সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

আমেরিকার নির্জন উপত্যকায় দানবীয় এআই অস্ত্র প্রকল্প: সংকটে পরিবেশ ও জনজীবন

আমেরিকার উটাহ রাজ্যের হ্যান্সেল ভ্যালির মতো একটি শান্ত ও নির্জন উপত্যকায় বিশাল এক ‘স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট’ তৈরির পরিকল্পনা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

আমেরিকার নির্জন উপত্যকায় দানবীয় এআই অস্ত্র প্রকল্প: সংকটে পরিবেশ ও জনজীবন
ছবি -সংগৃহীত

 

 কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ডেটা ও জ্বালানি ক্যাম্পাস গড়ার এই প্রকল্প ঘিরে কেবল স্থানীয় জনপদ নয়, বরং সমগ্র আমেরিকাজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ৪০ হাজার একর জমির ওপর প্রস্তাবিত এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কলেবর এতটাই বিস্তৃত যে, এর আয়তন ২ হাজারটি ওয়ালমার্ট দোকানের সমান বলে মনে করা হচ্ছে। একটি বড় শহরের চেয়েও বিশাল এই স্থাপনাটি ঘিরে এখন পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ চাহিদা। ধারণা করা হচ্ছে, এই এআই ক্যাম্পাসটি সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। যেখানে পুরো উটাহ রাজ্যের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা সাধারণত ৪ থেকে ৫ গিগাওয়াট, সেখানে এই একটিমাত্র কেন্দ্র পুরো রাজ্যের চাহিদাকে ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ গিলে খাবে। বিশাল এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থানীয় পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট ডেভিস। তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, এই কেন্দ্রটি প্রতিদিন যে পরিমাণ তাপশক্তি পরিবেশে নিঃসরণ করবে, তা প্রায় ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান। হ্যান্সেল ভ্যালির প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি একটি ‘বাটির’ মতো হওয়ায় রাতে এই তাপ আটকে গিয়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিদ্যুতের পাশাপাশি পানির জোগান নিয়েও চলছে তোলপাড়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নিজস্ব তথ্যমতে, এই ডেটা সেন্টার পরিচালনা করতে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার একর-ফুট পানি প্রয়োজন হবে। স্থানীয়দের মতে, এই পরিমাণ পানি দিয়ে অন্তত ২০ হাজার পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব। পানির এই চরম অপচয়ের ভয়েই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক গণ-শুনানিতে হাজারো মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে—‘মুনাফার চেয়ে মানুষ বড়’ এবং ‘ডেটা দিয়ে পানির পিপাসা মেটে না।’ জরিপে দেখা গেছে, উটাহের ভোটারদের ৫৩ শতাংশই এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ জগতের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। বিনিয়োগকারী কেভিন ও'লেরির দাবি, বিশ্বজুড়ে চলমান ‘এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা’য় নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে আমেরিকার জন্য এই প্রজেক্ট অপরিহার্য। তিনি মনে করছেন, এই বিশাল কম্পিউটিং সক্ষমতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রযুক্তির লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বে। উটাহের গভর্নর স্পেন্সার কক্স অবশ্য কিছুটা নমনীয় পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রকল্পটি একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে নির্মিত হবে এবং প্রতিটি ধাপের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সব সূচক কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, অঢেল বিদ্যুৎ আর পানির বিনিময়ে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আদৌ কি স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে পারবে, নাকি তা কেবল পরিবেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে?

বিষয় : এআই প্রযুক্তি বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হ্যান্সেল ভ্যালি উটাহ রাজ্যের হ্যান্সেল ভ্যালি hansel valley utah data center

আমেরিকার নির্জন উপত্যকায় দানবীয় এআই অস্ত্র প্রকল্প: সংকটে পরিবেশ ও জনজীবন
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


আমেরিকার নির্জন উপত্যকায় দানবীয় এআই অস্ত্র প্রকল্প: সংকটে পরিবেশ ও জনজীবন

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

featured Image

 

 কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ডেটা ও জ্বালানি ক্যাম্পাস গড়ার এই প্রকল্প ঘিরে কেবল স্থানীয় জনপদ নয়, বরং সমগ্র আমেরিকাজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ৪০ হাজার একর জমির ওপর প্রস্তাবিত এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কলেবর এতটাই বিস্তৃত যে, এর আয়তন ২ হাজারটি ওয়ালমার্ট দোকানের সমান বলে মনে করা হচ্ছে। একটি বড় শহরের চেয়েও বিশাল এই স্থাপনাটি ঘিরে এখন পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ চাহিদা। ধারণা করা হচ্ছে, এই এআই ক্যাম্পাসটি সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। যেখানে পুরো উটাহ রাজ্যের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা সাধারণত ৪ থেকে ৫ গিগাওয়াট, সেখানে এই একটিমাত্র কেন্দ্র পুরো রাজ্যের চাহিদাকে ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ গিলে খাবে। বিশাল এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থানীয় পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট ডেভিস। তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, এই কেন্দ্রটি প্রতিদিন যে পরিমাণ তাপশক্তি পরিবেশে নিঃসরণ করবে, তা প্রায় ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান। হ্যান্সেল ভ্যালির প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি একটি ‘বাটির’ মতো হওয়ায় রাতে এই তাপ আটকে গিয়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিদ্যুতের পাশাপাশি পানির জোগান নিয়েও চলছে তোলপাড়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নিজস্ব তথ্যমতে, এই ডেটা সেন্টার পরিচালনা করতে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার একর-ফুট পানি প্রয়োজন হবে। স্থানীয়দের মতে, এই পরিমাণ পানি দিয়ে অন্তত ২০ হাজার পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব। পানির এই চরম অপচয়ের ভয়েই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক গণ-শুনানিতে হাজারো মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে—‘মুনাফার চেয়ে মানুষ বড়’ এবং ‘ডেটা দিয়ে পানির পিপাসা মেটে না।’ জরিপে দেখা গেছে, উটাহের ভোটারদের ৫৩ শতাংশই এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ জগতের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। বিনিয়োগকারী কেভিন ও'লেরির দাবি, বিশ্বজুড়ে চলমান ‘এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা’য় নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে আমেরিকার জন্য এই প্রজেক্ট অপরিহার্য। তিনি মনে করছেন, এই বিশাল কম্পিউটিং সক্ষমতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রযুক্তির লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বে। উটাহের গভর্নর স্পেন্সার কক্স অবশ্য কিছুটা নমনীয় পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রকল্পটি একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে নির্মিত হবে এবং প্রতিটি ধাপের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সব সূচক কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, অঢেল বিদ্যুৎ আর পানির বিনিময়ে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আদৌ কি স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে পারবে, নাকি তা কেবল পরিবেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে?


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত