বানিজ্য
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত এখন নতুন এক কৌশলের দিকে হাঁটছে—যার কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। জ্বালানি পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলের তুলনায় চলতি মে মাসে ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ পারাপার হয়। কিন্তু চলমান সামরিক উত্তেজনায় এই নৌপথ বিপৎসংকুল হয়ে ওঠায় ভারত এখন সৌদি আরবের মতো চিরাচরিত উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্পের সন্ধানে নেমেছে। অথচ এপ্রিল মাসে সৌদি আরব থেকে ভারতের তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ইরান থেকে তেল আমদানির পথও এখন মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে কার্যত রুদ্ধ। এমন নাজুক সময়ে ভারতের সামনে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির দরজা খুলে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে আছেন। তাঁর এই সফরের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো, রাশিয়ার তেল থেকে ভারতকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আগ্রহী করে তোলা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সস্তায় রুশ তেল কিনে ভারত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও, ওয়াশিংটন এ নিয়ে বেশ বিরক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই তেল বিক্রির অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে। এখন ওয়াশিংটন চাচ্ছে, ভারত যেন রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ভেনেজুয়েলার তেল কেনা বাড়ায়।
ভেনেজুয়েলার তেল মজুত বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি, প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই বিশাল সম্পদ বিশ্ববাজারে সেভাবে পৌঁছাতে পারেনি। তবে চলতি বছরের শুরুতে মাদুরো সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন সেখানে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ভারতের গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শোধনাগারগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ফলে ভারত ও ভেনেজুয়েলার এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি নতুন জ্বালানি জোট গড়ার চেষ্টা করছে, যেখানে ভারত হবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এর মাধ্যমে একদিকে ইরানের প্রভাব খর্ব করা, অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রভাববলয় শক্তিশালী করাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই বহুমাত্রিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর ভিত্তি করে চলে। রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি অংশীদারিত্ব বাড়াতে গিয়ে ভারত কোনো এক শিবিরে পুরোপুরি আটকা পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট এই বড় ধরনের ধাক্কা যে কেবল অর্থনীতির নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, তা বলাই বাহুল্য।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত এখন নতুন এক কৌশলের দিকে হাঁটছে—যার কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। জ্বালানি পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলের তুলনায় চলতি মে মাসে ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ পারাপার হয়। কিন্তু চলমান সামরিক উত্তেজনায় এই নৌপথ বিপৎসংকুল হয়ে ওঠায় ভারত এখন সৌদি আরবের মতো চিরাচরিত উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্পের সন্ধানে নেমেছে। অথচ এপ্রিল মাসে সৌদি আরব থেকে ভারতের তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ইরান থেকে তেল আমদানির পথও এখন মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে কার্যত রুদ্ধ। এমন নাজুক সময়ে ভারতের সামনে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির দরজা খুলে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে আছেন। তাঁর এই সফরের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো, রাশিয়ার তেল থেকে ভারতকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আগ্রহী করে তোলা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সস্তায় রুশ তেল কিনে ভারত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও, ওয়াশিংটন এ নিয়ে বেশ বিরক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই তেল বিক্রির অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে। এখন ওয়াশিংটন চাচ্ছে, ভারত যেন রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ভেনেজুয়েলার তেল কেনা বাড়ায়।
ভেনেজুয়েলার তেল মজুত বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি, প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই বিশাল সম্পদ বিশ্ববাজারে সেভাবে পৌঁছাতে পারেনি। তবে চলতি বছরের শুরুতে মাদুরো সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন সেখানে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ভারতের গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শোধনাগারগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ফলে ভারত ও ভেনেজুয়েলার এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি নতুন জ্বালানি জোট গড়ার চেষ্টা করছে, যেখানে ভারত হবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এর মাধ্যমে একদিকে ইরানের প্রভাব খর্ব করা, অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রভাববলয় শক্তিশালী করাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই বহুমাত্রিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর ভিত্তি করে চলে। রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি অংশীদারিত্ব বাড়াতে গিয়ে ভারত কোনো এক শিবিরে পুরোপুরি আটকা পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট এই বড় ধরনের ধাক্কা যে কেবল অর্থনীতির নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, তা বলাই বাহুল্য।
2.png)