সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আবহমান বঞ্চনাআবহমান বঞ্চনা

কাঁটাতারে ঝুলে আছে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা

পঞ্চাশ বছরে দুই হাজার লাশ — আর একটাও বিচার হয়নি

কাঁটাতারে ঝুলে আছে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার আনন্তপুর সীমান্তে একটা মেয়ে মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। পনেরো বছর বয়স। দিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ে ঠিক হয়েছে, দেশে ফিরছে। কাঁটাতারে জামা আটকে গেল। ছাড়াতে পারছে না। চিৎকার করছে।

ভারতীয় বিএসএফের জওয়ান গুলি করল।

ফেলানী খাতুনের রক্তাক্ত শরীর সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে রইল কাঁটাতারে। জীবন্ত। তারপর মৃত। বাংলাদেশের কোনো পত্রিকা সেদিন ওই ছবি ছাপল। সারা দুনিয়া দেখল।

আর বাংলাদেশ সরকার? নিন্দা জানাল। প্রতিবাদপত্র পাঠাল। তারপর চুপ।

ফেলানীর খুনি বিএসএফ কনস্টেবল অমিয় ঘোষের দুটো বিচার হয়েছে ভারতে। দুবারই খালাস।

 

একটা নীতি, একটা কবরস্থান

ফেলানী একা নয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসেবে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে ১ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। আহত করেছে আরও ১ হাজার ১৪৫ জনকে।

১৯৭২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯৪৭। গড়ে প্রতি বছর ৩৭ জন বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে।

এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। প্রতি বছর ৩৭ জন। যুদ্ধ নেই, সংঘাত নেই — শুধু "বন্ধু দেশ"-এর সীমান্ত।

সবচেয়ে ভয়াবহ বছরটি ছিল ২০০৬। সেই বছর বিএসএফের হাতে মারা গেছেন ১৫৫ জন বাংলাদেশি। মানে প্রতি আড়াই দিনে একজন।

আর এই ৫০ বছরে বিএসএফের একজন সদস্যেরও বিচার হয়নি।

 

"শুট অন সাইট" — যে নীতির কোনো বিচার নেই

ভারতের বিএসএফের একটি আনুষ্ঠানিক নীতি আছে — "শুট অন সাইট"। সোজা বাংলায়: দেখামাত্র গুলি।

এই নীতির আওতায় সীমান্তে যে কাউকে গুলি করার অধিকার বিএসএফের আছে। কারণ দেখাতে হয় না। তদন্ত হয় না। বিচার হয় না।

তৎকালীন বিএসএফ প্রধান রমণ শ্রীবাস্তব একবার সরাসরি বলেছিলেন: "নিহতদের জন্য কারো দুঃখ পাওয়ার দরকার নেই — তারা ভারতে অবৈধভাবে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তাই তারা বৈধ লক্ষ্য।"

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১০ সালে একটি ৮১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা যায়, বিএসএফ যাদের হত্যা করেছে, তাদের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। অথচ বিএসএফ দাবি করে "আত্মরক্ষায়" গুলি করেছে।

আরও বড় বিষয় — ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সীমান্তে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি নাগরিককে অপহরণ করা হয়েছে। শুধু ২০১৩ সালেই ১৭৫ জন অপহৃত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৯ জনকে ফিরিয়ে আনা গেছে। বাকি ১২৬ জনের খোঁজ নেই।

 

ফেলানীর কাঁটাতার — যে ছবি ভোলা যায় না

ফেলানীর ঘটনা শুধু একটি হত্যার ঘটনা নয় — এটা একটা পদ্ধতির মুখোশ খুলে দিয়েছিল।

ঘটনার পরদিন ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম ঢাকায় এসে "দুঃখ প্রকাশ" করলেন। ঘোষণা দিলেন — বিএসএফ আর বেসামরিক মানুষকে গুলি করবে না, রাবার বুলেট ব্যবহার করবে।

বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার খুশি হলো।

তারপর?

সেই প্রতিশ্রুতি কার্যত মানা হয়নি। ২০২৪ সালেও ২৫ জন বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন।

ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম আজও বলেন: "আগের সরকার আমার মেয়ের হত্যার বিচারের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।"

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঝুলছে ২০১৫ সাল থেকে। শুনানির তারিখ বারবার পিছিয়েছে। ফেলানীর বাবা একা লড়ছেন।

 

যে সীমান্ত দুনিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক

বাংলাদেশ আর ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত।

এই সীমান্তকে কেউ কেউ বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্তগুলোর একটি — যুদ্ধ নেই, তবু মানুষ মরছে। ভারত এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। ইতিমধ্যে ৩ হাজার ১৮০ কিলোমিটারে বেড়া তৈরি সম্পন্ন। বাকিটাও হচ্ছে।

এই বেড়ার একটা বড় অংশ জিরো লাইনের ভেতরে — অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমানার দিকে ১৫০ গজের মধ্যে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এটা বেআইনি।

বাংলাদেশ প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারত শুনেছে। কিন্তু বেড়া দেওয়া থেমে যায়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে — ভারত আবার জিরো লাইনের ভেতরে বেড়া দিতে শুরু করেছে। এবার অন্তর্বর্তী সরকার জোরালো অবস্থান নিয়েছে।

 

নতজানু রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

এখানেই আসল প্রশ্নটা।

সীমান্তে হত্যা নতুন নয়। কিন্তু প্রতিটি হত্যার পরে কী হয়েছে? বাংলাদেশের সরকারগুলো কী করেছে?

উত্তরটা কষ্টের,আক্ষেপের।

২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের আমলকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের "সোনালি অধ্যায়" বলা হতো। এই ১৫ বছরে বিএসএফের হাতে মারা গেছেন শত শত বাংলাদেশি। সেই সময় সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কার্যত নিষ্ক্রিয়।

প্রতিটি হত্যার পরে হতো মৌখিক নিন্দা। মাঝেমধ্যে কূটনৈতিক চিঠি। তারপর ভারতের আশ্বাস যে "আর হবে না।" তারপর আবার হত্যা।

এই চক্র বারবার ঘুরেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত তার বাংলাদেশ নীতি কার্যত একটি দলের উপর — আওয়ামী লীগের উপর — নির্ভর করে তৈরি করেছিল। এর ফলে সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য — এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সরকার শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কারণ "সম্পর্ক খারাপ হওয়ার" ভয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, যিনি ফেলানী হত্যার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, পরিষ্কার বলেছেন: "ভারত সব সময় সীমান্তে 'ট্রিগার হ্যাপি' আচরণ করে এসেছে। আর বাংলাদেশ এটা সহ্য করে গেছে।"

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন: "গরু পাচার বন্ধ করতে হলে ভারতের ভেতরে থেকে পাচার বন্ধ করুন। বাংলাদেশিদের গুলি করবেন কেন?"

 

"বড় ভাই"-এর মনোভাব — এর শেষ কোথায়?

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে আগের চেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। শেখ হাসিনার বিচার ও প্রত্যর্পণ চেয়েছে। জিরো লাইনে অবৈধ বেড়া দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ভারত এই পরিবর্তনে বিরক্ত হয়েছে। ভিসা সেবা সীমিত করেছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনটা দরকার ছিল।

কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে "বড় ভাই"-এর মতো আচরণ করে এসেছে। এই মনোভাবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে দশকের পর দশক ধরে।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন শুধু কোটা বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল না — তার একটা বড় অংশ ছিল ভারতমুখী একটি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধেও।

রাজপথে যে স্লোগান উঠেছিল — "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা" — সেটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটা দশকের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার কথা।

 

কী করা উচিত ছিল, কী করা উচিত এখন

তাহলে সমাধান কী?

এক — আন্তর্জাতিক আইনের পথে হাঁটতে হবে।

সীমান্তে যখন কোনো বাংলাদেশি নিহত হন, তা যদি অবৈধ পারাপারের সময়ও হয় — আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাঁকে গ্রেফতার করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার কথা। তাৎক্ষণিকভাবে গুলি করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বাংলাদেশকে এই যুক্তিটা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালোভাবে তুলতে হবে।

দুই — শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি নিতে হবে।

প্রতিটি সীমান্ত হত্যার পরে শুধু মৌখিক নিন্দা নয় — নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বিচার দাবি করতে হবে। বিচার না হলে কূটনৈতিক পরিণতির কথা জানিয়ে দিতে হবে।

তিন — দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সীমান্ত রক্ষার স্পষ্ট ভাষা চাই।

বর্তমান চুক্তিগুলোতে বলা আছে "রাবার বুলেট" ব্যবহার করতে হবে — কিন্তু এই শর্ত মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নতুন চুক্তিতে লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান রাখতে হবে।

চার — সম্পর্ক দলীয় নয়, জনগণের ভিত্তিতে হতে হবে।

বাংলাদেশের যে কোনো সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখবে — কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে সমতা ও মর্যাদা। একটি দলের পৃষ্ঠপোষকতার বদলে দুই দেশের মানুষের স্বার্থে।

পাঁচ — ভারতের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে সঙ্গে নিতে হবে।

ভারতের মানবাধিকার কর্মী কিরীটি রায় এবং তাঁর সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (ম্যাসাম) দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা ফেলানীর বাবার পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। এই মিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

 

২০২৫-২৬ — পরিবর্তনের হাওয়া কি সত্যিই বইছে?

২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে বিমস্টেক সম্মেলনের ফাঁকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সীমান্ত হত্যার বিষয়টি উঠেছে। এটা একটা ভালো লক্ষণ ছিলো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া  যেমন - সীমান্ত বন্ধ হওয়া , বাণিজ্য সীমিত হওয়া, চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ বন্ধ হওয়া কোন কিছুকেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ছিলো সমর্থন জ্ঞাপক। এখানেই জনগণের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেছে। এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়াবে তার তার কিছুটা লক্ষণ ৫ই আগস্টের পর প্রকাশ পেয়েছে।

কিন্তু লক্ষণ আর বাস্তবতা এক নয়। ২০২৬ এ বহুল কাঙ্খিত নির্বাচনে জনগণের সরকার গঠিত হল। বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক এখন "পুনর্সামঞ্জস্যের পর্যায়ে"

কিন্তু সীমান্তে হত্যা এখনও থামেনি।

 

ফেলানী মারা গিয়েছিল ২০১১ সালে। তার বাবা নুরুল ইসলাম ১৪ বছর ধরে বিচার চাইছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ফেলানীর মত হাজারো সীমান্ত লাশের কবর দেওয়া হয়েছে — এগুলো যেন কেবলই লাশ নয়, কবর নয় এগুলো যেন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার লাশের সমাধী। আমাদের কোন সরকারই এই সকল আগ্রাসী হত্যার ন্যায়বিচার চায়নি জনগণের হয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়েনি।   

১৯৭২ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির মতো একই পরিণতি। একটিও বিচার নেই।

কোনো দেশ যখন তার নাগরিকের মৃত্যুতে প্রতিবাদের বদলে নীরবতা বেছে নেয়, তখন সে দেশ আসলে এটাই বুঝাতে চায় যে— আমাদের মানুষের জীবনের দাম নেই। কিন্তু এখন সময়টা পরিবর্তীত। বাংলাদেশকে এখন সেই নীতি পাল্টাতে হবে।

বাংলাদেশকে বুঝতে হবে আত্মসম্মান মানে আগ্রাসী হওয়া নয়। আত্মসম্মান মানে — নিজের নাগরিকের জীবনের মূল্য বোঝা, এবং প্রতিটি জীবনের জন্য লড়ে সেই মূল্যের কথা অন্যকে বোঝানো।

সীমান্তের কাঁটাতার সরানো হয়তো এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু সেই কাঁটাতারে আর কোনো ফেলানীকে ঝুলতে দেওয়া যাবে না।

 

বিঃদ্রঃ — ফেলানীর বাবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা মামলা এখনও বিচারাধীন। ১৪ বছরেও শুনানি সম্পন্ন হয়নি।

বিষয় : ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত সীমান্ত হত্যা ফেলানির লাশ

কাঁটাতারে ঝুলে আছে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


কাঁটাতারে ঝুলে আছে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার আনন্তপুর সীমান্তে একটা মেয়ে মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। পনেরো বছর বয়স। দিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ে ঠিক হয়েছে, দেশে ফিরছে। কাঁটাতারে জামা আটকে গেল। ছাড়াতে পারছে না। চিৎকার করছে।

ভারতীয় বিএসএফের জওয়ান গুলি করল।

ফেলানী খাতুনের রক্তাক্ত শরীর সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে রইল কাঁটাতারে। জীবন্ত। তারপর মৃত। বাংলাদেশের কোনো পত্রিকা সেদিন ওই ছবি ছাপল। সারা দুনিয়া দেখল।

আর বাংলাদেশ সরকার? নিন্দা জানাল। প্রতিবাদপত্র পাঠাল। তারপর চুপ।

ফেলানীর খুনি বিএসএফ কনস্টেবল অমিয় ঘোষের দুটো বিচার হয়েছে ভারতে। দুবারই খালাস।

 

একটা নীতি, একটা কবরস্থান

ফেলানী একা নয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসেবে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে ১ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। আহত করেছে আরও ১ হাজার ১৪৫ জনকে।

১৯৭২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯৪৭। গড়ে প্রতি বছর ৩৭ জন বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে।

এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। প্রতি বছর ৩৭ জন। যুদ্ধ নেই, সংঘাত নেই — শুধু "বন্ধু দেশ"-এর সীমান্ত।

সবচেয়ে ভয়াবহ বছরটি ছিল ২০০৬। সেই বছর বিএসএফের হাতে মারা গেছেন ১৫৫ জন বাংলাদেশি। মানে প্রতি আড়াই দিনে একজন।

আর এই ৫০ বছরে বিএসএফের একজন সদস্যেরও বিচার হয়নি।

 

"শুট অন সাইট" — যে নীতির কোনো বিচার নেই

ভারতের বিএসএফের একটি আনুষ্ঠানিক নীতি আছে — "শুট অন সাইট"। সোজা বাংলায়: দেখামাত্র গুলি।

এই নীতির আওতায় সীমান্তে যে কাউকে গুলি করার অধিকার বিএসএফের আছে। কারণ দেখাতে হয় না। তদন্ত হয় না। বিচার হয় না।

তৎকালীন বিএসএফ প্রধান রমণ শ্রীবাস্তব একবার সরাসরি বলেছিলেন: "নিহতদের জন্য কারো দুঃখ পাওয়ার দরকার নেই — তারা ভারতে অবৈধভাবে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তাই তারা বৈধ লক্ষ্য।"

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১০ সালে একটি ৮১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা যায়, বিএসএফ যাদের হত্যা করেছে, তাদের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। অথচ বিএসএফ দাবি করে "আত্মরক্ষায়" গুলি করেছে।

আরও বড় বিষয় — ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সীমান্তে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি নাগরিককে অপহরণ করা হয়েছে। শুধু ২০১৩ সালেই ১৭৫ জন অপহৃত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৯ জনকে ফিরিয়ে আনা গেছে। বাকি ১২৬ জনের খোঁজ নেই।

 

ফেলানীর কাঁটাতার — যে ছবি ভোলা যায় না

ফেলানীর ঘটনা শুধু একটি হত্যার ঘটনা নয় — এটা একটা পদ্ধতির মুখোশ খুলে দিয়েছিল।

ঘটনার পরদিন ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম ঢাকায় এসে "দুঃখ প্রকাশ" করলেন। ঘোষণা দিলেন — বিএসএফ আর বেসামরিক মানুষকে গুলি করবে না, রাবার বুলেট ব্যবহার করবে।

বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার খুশি হলো।

তারপর?

সেই প্রতিশ্রুতি কার্যত মানা হয়নি। ২০২৪ সালেও ২৫ জন বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন।

ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম আজও বলেন: "আগের সরকার আমার মেয়ের হত্যার বিচারের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।"

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঝুলছে ২০১৫ সাল থেকে। শুনানির তারিখ বারবার পিছিয়েছে। ফেলানীর বাবা একা লড়ছেন।

 

যে সীমান্ত দুনিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক

বাংলাদেশ আর ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত।

এই সীমান্তকে কেউ কেউ বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্তগুলোর একটি — যুদ্ধ নেই, তবু মানুষ মরছে। ভারত এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। ইতিমধ্যে ৩ হাজার ১৮০ কিলোমিটারে বেড়া তৈরি সম্পন্ন। বাকিটাও হচ্ছে।

এই বেড়ার একটা বড় অংশ জিরো লাইনের ভেতরে — অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমানার দিকে ১৫০ গজের মধ্যে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এটা বেআইনি।

বাংলাদেশ প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারত শুনেছে। কিন্তু বেড়া দেওয়া থেমে যায়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে — ভারত আবার জিরো লাইনের ভেতরে বেড়া দিতে শুরু করেছে। এবার অন্তর্বর্তী সরকার জোরালো অবস্থান নিয়েছে।

 

নতজানু রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

এখানেই আসল প্রশ্নটা।

সীমান্তে হত্যা নতুন নয়। কিন্তু প্রতিটি হত্যার পরে কী হয়েছে? বাংলাদেশের সরকারগুলো কী করেছে?

উত্তরটা কষ্টের,আক্ষেপের।

২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের আমলকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের "সোনালি অধ্যায়" বলা হতো। এই ১৫ বছরে বিএসএফের হাতে মারা গেছেন শত শত বাংলাদেশি। সেই সময় সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কার্যত নিষ্ক্রিয়।

প্রতিটি হত্যার পরে হতো মৌখিক নিন্দা। মাঝেমধ্যে কূটনৈতিক চিঠি। তারপর ভারতের আশ্বাস যে "আর হবে না।" তারপর আবার হত্যা।

এই চক্র বারবার ঘুরেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত তার বাংলাদেশ নীতি কার্যত একটি দলের উপর — আওয়ামী লীগের উপর — নির্ভর করে তৈরি করেছিল। এর ফলে সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য — এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সরকার শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কারণ "সম্পর্ক খারাপ হওয়ার" ভয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, যিনি ফেলানী হত্যার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, পরিষ্কার বলেছেন: "ভারত সব সময় সীমান্তে 'ট্রিগার হ্যাপি' আচরণ করে এসেছে। আর বাংলাদেশ এটা সহ্য করে গেছে।"

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন: "গরু পাচার বন্ধ করতে হলে ভারতের ভেতরে থেকে পাচার বন্ধ করুন। বাংলাদেশিদের গুলি করবেন কেন?"

 

"বড় ভাই"-এর মনোভাব — এর শেষ কোথায়?

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে আগের চেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। শেখ হাসিনার বিচার ও প্রত্যর্পণ চেয়েছে। জিরো লাইনে অবৈধ বেড়া দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ভারত এই পরিবর্তনে বিরক্ত হয়েছে। ভিসা সেবা সীমিত করেছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনটা দরকার ছিল।

কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে "বড় ভাই"-এর মতো আচরণ করে এসেছে। এই মনোভাবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে দশকের পর দশক ধরে।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন শুধু কোটা বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল না — তার একটা বড় অংশ ছিল ভারতমুখী একটি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধেও।

রাজপথে যে স্লোগান উঠেছিল — "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা" — সেটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটা দশকের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার কথা।

 

কী করা উচিত ছিল, কী করা উচিত এখন

তাহলে সমাধান কী?

