সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক জাদুকরী গাছ

ভাবুন তো, এমন এক গাছের কথা যা দেখতে শুকনো, মরা কাঠের মতো কুঁকড়ে আছে। কেউ দেখলে ভাববে এটি একেবারেই মৃত। কিন্তু এক ফোঁটা পানি পেলেই সে যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় জেগে ওঠে! রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও, প্রকৃতিতে সত্যি এমন গাছের দেখা মেলে, যাদের আমরা ডাকি ‘রিসারেকশন প্ল্যান্ট’ বা পুনর্জীবিত হওয়া গাছ।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক জাদুকরী গাছ
ছবি -সংগৃহীত

মেক্সিকো বা যুক্তরাষ্ট্রের চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির রুক্ষ পথে হাঁটলে হয়তো আপনার চোখে পড়বে বাদামি রঙের কিছু কুঁকড়ানো ঝোপ। নাম তার Rose of Jericho। আপাতদৃষ্টিতে এদের কোনো প্রাণ নেই বলেই মনে হয়। কিন্তু বৃষ্টির পর যখন মরুভূমির বুকে পানি পড়ে, তখন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই এই মরা গাছগুলো ডানা মেলে সবুজ হয়ে ওঠে। এদের এই অদ্ভুত ক্ষমতাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ডেসিক্যান্ট টলারেন্স’ (সহজ কথায়, দেহ থেকে সব পানি বেরিয়ে গেলেও কোষের ভেতরে প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা)।

আফ্রিকার শুকনো অঞ্চল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও এমন অদ্ভুত গাছের দেখা মেলে, যাদের জীবন যেন এক অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যায়!

মানুষ বা অন্য প্রাণীর শরীর থেকে পানি হারিয়ে গেলে তারা পানিশূন্যতায় মারা যায়। কিন্তু এই গাছগুলো ব্যতিক্রম। খরা বা চরম শুকনো মৌসুমে এরা নিজেদের শরীরের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পানি বাতাসে ছেড়ে দেয়। তখন তাদের অবস্থা হয় অনেকটা শুকনো খড়কুটোর মতো। এদের শরীরের ভেতর সব ধরনের বিপাকীয় বা শক্তির উৎপাদনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে এদের কোষগুলো ফেটে গিয়ে নষ্ট হয় না কেন?

এখানেই লুকিয়ে আছে তাদের আসল কৌশল! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শুকিয়ে যাওয়ার আগেই এরা বিশেষ ধরনের চিনি বা শর্করা (যেমন: ট্রেহালোজ ও সুক্রোজ) তৈরি করে ফেলে। এই চিনিগুলো শরীরের ভেতরের প্রোটিন বা কোষের দেয়ালগুলোকে যেন একটি অদৃশ্য আবরণ দিয়ে মুড়িয়ে রাখে। এর পাশাপাশি থাকে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (শরীরের কোষের সুরক্ষা কবজ), যা ক্ষতিকর রাসায়নিকের হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। ফলে দিনের পর দিন মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থেকেও এরা ভেতর থেকে পুরোপুরি টিকে থাকে।

রিসারেকশন প্ল্যান্ট এখন কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের বড় এক রহস্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে এখন পানির অভাব তীব্র হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, যদি এই গাছগুলোর টিকে থাকার জাদুকরী জিন বা ডিএনএ কোডগুলোকে আমরা গবেষণাগারে আমাদের চাষের ফসলে (যেমন ধান বা গম) ঢুকিয়ে দিতে পারি, তাহলে হয়তো পানির অভাবেও ফসলের মাঠ আর শুকিয়ে যাবে না।

শুধু তাই নয়, মহাকাশে দীর্ঘ যাত্রায় কিংবা চরম প্রতিকূল পরিবেশে গাছ কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তা নিয়েও এই গাছগুলো দিচ্ছে নতুন পথের দিশা। 

এই উদ্ভিদগুলো কেবল বেঁচে ওঠে না, বরং কোনো কোনো প্রজাতি দীর্ঘ কয়েক দশক শুকনো অবস্থায় পড়ে থেকেও পানি পেলে দিব্যি প্রাণ ফিরে পায়! ‘রোজ অব জেরিকো’ গাছটি মরুভূমিতে বাতাস বয়ে চলার সাথে সাথে গড়িয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, যেন এটি কোনো ভ্রাম্যমাণ পর্যটক!

রিসারেকশন প্ল্যান্ট বা পুনর্জীবিত হওয়া উদ্ভিদ প্রকৃতির এক অদ্ভুত প্রকৌশলী। এরা তাদের শরীরের পানি হারিয়ে ফেলার পরেও কোষের ভেতর এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক কবজ তৈরি করে রাখে, যা তাদের মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনে। এই অদম্য জেদই হয়তো আগামীর পৃথিবীতে খাদ্য সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হতে যাচ্ছে।

বিষয় : রিসারেকশন_প্ল্যান্ট ভবিষ্যতের_কৃষি

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক জাদুকরী গাছ
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক জাদুকরী গাছ

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

মেক্সিকো বা যুক্তরাষ্ট্রের চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির রুক্ষ পথে হাঁটলে হয়তো আপনার চোখে পড়বে বাদামি রঙের কিছু কুঁকড়ানো ঝোপ। নাম তার Rose of Jericho। আপাতদৃষ্টিতে এদের কোনো প্রাণ নেই বলেই মনে হয়। কিন্তু বৃষ্টির পর যখন মরুভূমির বুকে পানি পড়ে, তখন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই এই মরা গাছগুলো ডানা মেলে সবুজ হয়ে ওঠে। এদের এই অদ্ভুত ক্ষমতাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ডেসিক্যান্ট টলারেন্স’ (সহজ কথায়, দেহ থেকে সব পানি বেরিয়ে গেলেও কোষের ভেতরে প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা)।

আফ্রিকার শুকনো অঞ্চল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও এমন অদ্ভুত গাছের দেখা মেলে, যাদের জীবন যেন এক অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যায়!

মানুষ বা অন্য প্রাণীর শরীর থেকে পানি হারিয়ে গেলে তারা পানিশূন্যতায় মারা যায়। কিন্তু এই গাছগুলো ব্যতিক্রম। খরা বা চরম শুকনো মৌসুমে এরা নিজেদের শরীরের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পানি বাতাসে ছেড়ে দেয়। তখন তাদের অবস্থা হয় অনেকটা শুকনো খড়কুটোর মতো। এদের শরীরের ভেতর সব ধরনের বিপাকীয় বা শক্তির উৎপাদনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে এদের কোষগুলো ফেটে গিয়ে নষ্ট হয় না কেন?

এখানেই লুকিয়ে আছে তাদের আসল কৌশল! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শুকিয়ে যাওয়ার আগেই এরা বিশেষ ধরনের চিনি বা শর্করা (যেমন: ট্রেহালোজ ও সুক্রোজ) তৈরি করে ফেলে। এই চিনিগুলো শরীরের ভেতরের প্রোটিন বা কোষের দেয়ালগুলোকে যেন একটি অদৃশ্য আবরণ দিয়ে মুড়িয়ে রাখে। এর পাশাপাশি থাকে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (শরীরের কোষের সুরক্ষা কবজ), যা ক্ষতিকর রাসায়নিকের হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। ফলে দিনের পর দিন মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থেকেও এরা ভেতর থেকে পুরোপুরি টিকে থাকে।

রিসারেকশন প্ল্যান্ট এখন কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের বড় এক রহস্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে এখন পানির অভাব তীব্র হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, যদি এই গাছগুলোর টিকে থাকার জাদুকরী জিন বা ডিএনএ কোডগুলোকে আমরা গবেষণাগারে আমাদের চাষের ফসলে (যেমন ধান বা গম) ঢুকিয়ে দিতে পারি, তাহলে হয়তো পানির অভাবেও ফসলের মাঠ আর শুকিয়ে যাবে না।

শুধু তাই নয়, মহাকাশে দীর্ঘ যাত্রায় কিংবা চরম প্রতিকূল পরিবেশে গাছ কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তা নিয়েও এই গাছগুলো দিচ্ছে নতুন পথের দিশা। 

এই উদ্ভিদগুলো কেবল বেঁচে ওঠে না, বরং কোনো কোনো প্রজাতি দীর্ঘ কয়েক দশক শুকনো অবস্থায় পড়ে থেকেও পানি পেলে দিব্যি প্রাণ ফিরে পায়! ‘রোজ অব জেরিকো’ গাছটি মরুভূমিতে বাতাস বয়ে চলার সাথে সাথে গড়িয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, যেন এটি কোনো ভ্রাম্যমাণ পর্যটক!

রিসারেকশন প্ল্যান্ট বা পুনর্জীবিত হওয়া উদ্ভিদ প্রকৃতির এক অদ্ভুত প্রকৌশলী। এরা তাদের শরীরের পানি হারিয়ে ফেলার পরেও কোষের ভেতর এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক কবজ তৈরি করে রাখে, যা তাদের মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনে। এই অদম্য জেদই হয়তো আগামীর পৃথিবীতে খাদ্য সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হতে যাচ্ছে।




কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত