সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ঢাকাঢাকা

রাজধানীর ময়লা-বাণিজ্যে এখন নতুন নিয়ন্ত্রকদের দাপট

ক্ষমতার পটপরিবর্তনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কুশীলব বদল হলেও কমেনি জনভোগান্তি; নিয়ম ভেঙে দ্বিগুণ-তিনগুণ ফি আদায়ে দিশেহারা নগরবাসী।

রাজধানীর ময়লা-বাণিজ্যে এখন নতুন নিয়ন্ত্রকদের দাপট
ছবি -সংগৃহীত

সাহাবুদ্দিন আলী একসময় পুরান ঢাকার সফল লোহালক্কড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ভাগ্য বদলের আশায় পৈতৃক সম্পদ আর জমানো ১২ লাখ টাকা পুঁজি ঢেলে নেমেছিলেন বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের কাজে। কিন্তু ক্ষমতার ঘূর্ণাবর্তে ভাগ্য ফেরা তো দূরে থাক, এখন তিনি স্রেফ নিঃস্ব। রাজধানীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের এই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেবল জোর খাটিয়ে কাজ ছিনিয়ে নিয়েছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। সাহাবুদ্দিনের অপরাধ ছিল একটাই—পটপরিবর্তনের পর তিনি বর্তমান ক্ষমতার 'আশীর্বাদপুষ্ট' তালিকায় ঠাঁই পাননি।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে বর্তমানে নির্বাচিত মেয়র কিংবা কাউন্সিলর নেই। এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে গত ৫ আগস্টের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের একছত্র আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছেন বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা। কেবল কুশীলব বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট কাটার পুরনো রীতি এখনো অটুট।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। ডিএসসিসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়ার বিধান থাকলেও ধানমন্ডি, আজিমপুর, খিলগাঁও কিংবা যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকায় আদায় করা হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে ছোট দোকান বা শরবতের দোকান থেকেও মাসে এক হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার নজির পাওয়া গেছে। রসিদ ছাড়াই চলছে এই বেআইনি অর্থ আদায়।

ডিএসসিসি এলাকায় হোল্ডিং ও ফ্ল্যাট সংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, বর্জ্য সংগ্রহের এই খাত থেকে বছরে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই বিশাল অঙ্কের টাকার মোহেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা মরিয়া হয়ে ওঠেন নিয়ন্ত্রণের জন্য। বাসাবোর ৪ নম্বর ওয়ার্ডে যেমন বৈধ ইজাদারকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য করার পর শেষমেশ জোরপূর্বক কাজ দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এই ‘ময়লা-বাণিজ্য’ এখন ওপেন সিক্রেট।

ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম অবশ্য জানিয়েছেন, নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি ফি আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে বাতিল করা হবে লাইসেন্স। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে সাধারণ নাগরিকরা মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে যেমন নগরের পরিচ্ছন্নতা সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে নাগরিকদের করের টাকায় পরিচালিত এই সেবার সুফল চলে যাচ্ছে এক শ্রেণির রাজনৈতিক সুবিধাবাদীর পকেটে।

বিষয় : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ময়লা বানিজ্য

রাজধানীর ময়লা-বাণিজ্যে এখন নতুন নিয়ন্ত্রকদের দাপট
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


রাজধানীর ময়লা-বাণিজ্যে এখন নতুন নিয়ন্ত্রকদের দাপট

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

সাহাবুদ্দিন আলী একসময় পুরান ঢাকার সফল লোহালক্কড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ভাগ্য বদলের আশায় পৈতৃক সম্পদ আর জমানো ১২ লাখ টাকা পুঁজি ঢেলে নেমেছিলেন বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের কাজে। কিন্তু ক্ষমতার ঘূর্ণাবর্তে ভাগ্য ফেরা তো দূরে থাক, এখন তিনি স্রেফ নিঃস্ব। রাজধানীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের এই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেবল জোর খাটিয়ে কাজ ছিনিয়ে নিয়েছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। সাহাবুদ্দিনের অপরাধ ছিল একটাই—পটপরিবর্তনের পর তিনি বর্তমান ক্ষমতার 'আশীর্বাদপুষ্ট' তালিকায় ঠাঁই পাননি।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে বর্তমানে নির্বাচিত মেয়র কিংবা কাউন্সিলর নেই। এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে গত ৫ আগস্টের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের একছত্র আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছেন বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা। কেবল কুশীলব বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট কাটার পুরনো রীতি এখনো অটুট।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। ডিএসসিসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়ার বিধান থাকলেও ধানমন্ডি, আজিমপুর, খিলগাঁও কিংবা যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকায় আদায় করা হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে ছোট দোকান বা শরবতের দোকান থেকেও মাসে এক হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার নজির পাওয়া গেছে। রসিদ ছাড়াই চলছে এই বেআইনি অর্থ আদায়।

ডিএসসিসি এলাকায় হোল্ডিং ও ফ্ল্যাট সংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, বর্জ্য সংগ্রহের এই খাত থেকে বছরে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই বিশাল অঙ্কের টাকার মোহেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা মরিয়া হয়ে ওঠেন নিয়ন্ত্রণের জন্য। বাসাবোর ৪ নম্বর ওয়ার্ডে যেমন বৈধ ইজাদারকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য করার পর শেষমেশ জোরপূর্বক কাজ দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এই ‘ময়লা-বাণিজ্য’ এখন ওপেন সিক্রেট।

ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম অবশ্য জানিয়েছেন, নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি ফি আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে বাতিল করা হবে লাইসেন্স। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে সাধারণ নাগরিকরা মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে যেমন নগরের পরিচ্ছন্নতা সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে নাগরিকদের করের টাকায় পরিচালিত এই সেবার সুফল চলে যাচ্ছে এক শ্রেণির রাজনৈতিক সুবিধাবাদীর পকেটে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত