দীর্ঘদিন ধরে আমরা শুনে আসছি, কোনো দেশকে শায়েস্তা করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো 'নিষেধাজ্ঞা'। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন কারো ওপর চটে যায়, তখন ডলারের দাপটে সেই দেশের কেনাবেচা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি এক অন্যরকম গল্প বলছে। অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এখন এক সুরে বলছেন—এই নিষেধাজ্ঞার তলোয়ার এখন আর আগের মতো ধারালো নেই। উল্টো এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে পিষে ফেলছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অদ্ভুত মোড়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বজুড়ে ডলারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। তারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক চাপ এই বিকল্প পথ খোঁজার গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মানুষ এখন আর শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে না। বর্তমানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসছে লেনদেনের ধরনে। আমরা যারা মনে করি ক্রিপ্টোকারেন্সি কেবল শৌখিন মানুষের ডিজিটাল সম্পদ, তাদের জন্য অবাক করা তথ্য হলো—ইরান এখন তার বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় একটা অংশ সারছে বিটকয়েন বা এই জাতীয় মুদ্রায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে এসে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা পক্ষগুলোর ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কারণ একটাই, ডিজিটাল এই লেনদেন কোনো দেশ বা ব্যাংক চাইলেই বন্ধ করতে পারে না। এটি কোনো সীমানা মানে না, কোনো 'আঙ্কেল স্যাম'-এর হুকুমও শোনে না। সেই যে ছোটবেলায় সমাজবইয়ে পড়েছিলাম, চালের বদলে ডাল বা তেলের বদলে গম—সেই 'বার্টার সিস্টেম' বা পণ্য বিনিময় প্রথা আবার ফিরে আসছে। আধুনিক যুগে এসে এটি কেবল অভাবের তাড়নায় নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইরান ও শ্রীলঙ্কার কথা ধরা যাক। শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানি তেলের দাম মেটাচ্ছে চা পাতা দিয়ে। ভারত এখন চালের বিনিময়ে তেল নেওয়ার কথা ভাবছে। পাকিস্তানও একই পথে হাঁটছে। এই যে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে লেনদেন, এতে কোনো ডলার লাগছে না। আর ডলার লাগছে না মানেই সেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অকেজো। এমনকি আমাদের এই অঞ্চলের শত বছরের পুরোনো 'হুন্ডি' বা হাওলা ব্যবস্থা, যা একসময় কেবল প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর মাধ্যম ছিল, তা এখন বড় বড় বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের গোপন অংশীদারিত্ব তৈরি হচ্ছে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলো আন্দাজও করতে পারেনি। বিশ্বের জ্বালানি তেলের সিংহভাগ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যখন ইরানের হাতে যায়, তখন তারা এক নতুন বুদ্ধি বের করেছে। তারা সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে 'ট্রানজিট মাশুল' দাবি করছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই টাকা ডলারে নয়, দিতে হচ্ছে বিটকয়েন বা চীনা মুদ্রা 'রেনমিনবি'-তে। বড় বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো যখন দেখছে ডলার ব্যবহার করলে পদে পদে বিপদ আর নজরদারি, তখন তারা বাধ্য হয়েই এই বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে চীনের মুদ্রার মান যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্ববাজারে ডলারের যে একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরছে। সাধারণ মানুষের ভাষায় বললে, "এক দোকানে জিনিস না পাওয়া গেলে মানুষ যেমন পাশের দোকানে যায়, বিশ্ববাণিজ্যও এখন ডলারের দোকান ছেড়ে অন্য দোকানে ভিড় জমাচ্ছে।" অবশ্যই ডলারের দাপট এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দুনিয়ার বেশিরভাগ তেল এখনো ডলারে কেনাবেচা হয়। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—জোর করে কারো মুখ বন্ধ রাখা যায় না। ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই যে রশি টানাটানি, তা শেষ পর্যন্ত ডলারের ওপর মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা একে বলছেন 'অ্যাক্সিস অব ইভেশন' বা নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক জোট। এর ফলে হয়তো ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বর্তমানের বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামোর। যে ডলার একসময় আস্থার প্রতীক ছিল, তা আজ অনেকের কাছে ভয়ের কারণ। আর ভয় থেকেই মানুষ নতুন বিকল্প তৈরি করে। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই—দেয়াল যখন খুব বেশি উঁচু হয়, মানুষ তখন নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে শেখে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি সেই সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পথেই হাঁটছে।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে আমরা শুনে আসছি, কোনো দেশকে শায়েস্তা করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো 'নিষেধাজ্ঞা'। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন কারো ওপর চটে যায়, তখন ডলারের দাপটে সেই দেশের কেনাবেচা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি এক অন্যরকম গল্প বলছে। অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এখন এক সুরে বলছেন—এই নিষেধাজ্ঞার তলোয়ার এখন আর আগের মতো ধারালো নেই। উল্টো এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে পিষে ফেলছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অদ্ভুত মোড়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বজুড়ে ডলারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। তারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক চাপ এই বিকল্প পথ খোঁজার গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মানুষ এখন আর শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে না। বর্তমানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসছে লেনদেনের ধরনে। আমরা যারা মনে করি ক্রিপ্টোকারেন্সি কেবল শৌখিন মানুষের ডিজিটাল সম্পদ, তাদের জন্য অবাক করা তথ্য হলো—ইরান এখন তার বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় একটা অংশ সারছে বিটকয়েন বা এই জাতীয় মুদ্রায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে এসে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা পক্ষগুলোর ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কারণ একটাই, ডিজিটাল এই লেনদেন কোনো দেশ বা ব্যাংক চাইলেই বন্ধ করতে পারে না। এটি কোনো সীমানা মানে না, কোনো 'আঙ্কেল স্যাম'-এর হুকুমও শোনে না। সেই যে ছোটবেলায় সমাজবইয়ে পড়েছিলাম, চালের বদলে ডাল বা তেলের বদলে গম—সেই 'বার্টার সিস্টেম' বা পণ্য বিনিময় প্রথা আবার ফিরে আসছে। আধুনিক যুগে এসে এটি কেবল অভাবের তাড়নায় নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইরান ও শ্রীলঙ্কার কথা ধরা যাক। শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানি তেলের দাম মেটাচ্ছে চা পাতা দিয়ে। ভারত এখন চালের বিনিময়ে তেল নেওয়ার কথা ভাবছে। পাকিস্তানও একই পথে হাঁটছে। এই যে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে লেনদেন, এতে কোনো ডলার লাগছে না। আর ডলার লাগছে না মানেই সেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অকেজো। এমনকি আমাদের এই অঞ্চলের শত বছরের পুরোনো 'হুন্ডি' বা হাওলা ব্যবস্থা, যা একসময় কেবল প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর মাধ্যম ছিল, তা এখন বড় বড় বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের গোপন অংশীদারিত্ব তৈরি হচ্ছে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলো আন্দাজও করতে পারেনি। বিশ্বের জ্বালানি তেলের সিংহভাগ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যখন ইরানের হাতে যায়, তখন তারা এক নতুন বুদ্ধি বের করেছে। তারা সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে 'ট্রানজিট মাশুল' দাবি করছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই টাকা ডলারে নয়, দিতে হচ্ছে বিটকয়েন বা চীনা মুদ্রা 'রেনমিনবি'-তে। বড় বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো যখন দেখছে ডলার ব্যবহার করলে পদে পদে বিপদ আর নজরদারি, তখন তারা বাধ্য হয়েই এই বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে চীনের মুদ্রার মান যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্ববাজারে ডলারের যে একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরছে। সাধারণ মানুষের ভাষায় বললে, "এক দোকানে জিনিস না পাওয়া গেলে মানুষ যেমন পাশের দোকানে যায়, বিশ্ববাণিজ্যও এখন ডলারের দোকান ছেড়ে অন্য দোকানে ভিড় জমাচ্ছে।" অবশ্যই ডলারের দাপট এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দুনিয়ার বেশিরভাগ তেল এখনো ডলারে কেনাবেচা হয়। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—জোর করে কারো মুখ বন্ধ রাখা যায় না। ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই যে রশি টানাটানি, তা শেষ পর্যন্ত ডলারের ওপর মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা একে বলছেন 'অ্যাক্সিস অব ইভেশন' বা নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক জোট। এর ফলে হয়তো ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বর্তমানের বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামোর। যে ডলার একসময় আস্থার প্রতীক ছিল, তা আজ অনেকের কাছে ভয়ের কারণ। আর ভয় থেকেই মানুষ নতুন বিকল্প তৈরি করে। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই—দেয়াল যখন খুব বেশি উঁচু হয়, মানুষ তখন নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে শেখে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি সেই সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পথেই হাঁটছে।
