সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কাউন্টডাউনে সরব রাজনীতি, আলোচনায় সম্ভাব্য উত্তরসূরি যারা

শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হয়েছে। যদিও সরকার বা বঙ্গভবন থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কাউন্টডাউনে সরব রাজনীতি, আলোচনায় সম্ভাব্য উত্তরসূরি যারা
ছবি -সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে ভাবছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপির একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে দলীয় পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

বঙ্গভবনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই বলতেন যে শরীর ভালো নেই এবং যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তিনি এটিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজারকে উন্নত পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে বর্তমানে যা শোনা যাচ্ছে, তা এখনো গুঞ্জনের পর্যায়েই রয়েছে। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তখন প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে।

সংবিধান কী বলছে

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম আক্তার সিদ্দিক বলেন, সংবিধানের ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং পদত্যাগের বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত, নৈতিক কিংবা শারীরিক কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদত্যাগ করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৃত্যু, পদত্যাগ অথবা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আর ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার সাংবিধানিক মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।

সে সময় জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠন ও ছাত্রনেতারা তার পদত্যাগ দাবি করে একাধিক কর্মসূচি পালন করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়নি। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না। সাম্প্রতিক গুঞ্জনের পর সেই আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা চলছে।

রাষ্ট্রপতি পদে যাদের নাম আলোচনায়

বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের মতো অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তাদের মতে, দলের বাইরে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এবং ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হলেও ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৮৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন।

ড. আব্দুল মঈন খান বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মোমেন খানের ছেলে এবং ২০০১ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

অন্যদিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য। কুমিল্লা-২ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ কিংবা উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার, বঙ্গভবন বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক আলোচনা ও জল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, সরকার গঠন, শপথ অনুষ্ঠান, সংসদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সে কারণে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যতই জোরালো হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব অবস্থান এবং সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ওপর।

তবে একাধিক সূত্রের তথ্য, চলমান রাজনৈতিক আলোচনা এবং সরকারের সতর্ক অবস্থান—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বিষয় : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬


রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কাউন্টডাউনে সরব রাজনীতি, আলোচনায় সম্ভাব্য উত্তরসূরি যারা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে ভাবছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপির একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে দলীয় পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

বঙ্গভবনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই বলতেন যে শরীর ভালো নেই এবং যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তিনি এটিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজারকে উন্নত পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে বর্তমানে যা শোনা যাচ্ছে, তা এখনো গুঞ্জনের পর্যায়েই রয়েছে। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তখন প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে।

সংবিধান কী বলছে

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম আক্তার সিদ্দিক বলেন, সংবিধানের ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং পদত্যাগের বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত, নৈতিক কিংবা শারীরিক কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদত্যাগ করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৃত্যু, পদত্যাগ অথবা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আর ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার সাংবিধানিক মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।

সে সময় জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠন ও ছাত্রনেতারা তার পদত্যাগ দাবি করে একাধিক কর্মসূচি পালন করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়নি। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না। সাম্প্রতিক গুঞ্জনের পর সেই আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা চলছে।

রাষ্ট্রপতি পদে যাদের নাম আলোচনায়

বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের মতো অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তাদের মতে, দলের বাইরে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এবং ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হলেও ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৮৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন।

ড. আব্দুল মঈন খান বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মোমেন খানের ছেলে এবং ২০০১ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

অন্যদিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য। কুমিল্লা-২ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ কিংবা উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার, বঙ্গভবন বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক আলোচনা ও জল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, সরকার গঠন, শপথ অনুষ্ঠান, সংসদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সে কারণে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যতই জোরালো হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব অবস্থান এবং সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ওপর।

তবে একাধিক সূত্রের তথ্য, চলমান রাজনৈতিক আলোচনা এবং সরকারের সতর্ক অবস্থান—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত