ঢাকা
মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অনেকেরই মেজাজ খারাপ হয়—আপনি লাইনে দাঁড়িয়েও ট্রেনে উঠতে পারলেন না, অথচ ট্রেনটা একটু এগিয়ে যেতেই দেখলেন মাঝের দিকের বগিগুলো প্রায় ফাঁকা! আপনি যেখানে ঠেলাঠেলি করলেন, তার ঠিক দু-বগি পরেই মানুষ আরামে বসে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিড়ম্বনা নয়; প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী একই ভুল করছেন এবং এর পেছনে কাজ করছে গাণিতিক কিছু নিয়ম ও মানুষের সহজাত আচরণ।
প্ল্যাটফর্মের দিকে মনোযোগ দিলে দেখবেন, মানুষ মূলত সিঁড়ির কাছের জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি জড়ো হয়। সিঁড়ি থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ভিড়ের ঘনত্ব তত কমতে থাকে। পরিসংখ্যানে যাকে আমরা 'সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি' বা কেন্দ্রের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বলি, এটি ঠিক তাই। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে থাকা সিঁড়িকে একটি কেন্দ্র ধরে তার আশেপাশে ঘিরে দাঁড়ায়। এর ফলে দুটো সিঁড়ির সামনে দুটো আলাদা 'বেল কার্ভ' বা ঘণ্টার আকৃতির বক্ররেখা তৈরি হয়—অর্থাৎ সিঁড়ির সামনে ভিড় সর্বোচ্চ, আর প্ল্যাটফর্মের দুই প্রান্তে তা সর্বনিম্ন।
এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে 'প্রিন্সিপল অফ লিস্ট এফোর্ট' বা সবচেয়ে কম কষ্টে কাজ সারার প্রবৃত্তি। মানুষ অবচেতনভাবেই সবসময় সবচেয়ে সহজ পথটি বেছে নেয়। আমরা যেমন ‘ধন্যবাদ’ না লিখে দ্রুত লিখতে ‘থ্যাংকস’ বা ‘tnx’ পছন্দ করি, তেমনি মেট্রো থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর কেউ আর অতিরিক্ত পঞ্চাশ-ষাট মিটার হাঁটতে চায় না। একে ভূগোল বা নগর পরিকল্পনার ভাষায় 'ডিস্ট্যান্স ডিকে' বলা হয়—দূরত্ব যত বাড়ে, মানুষের সেই জায়গা ব্যবহারের আগ্রহ তত কমে। ফলে আমরা সিঁড়ির পাশের পরিচিত ভিড়টাকেই নিরাপদ মনে করি, যা আমাদের মনের এক ধরনের 'স্ট্যাটাস কো বায়াস'—আমরা নতুন কিছু বা অজানা জায়গা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি।
অনেকে হয়তো ভাবেন, একদিন সাহস করে দূরের বগিতে গেলে হয়তো অভ্যাসের পরিবর্তন হবে। কিন্তু এখানেও কাজ করে 'রিগ্রেশন টু দ্য মিন' বা গড়ের দিকে ফিরে আসার নিয়ম। কোনো একদিন হয়তো আপনি দূরের বগিতে আরামে চড়লেন, কিন্তু পরের দিন আবার সেই সিঁড়ির কাছের ভিড়েই ফিরে আসবেন। সিস্টেম বা আমাদের সমষ্টিগত অভ্যাস সবসময় তার নিজস্ব গড়ের দিকে ফিরে যায়। এক বছর অস্বাভাবিক ভালো ফসল ফলার পর যেমন পর বছর উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসে, মানুষের প্রতিদিনকার যাতায়াতও ঠিক তেমনি পুরোনো ছকেই ফিরে আসে।
এই যে হাজার হাজার মানুষ কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই সিঁড়ির সামনে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, এটি পদার্থবিজ্ঞানের 'ইমার্জেন্স' ধারণার এক চমৎকার উদাহরণ। প্রত্যেকে আলাদাভাবে নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি সরল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—আর সবার এই সরল সিদ্ধান্তের যোগফলে তৈরি হচ্ছে একটি জটিল প্যাটার্ন। অথচ পুরো সিস্টেমটি পুরোপুরি গাণিতিক এবং এর ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা অনুমান করা সম্ভব।
আগামীকাল স্টেশনে গিয়ে যদি দেখেন সিঁড়ির সামনে মানুষ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে, তবে বিরক্ত না হয়ে বরং এই গণিতটি একবার ভেবে দেখুন। আপনি চাইলে ভিড় এড়িয়ে একটু হাঁটতে পারেন, কিন্তু মনে রাখবেন—আপনার আশেপাশের মানুষেরা সম্ভবত সেই পুরোনো 'গড়পড়তা' অভ্যাসেই ফিরে যাবে। মেট্রোরেলের এই ভিড় আসলে মানুষের মনস্তত্ত্ব আর গাণিতিক প্যাটার্নের এক অদ্ভুত সহাবস্থান।
2.png)
শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অনেকেরই মেজাজ খারাপ হয়—আপনি লাইনে দাঁড়িয়েও ট্রেনে উঠতে পারলেন না, অথচ ট্রেনটা একটু এগিয়ে যেতেই দেখলেন মাঝের দিকের বগিগুলো প্রায় ফাঁকা! আপনি যেখানে ঠেলাঠেলি করলেন, তার ঠিক দু-বগি পরেই মানুষ আরামে বসে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিড়ম্বনা নয়; প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী একই ভুল করছেন এবং এর পেছনে কাজ করছে গাণিতিক কিছু নিয়ম ও মানুষের সহজাত আচরণ।
প্ল্যাটফর্মের দিকে মনোযোগ দিলে দেখবেন, মানুষ মূলত সিঁড়ির কাছের জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি জড়ো হয়। সিঁড়ি থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ভিড়ের ঘনত্ব তত কমতে থাকে। পরিসংখ্যানে যাকে আমরা 'সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি' বা কেন্দ্রের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বলি, এটি ঠিক তাই। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে থাকা সিঁড়িকে একটি কেন্দ্র ধরে তার আশেপাশে ঘিরে দাঁড়ায়। এর ফলে দুটো সিঁড়ির সামনে দুটো আলাদা 'বেল কার্ভ' বা ঘণ্টার আকৃতির বক্ররেখা তৈরি হয়—অর্থাৎ সিঁড়ির সামনে ভিড় সর্বোচ্চ, আর প্ল্যাটফর্মের দুই প্রান্তে তা সর্বনিম্ন।
এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে 'প্রিন্সিপল অফ লিস্ট এফোর্ট' বা সবচেয়ে কম কষ্টে কাজ সারার প্রবৃত্তি। মানুষ অবচেতনভাবেই সবসময় সবচেয়ে সহজ পথটি বেছে নেয়। আমরা যেমন ‘ধন্যবাদ’ না লিখে দ্রুত লিখতে ‘থ্যাংকস’ বা ‘tnx’ পছন্দ করি, তেমনি মেট্রো থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর কেউ আর অতিরিক্ত পঞ্চাশ-ষাট মিটার হাঁটতে চায় না। একে ভূগোল বা নগর পরিকল্পনার ভাষায় 'ডিস্ট্যান্স ডিকে' বলা হয়—দূরত্ব যত বাড়ে, মানুষের সেই জায়গা ব্যবহারের আগ্রহ তত কমে। ফলে আমরা সিঁড়ির পাশের পরিচিত ভিড়টাকেই নিরাপদ মনে করি, যা আমাদের মনের এক ধরনের 'স্ট্যাটাস কো বায়াস'—আমরা নতুন কিছু বা অজানা জায়গা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি।
অনেকে হয়তো ভাবেন, একদিন সাহস করে দূরের বগিতে গেলে হয়তো অভ্যাসের পরিবর্তন হবে। কিন্তু এখানেও কাজ করে 'রিগ্রেশন টু দ্য মিন' বা গড়ের দিকে ফিরে আসার নিয়ম। কোনো একদিন হয়তো আপনি দূরের বগিতে আরামে চড়লেন, কিন্তু পরের দিন আবার সেই সিঁড়ির কাছের ভিড়েই ফিরে আসবেন। সিস্টেম বা আমাদের সমষ্টিগত অভ্যাস সবসময় তার নিজস্ব গড়ের দিকে ফিরে যায়। এক বছর অস্বাভাবিক ভালো ফসল ফলার পর যেমন পর বছর উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসে, মানুষের প্রতিদিনকার যাতায়াতও ঠিক তেমনি পুরোনো ছকেই ফিরে আসে।
এই যে হাজার হাজার মানুষ কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই সিঁড়ির সামনে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, এটি পদার্থবিজ্ঞানের 'ইমার্জেন্স' ধারণার এক চমৎকার উদাহরণ। প্রত্যেকে আলাদাভাবে নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি সরল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—আর সবার এই সরল সিদ্ধান্তের যোগফলে তৈরি হচ্ছে একটি জটিল প্যাটার্ন। অথচ পুরো সিস্টেমটি পুরোপুরি গাণিতিক এবং এর ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা অনুমান করা সম্ভব।
আগামীকাল স্টেশনে গিয়ে যদি দেখেন সিঁড়ির সামনে মানুষ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে, তবে বিরক্ত না হয়ে বরং এই গণিতটি একবার ভেবে দেখুন। আপনি চাইলে ভিড় এড়িয়ে একটু হাঁটতে পারেন, কিন্তু মনে রাখবেন—আপনার আশেপাশের মানুষেরা সম্ভবত সেই পুরোনো 'গড়পড়তা' অভ্যাসেই ফিরে যাবে। মেট্রোরেলের এই ভিড় আসলে মানুষের মনস্তত্ত্ব আর গাণিতিক প্যাটার্নের এক অদ্ভুত সহাবস্থান।
2.png)