের নিচে থাকলেও ইসরায়েল চেয়েছিল নিজেদের হাতের পুতুল বসিয়ে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যে ব্যক্তি একসময় ইসরায়েলের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি কেন তাদের সাথে হাত মেলাবেন? একটু ইতিহাসে চোখ বুলালেই দেখা যায়, ক্ষমতার স্বাদ একবার পেলে মানুষ তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে দ্বিধা করে না।
আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা শুধু অর্থের জোগানই দেয়নি, বিদেশে তার সফরসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষার খরচও বহন করেছে। এমনকী ২০২৪ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দাপ্রধান ডেভিড বারনিয়া নিজে বুদাপেস্টে গিয়ে আহমাদিনেজাদের সাথে বৈঠক করেছিলেন। আহমাদিনেজাদের সাবেক সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি বলেন, "তিনি অর্থের জন্য এসব করবেন না। তিনি এটা ক্ষমতার জন্য করছেন, কারণ তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান।"
এখানেই আসল বিষয়টি চোখে পড়ে—রাজনীতিতে বন্ধু আর শত্রুর পার্থক্যটা মাঝে মাঝে বড় বেশি ঝাপসা হয়ে যায়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের হামলার সময় আহমাদিনেজাদকে তেহরান থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি দুঃসাহসিক অভিযান চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে নতুন সরকারের পরিকল্পনা শুরু করা। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
আহমাদিনেজাদ যখন আইআরজিসির নজরদারির বাইরে চলে যান, তখন ইরানের গোয়েন্দারা তার এই গোপন যোগাযোগের জাল ধরে ফেলেন। চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্যমতে, ইসরায়েলের সাথে তার এই মাখামাখি এখন আর গোপন নেই। ফলে এখন তাকে থাকতে হচ্ছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার কড়া নজরদারিতে, একপ্রকার গৃহবন্দী হয়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যে ক্ষমতার লোভে তিনি পুরনো মিত্রদের ছেড়ে নতুন শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছিলেন, দিনশেষে সেই ক্ষমতাই তাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক্ষমতার লড়াই কি মানুষকে এতটাই মরিয়া করে তোলে যে চিরশত্রুর সাথেও হাত মেলাতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো বইতে নেই, আছে কেবল রাজনীতির জটিল সমীকরণে। যে আহমাদিনেজাদ একসময় ইরানকে এক অন্য উচ্চতায় নিতে চেয়েছিলেন, আজ তিনি নিজেই এক রহস্যময় ইতিহাসের ভুক্তভোগী। এই ঘটনার রেশ কোথায় গিয়ে থামবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই জুয়াখেলায় শেষ পর্যন্ত হেরেছেন আহমাদিনেজাদ নিজেই।
বিষয় : মোসাদ্দেক ইরান,ইসরায়েল আহমাদিনেজাদ
2.png)
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
বুদাপেস্টের সেই গোপন আড্ডা
২০২৪ সালের শুরুর দিকে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরকে সরকারের শীর্ষ এক কর্মকর্তার কাছ থেকে অদ্ভুত এক ফোন এলো। বলা হলো, জলবায়ু সম্মেলনের আড়ালে আসলে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সাথে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের গোপন বৈঠকের আয়োজন করতে হবে।
আসলে, ওই সম্মেলনটি ছিল কেবলই চোখের আড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি পরে স্বীকার করেছেন, তিনি জানতেন এটি তার সুনাম নষ্ট করতে পারে। কিন্তু এক পক্ষ যদি আরেক পক্ষের সাথে কথা বলতে চায়, তবে সেই সুযোগ করে দেওয়া ভালো—এই ভেবেই তিনি রাজি হয়েছিলেন। ঘটনাটি প্রমাণ করে, রাজনীতির পর্দার আড়ালে কত কীই না ঘটে!
ইসরায়েলের এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল সহজ—ইরানে শাসন ব্যবস্থা বদলে দেওয়া এবং আহমাদিনেজাদকে নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইমান একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় খুবই ব্যতিক্রমধর্মী ধারাবাহিক কয়েকটি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল। আহমাদিনেজাদও সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ ছিলেন।"
সোজা কথায়, দুই দেশ এক ছাদের নিচে থাকলেও ইসরায়েল চেয়েছিল নিজেদের হাতের পুতুল বসিয়ে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যে ব্যক্তি একসময় ইসরায়েলের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি কেন তাদের সাথে হাত মেলাবেন? একটু ইতিহাসে চোখ বুলালেই দেখা যায়, ক্ষমতার স্বাদ একবার পেলে মানুষ তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে দ্বিধা করে না।
আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা শুধু অর্থের জোগানই দেয়নি, বিদেশে তার সফরসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষার খরচও বহন করেছে। এমনকী ২০২৪ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দাপ্রধান ডেভিড বারনিয়া নিজে বুদাপেস্টে গিয়ে আহমাদিনেজাদের সাথে বৈঠক করেছিলেন। আহমাদিনেজাদের সাবেক সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি বলেন, "তিনি অর্থের জন্য এসব করবেন না। তিনি এটা ক্ষমতার জন্য করছেন, কারণ তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান।"
এখানেই আসল বিষয়টি চোখে পড়ে—রাজনীতিতে বন্ধু আর শত্রুর পার্থক্যটা মাঝে মাঝে বড় বেশি ঝাপসা হয়ে যায়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের হামলার সময় আহমাদিনেজাদকে তেহরান থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি দুঃসাহসিক অভিযান চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে নতুন সরকারের পরিকল্পনা শুরু করা। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
আহমাদিনেজাদ যখন আইআরজিসির নজরদারির বাইরে চলে যান, তখন ইরানের গোয়েন্দারা তার এই গোপন যোগাযোগের জাল ধরে ফেলেন। চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্যমতে, ইসরায়েলের সাথে তার এই মাখামাখি এখন আর গোপন নেই। ফলে এখন তাকে থাকতে হচ্ছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার কড়া নজরদারিতে, একপ্রকার গৃহবন্দী হয়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যে ক্ষমতার লোভে তিনি পুরনো মিত্রদের ছেড়ে নতুন শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছিলেন, দিনশেষে সেই ক্ষমতাই তাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক্ষমতার লড়াই কি মানুষকে এতটাই মরিয়া করে তোলে যে চিরশত্রুর সাথেও হাত মেলাতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো বইতে নেই, আছে কেবল রাজনীতির জটিল সমীকরণে। যে আহমাদিনেজাদ একসময় ইরানকে এক অন্য উচ্চতায় নিতে চেয়েছিলেন, আজ তিনি নিজেই এক রহস্যময় ইতিহাসের ভুক্তভোগী। এই ঘটনার রেশ কোথায় গিয়ে থামবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই জুয়াখেলায় শেষ পর্যন্ত হেরেছেন আহমাদিনেজাদ নিজেই।
2.png)