সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

ব্লু এলইডির পর সীমাহীন বিদ্যুতের নতুন মিশনে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা

২০১৪ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী শুজি নাকামুরা এবার কাজ করছেন নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি নিয়ে। তার লক্ষ্য, উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন পালসড লেজার ব্যবহার করে বিশ্বকে উপহার দেওয়া নিরাপদ ও সীমাহীন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি।

ব্লু এলইডির পর সীমাহীন বিদ্যুতের নতুন মিশনে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা
ছবি -সংগৃহীত

আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম স্তম্ভ ‘ব্লু এলইডি’ বা নীল আলোক-নির্গমনকারী ডায়োডের উদ্ভাবক শুজি নাকামুরা আবারো খবরের শিরোনামে। ২০১৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এই বিজ্ঞানী এবার মনোযোগ দিয়েছেন জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে। তিনি এমন এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন, যা নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় সীমাহীন পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য: ৭২ বছর বয়সী এই উদ্ভাবক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা (ইউসিএসবি)-তে কর্মরত। তার নতুন প্রকল্প ‘ব্লু লেজার ফিউশন’-এর মূল ভিত্তি হলো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন পালসড লেজার। নাকামুরার মতে, এই ফিউশন প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়ামের কোনো প্রয়োজন নেই, ফলে প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকিও এতে নেই। তিনি ২০৩২ সালের মধ্যে এক গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি পরীক্ষামূলক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যা দিয়ে প্রায় ১০ লাখ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

অদম্য পথচলা ও অতীতের লড়াই: শুজি নাকামুরার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। আশির দশকে নিচিয়া করপোরেশনে কর্মরত থাকাকালীন তিনি যখন নীল এলইডি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তখন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেটি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি বৈজ্ঞানিক মহলও তার গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু নাকামুরা হার মানেননি, বরং সেই অপমান ও ব্যর্থতা থেকে শক্তি নিয়ে দীর্ঘ এক দশক পরিশ্রম করে ১৯৯৩ সালে নীল এলইডি উদ্ভাবনে সফল হন। তার এই উদ্ভাবন আজ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ট্রাফিক সিগন্যাল—বিশ্বের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে।

কেন এই ফিউশন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ? বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীভূত। কিন্তু নাকামুরা বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। তিনি বিশ্বাস করেন, তার উদ্ভাবিত লেজার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফিউশন বিক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। তিনি ‘অপটিক্যাল এনহ্যান্সমেন্ট ক্যাভিটি’ নামক একটি বিশেষ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা লেজারের শক্তিকে এক লাখ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে ফিউশন শক্তিকে স্থায়িত্ব প্রদান করবে।

তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা: নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় নাকামুরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, স্রোতের বিপরীতে চলার সাহস ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাই বড় কোনো আবিষ্কারের মূল চাবিকাঠি। নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে তার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট— “ঝুঁকি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

ব্লু এলইডি আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে আলোর নতুন পথ দেখিয়েছিলেন। এখন তার লক্ষ্য বিশ্বের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে পৃথিবীজুড়ে সুলভ ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। যদি এই নিউক্লিয়ার ফিউশন মিশন সফল হয়, তবে শুজি নাকামুরা কেবল একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হিসেবেই নন, বরং আধুনিক জ্বালানি বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বিষয় : সুজি নাকামুরা ব্লু এলইডি সীমাহীন বিদ্যুৎ

ব্লু এলইডির পর সীমাহীন বিদ্যুতের নতুন মিশনে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬


ব্লু এলইডির পর সীমাহীন বিদ্যুতের নতুন মিশনে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম স্তম্ভ ‘ব্লু এলইডি’ বা নীল আলোক-নির্গমনকারী ডায়োডের উদ্ভাবক শুজি নাকামুরা আবারো খবরের শিরোনামে। ২০১৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এই বিজ্ঞানী এবার মনোযোগ দিয়েছেন জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে। তিনি এমন এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন, যা নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় সীমাহীন পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য: ৭২ বছর বয়সী এই উদ্ভাবক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা (ইউসিএসবি)-তে কর্মরত। তার নতুন প্রকল্প ‘ব্লু লেজার ফিউশন’-এর মূল ভিত্তি হলো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন পালসড লেজার। নাকামুরার মতে, এই ফিউশন প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়ামের কোনো প্রয়োজন নেই, ফলে প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকিও এতে নেই। তিনি ২০৩২ সালের মধ্যে এক গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি পরীক্ষামূলক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যা দিয়ে প্রায় ১০ লাখ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

অদম্য পথচলা ও অতীতের লড়াই: শুজি নাকামুরার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। আশির দশকে নিচিয়া করপোরেশনে কর্মরত থাকাকালীন তিনি যখন নীল এলইডি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তখন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেটি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি বৈজ্ঞানিক মহলও তার গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু নাকামুরা হার মানেননি, বরং সেই অপমান ও ব্যর্থতা থেকে শক্তি নিয়ে দীর্ঘ এক দশক পরিশ্রম করে ১৯৯৩ সালে নীল এলইডি উদ্ভাবনে সফল হন। তার এই উদ্ভাবন আজ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ট্রাফিক সিগন্যাল—বিশ্বের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে।

কেন এই ফিউশন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ? বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীভূত। কিন্তু নাকামুরা বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। তিনি বিশ্বাস করেন, তার উদ্ভাবিত লেজার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফিউশন বিক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। তিনি ‘অপটিক্যাল এনহ্যান্সমেন্ট ক্যাভিটি’ নামক একটি বিশেষ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা লেজারের শক্তিকে এক লাখ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে ফিউশন শক্তিকে স্থায়িত্ব প্রদান করবে।

তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা: নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় নাকামুরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, স্রোতের বিপরীতে চলার সাহস ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাই বড় কোনো আবিষ্কারের মূল চাবিকাঠি। নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে তার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট— “ঝুঁকি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

ব্লু এলইডি আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে আলোর নতুন পথ দেখিয়েছিলেন। এখন তার লক্ষ্য বিশ্বের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে পৃথিবীজুড়ে সুলভ ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। যদি এই নিউক্লিয়ার ফিউশন মিশন সফল হয়, তবে শুজি নাকামুরা কেবল একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হিসেবেই নন, বরং আধুনিক জ্বালানি বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত