অর্থনীতি
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভয়াবহ লুটপাটের কারণে প্রায় রিক্ত। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার শিক্ষক এবং অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে দেশের অর্থনীতির এই ক্ষতবিক্ষত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানিয়েছেন, কেবল ব্যাংকিং খাত থেকেই লুট করা হয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৬৬ শতাংশের সমান। যখন সরকার এডিপি বাস্তবায়নে হিমশিম খায়, তখন এই বিশাল পরিমাণ অর্থের লোপাট অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
লুটেরাদের তালিকায় এস আলম গ্রুপের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ড. জহিরুল ইসলামের ভাষ্যমতে, এস আলম গ্রুপ এককভাবে যে পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে, তা আসন্ন অর্থবছরের পুরো এডিপির বাজেটের সমান। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সরকার যেখানে এডিপি বাস্তবায়নে অর্থ সংকটে ভোগে, সেখানে এই অর্থের একটি বড় অংশ পাচার ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রে হারিয়ে গেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি জানান, এটি একটি বাজেটের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে।
বর্তমান ব্যাংকিং খাতের এই দুর্দশার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অদূরদর্শী নেতৃত্বকে দায়ী করছেন এই অর্থনীতিবিদ। ড. জহিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্বের বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমএ পাস একাউন্ট্যান্টকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাটি তিনি বিশ্বরেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ সুদানের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিধারী অর্থনীতিবিদ। এ ধরনের নিয়োগের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও তলানিতে ঠেকেছে।
বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, এই আইনের মাধ্যমে ব্যাংক লুটেরাদেরই নতুন করে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে আছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা যদি অর্থনীতিতে সক্রিয় থাকত, তবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে আর হিমশিম খেতে হতো না।
পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল প্রশাসনিক রদবদলই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ড. জহিরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পুরোপুরি স্বাধীন করার দাবি জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ঢেলে সাজানো এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই খাতকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের যে মূল চেতনা—সংস্কার ও ন্যায়বিচার—তাকে ধারণ করে ব্যাংকিং খাতের এই জঞ্জাল দূর করতেই হবে, অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভয়াবহ লুটপাটের কারণে প্রায় রিক্ত। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার শিক্ষক এবং অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে দেশের অর্থনীতির এই ক্ষতবিক্ষত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানিয়েছেন, কেবল ব্যাংকিং খাত থেকেই লুট করা হয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৬৬ শতাংশের সমান। যখন সরকার এডিপি বাস্তবায়নে হিমশিম খায়, তখন এই বিশাল পরিমাণ অর্থের লোপাট অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
লুটেরাদের তালিকায় এস আলম গ্রুপের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ড. জহিরুল ইসলামের ভাষ্যমতে, এস আলম গ্রুপ এককভাবে যে পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে, তা আসন্ন অর্থবছরের পুরো এডিপির বাজেটের সমান। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সরকার যেখানে এডিপি বাস্তবায়নে অর্থ সংকটে ভোগে, সেখানে এই অর্থের একটি বড় অংশ পাচার ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রে হারিয়ে গেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি জানান, এটি একটি বাজেটের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে।
বর্তমান ব্যাংকিং খাতের এই দুর্দশার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অদূরদর্শী নেতৃত্বকে দায়ী করছেন এই অর্থনীতিবিদ। ড. জহিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্বের বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমএ পাস একাউন্ট্যান্টকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাটি তিনি বিশ্বরেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ সুদানের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিধারী অর্থনীতিবিদ। এ ধরনের নিয়োগের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও তলানিতে ঠেকেছে।
বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, এই আইনের মাধ্যমে ব্যাংক লুটেরাদেরই নতুন করে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে আছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা যদি অর্থনীতিতে সক্রিয় থাকত, তবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে আর হিমশিম খেতে হতো না।
পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল প্রশাসনিক রদবদলই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ড. জহিরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পুরোপুরি স্বাধীন করার দাবি জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ঢেলে সাজানো এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই খাতকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের যে মূল চেতনা—সংস্কার ও ন্যায়বিচার—তাকে ধারণ করে ব্যাংকিং খাতের এই জঞ্জাল দূর করতেই হবে, অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।
2.png)