এক — আন্তর্জাতিক আইনের পথে হাঁটতে হবে।

সীমান্তে যখন কোনো বাংলাদেশি নিহত হন, তা যদি অবৈধ পারাপারের সময়ও হয় — আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাঁকে গ্রেফতার করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার কথা। তাৎক্ষণিকভাবে গুলি করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বাংলাদেশকে এই যুক্তিটা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালোভাবে তুলতে হবে।

দুই — শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি নিতে হবে।

প্রতিটি সীমান্ত হত্যার পরে শুধু মৌখিক নিন্দা নয় — নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বিচার দাবি করতে হবে। বিচার না হলে কূটনৈতিক পরিণতির কথা জানিয়ে দিতে হবে।

তিন — দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সীমান্ত রক্ষার স্পষ্ট ভাষা চাই।

বর্তমান চুক্তিগুলোতে বলা আছে "রাবার বুলেট" ব্যবহার করতে হবে — কিন্তু এই শর্ত মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নতুন চুক্তিতে লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান রাখতে হবে।

চার — সম্পর্ক দলীয় নয়, জনগণের ভিত্তিতে হতে হবে।

বাংলাদেশের যে কোনো সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখবে — কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে সমতা ও মর্যাদা। একটি দলের পৃষ্ঠপোষকতার বদলে দুই দেশের মানুষের স্বার্থে।

পাঁচ — ভারতের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে সঙ্গে নিতে হবে।

ভারতের মানবাধিকার কর্মী কিরীটি রায় এবং তাঁর সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (ম্যাসাম) দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা ফেলানীর বাবার পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। এই মিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

 

২০২৫-২৬ — পরিবর্তনের হাওয়া কি সত্যিই বইছে?

২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে বিমস্টেক সম্মেলনের ফাঁকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সীমান্ত হত্যার বিষয়টি উঠেছে। এটা একটা ভালো লক্ষণ ছিলো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া  যেমন - সীমান্ত বন্ধ হওয়া , বাণিজ্য সীমিত হওয়া, চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ বন্ধ হওয়া কোন কিছুকেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ছিলো সমর্থন জ্ঞাপক। এখানেই জনগণের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেছে। এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়াবে তার তার কিছুটা লক্ষণ ৫ই আগস্টের পর প্রকাশ পেয়েছে।

কিন্তু লক্ষণ আর বাস্তবতা এক নয়। ২০২৬ এ বহুল কাঙ্খিত নির্বাচনে জনগণের সরকার গঠিত হল। বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক এখন "পুনর্সামঞ্জস্যের পর্যায়ে"

কিন্তু সীমান্তে হত্যা এখনও থামেনি।

 

ফেলানী মারা গিয়েছিল ২০১১ সালে। তার বাবা নুরুল ইসলাম ১৪ বছর ধরে বিচার চাইছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ফেলানীর মত হাজারো সীমান্ত লাশের কবর দেওয়া হয়েছে — এগুলো যেন কেবলই লাশ নয়, কবর নয় এগুলো যেন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার লাশের সমাধী। আমাদের কোন সরকারই এই সকল আগ্রাসী হত্যার ন্যায়বিচার চায়নি জনগণের হয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়েনি।   

১৯৭২ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির মতো একই পরিণতি। একটিও বিচার নেই।

কোনো দেশ যখন তার নাগরিকের মৃত্যুতে প্রতিবাদের বদলে নীরবতা বেছে নেয়, তখন সে দেশ আসলে এটাই বুঝাতে চায় যে— আমাদের মানুষের জীবনের দাম নেই। কিন্তু এখন সময়টা পরিবর্তীত। বাংলাদেশকে এখন সেই নীতি পাল্টাতে হবে।

বাংলাদেশকে বুঝতে হবে আত্মসম্মান মানে আগ্রাসী হওয়া নয়। আত্মসম্মান মানে — নিজের নাগরিকের জীবনের মূল্য বোঝা, এবং প্রতিটি জীবনের জন্য লড়ে সেই মূল্যের কথা অন্যকে বোঝানো।

সীমান্তের কাঁটাতার সরানো হয়তো এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু সেই কাঁটাতারে আর কোনো ফেলানীকে ঝুলতে দেওয়া যাবে না।

 

বিঃদ্রঃ — ফেলানীর বাবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা মামলা এখনও বিচারাধীন। ১৪ বছরেও শুনানি সম্পন্ন হয়নি।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত