সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

ভারতের অপেক্ষায় আর নয়: নদী বাঁচাতে চীনের দিকে ঢাকা

দশকের পর দশক কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আশার বাণী শোনালেও মেলেনি পানির ন্যায্য হিস্যা, তাই এবার অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় আমূল কৌশল বদলাচ্ছে ঢাকা।

ভারতের অপেক্ষায় আর নয়: নদী বাঁচাতে চীনের দিকে ঢাকা
ছবি -সংগৃহীত


ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতায় দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। দশকের পর দশক কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আশার বাণী শোনালেও মেলেনি পানির ন্যায্য হিস্যা, তাই এবার অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় আমূল কৌশল বদলাচ্ছে ঢাকা। শুষ্ক মৌসুমে খরা, লবণাক্ততা আর নদী শুকিয়ে যাওয়ার বিপর্যয় রুখতে প্রতিবেশী ভারতের উদাসীনতাকে পাশ কাটিয়ে এখন বেইজিংয়ের সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ।

বছরের পর বছর ধরে গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের গড়িমসি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ‘রিভার্স অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—দেশের অন্তত ৭৯টি নদী হয় শুকিয়ে গেছে, নয়তো শুকিয়ে যাওয়ার পথে। বিশেষ করে ৫০ বছরের পুরোনো ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে মরুকরণ ও লবণাক্ততা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে, অথচ এর নবায়ন নিয়েও কোনো ইতিবাচক সাড়া নেই।

আর কত অপেক্ষায় থাকবে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদী মেগা প্রকল্পের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ ও সংশোধিত ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’ এখন ঢাকার অগ্রাধিকার তালিকায়। বর্ষা মৌসুমে উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহারের মাধ্যমে পানির সংকট কাটানোই এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। চীনের অর্থায়নে নদীশাসন ও ভূমি পুনরুদ্ধারের এই প্রকল্পগুলো কেবল ভাঙন রোধ করবে না, বরং কৃষিনির্ভর এই জনপদকে রক্ষা করার নতুন পথ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই প্রকল্পগুলোর ওপর চীনের অংশগ্রহণ ভারতের জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছে হওয়ায় নয়াদিল্লি এখানে বাইরের হস্তক্ষেপ চায় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ঢাকা আজ বাধ্য হয়ে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, তিস্তা কোনো নিরাপত্তা ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার লড়াই। ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ বছরের পর বছর উন্নয়ন আটকে রেখে কেবল দীর্ঘশ্বাসের অপেক্ষায় থাকতে পারে না।

চীনের সহায়তায় বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন সরলও নয়। পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। ভূতত্ত্ববিদ ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, বরং উজানের পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা ছাড়া ব্যারেজ দিয়ে সুফল পাওয়া কঠিন। তবে কূটনীতির ব্যর্থতায় যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায়, তখন নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্পও নেই সরকারের সামনে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনের আওতায় কূটনৈতিক দরকষাকষির পাশাপাশি নিজস্ব নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নই এখন সময়ের দাবি। পানি না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশ যদি নিজের নদীগুলোকে সচল রাখতে পারে, তবেই হয়তো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পানি রাজনীতিতে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ভারতের উজান থেকে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া এই নদী সংকট মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য যে অত্যন্ত দুরূহ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

বিষয় : বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক চীন বাংলাদেশ পানির সংকট গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন

ভারতের অপেক্ষায় আর নয়: নদী বাঁচাতে চীনের দিকে ঢাকা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


ভারতের অপেক্ষায় আর নয়: নদী বাঁচাতে চীনের দিকে ঢাকা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image


ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতায় দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। দশকের পর দশক কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আশার বাণী শোনালেও মেলেনি পানির ন্যায্য হিস্যা, তাই এবার অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় আমূল কৌশল বদলাচ্ছে ঢাকা। শুষ্ক মৌসুমে খরা, লবণাক্ততা আর নদী শুকিয়ে যাওয়ার বিপর্যয় রুখতে প্রতিবেশী ভারতের উদাসীনতাকে পাশ কাটিয়ে এখন বেইজিংয়ের সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ।

বছরের পর বছর ধরে গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের গড়িমসি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ‘রিভার্স অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—দেশের অন্তত ৭৯টি নদী হয় শুকিয়ে গেছে, নয়তো শুকিয়ে যাওয়ার পথে। বিশেষ করে ৫০ বছরের পুরোনো ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে মরুকরণ ও লবণাক্ততা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে, অথচ এর নবায়ন নিয়েও কোনো ইতিবাচক সাড়া নেই।

আর কত অপেক্ষায় থাকবে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদী মেগা প্রকল্পের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ ও সংশোধিত ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’ এখন ঢাকার অগ্রাধিকার তালিকায়। বর্ষা মৌসুমে উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহারের মাধ্যমে পানির সংকট কাটানোই এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। চীনের অর্থায়নে নদীশাসন ও ভূমি পুনরুদ্ধারের এই প্রকল্পগুলো কেবল ভাঙন রোধ করবে না, বরং কৃষিনির্ভর এই জনপদকে রক্ষা করার নতুন পথ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই প্রকল্পগুলোর ওপর চীনের অংশগ্রহণ ভারতের জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছে হওয়ায় নয়াদিল্লি এখানে বাইরের হস্তক্ষেপ চায় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ঢাকা আজ বাধ্য হয়ে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, তিস্তা কোনো নিরাপত্তা ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার লড়াই। ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ বছরের পর বছর উন্নয়ন আটকে রেখে কেবল দীর্ঘশ্বাসের অপেক্ষায় থাকতে পারে না।

চীনের সহায়তায় বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন সরলও নয়। পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। ভূতত্ত্ববিদ ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, বরং উজানের পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা ছাড়া ব্যারেজ দিয়ে সুফল পাওয়া কঠিন। তবে কূটনীতির ব্যর্থতায় যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায়, তখন নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্পও নেই সরকারের সামনে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনের আওতায় কূটনৈতিক দরকষাকষির পাশাপাশি নিজস্ব নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নই এখন সময়ের দাবি। পানি না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশ যদি নিজের নদীগুলোকে সচল রাখতে পারে, তবেই হয়তো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পানি রাজনীতিতে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ভারতের উজান থেকে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া এই নদী সংকট মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য যে অত্যন্ত দুরূহ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত