সম্পাদকীয়
কয়েক বছর আগের কথা মনে করুন। কোনো বিচারপতি
যদি তরুণদের 'তেলাপোকা' বলতেন, পত্রিকায় দু'দিন সমালোচনা হতো, তারপর চুপ। কিন্তু
এখন সময় বদলেছে। সেই অবজ্ঞাটুকুকেই লাখো তরুণ হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে—আর সেই
হাতিয়ারের নাম 'ককরোচ জনতা পার্টি'।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য
কান্ত গত সপ্তাহে কিছু বেকার তরুণকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন,
এরা চাকরি পায় না, পেশায় জায়গা করতে পারে না, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায়
অ্যাক্টিভিজম করে বেড়ায়। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ভুয়া ডিগ্রিধারীদের কথা
বলেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ধরে গেছে।
অভিজিৎ দিপকে নামে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র
ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ সেই মন্তব্যকে উল্টো ব্যবহার করলেন। তেলাপোকাকেই প্রতীক
বানালেন। আর পাঁচ দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে দেড় কোটি অনুসারী—যেখানে বিশ্বের
বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দাবিদার বিজেপির অনুসারী মাত্র ৯০ লাখের কম।
এটা কি শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার খেলা? নাকি এর
ভেতরে অন্য কিছুর ইঙ্গিত আছে?
হাস্যরস যখন হয়ে ওঠে প্রতিরোধ
রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ইতিহাসের পুরনো অস্ত্র। কিন্তু
ডিজিটাল যুগে এর গতি ও বিস্তার আগের সব হিসাব উল্টে দিয়েছে।
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় মিসর, তিউনিসিয়া
বা লিবিয়ার তরুণেরা ফেসবুক-টুইটার ব্যবহার করে রাস্তায় নেমেছিল। সেই আন্দোলনগুলো
নিয়ে পরে অনেক সমালোচনা হয়েছে—কোথাও গণতন্ত্র এসেছে, কোথাও আসেনি। কিন্তু একটা
বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জনমত গঠনের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে
দিয়েছে।
কোরিয়াতেও দেখা গেছে এমন দৃষ্টান্ত। ২০১৬-১৭
সালে প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে মিম ও অনলাইন
ব্যঙ্গ বড় ভূমিকা রেখেছিল। তরুণেরা মোমবাতি হাতে রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু সেই
নামার আগে অনলাইনে মাসের পর মাস আলোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক কন্টেন্ট তৈরি হয়েছিল।
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলনে কিংবা ব্রাজিলে
বলসোনারো-সমালোচনায় মিম কালচার রাজনৈতিক চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে
উঠেছিল।
সিজেপির ঘটনাটা এই ধারারই সর্বশেষ বড় উদাহরণ।
তবে এটি একটু আলাদা—কারণ এটি শুধু কোনো নেতার বিরুদ্ধে নয়, একটি ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের তরুণ: সংখ্যায় বিশাল, সুযোগে বঞ্চিত
ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি
তরুণ। বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। কাগজে-কলমে এটা একটা বিশাল 'ডেমোগ্রাফিক
ডিভিডেন্ড'। কিন্তু বাস্তবে?
প্রতি বছর প্রায় এক কোটি তরুণ চাকরির বাজারে
আসে। সরকারি তথ্যই বলছে, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ডেলয়েট গ্লোবালের
সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, ভারতের জেন-জি প্রজন্ম ভয়াবহ আর্থিক চাপে
আছে—বাড়িভাড়া মেটানো কঠিন, সঞ্চয় করা তো দূরের কথা।
এর ওপরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলো রীতিমতো
মনোবল ভেঙে দিয়েছে। জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায়
প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থীর বছরের পর বছরের পরিশ্রম বৃথা গেছে। এই একটি ঘটনা ভারতের
কোটি পরিবারে যে হতাশা ছড়িয়েছে, তা পরিমাপ করার কোনো উপায় নেই।
তাহলে ক্ষোভটা কোথায় যাবে? কার দিকে অভিযোগের তীর
ছোঁড়া হবে? রাজনৈতিক দলের দিকে? সেখানে তরুণদের
জায়গা কই? ভোটে? সেটা পাঁচ বছরে একবার। রাস্তায়? সেখানে ঝুঁকি আছে। তাই এই
প্রজন্ম খুঁজে নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম, মিম আর ব্যঙ্গের ভাষা।
দক্ষিণ এশিয়ার প্যাটার্ন: বাংলাদেশ থেকে নেপাল
বাংলাদেশের কথা আমরা নিজেরাই জানি। ২০২৪ সালে
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ছোট একটি দাবি নিয়ে। কিন্তু যখন সেই দাবি
উপেক্ষা করা হলো, যখন ছাত্রদের ওপর বল প্রয়োগ হলো—তখন সেই আন্দোলন রূপ নিল এক
ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। নেতৃত্বে ছিল সেই একই জেন-জি প্রজন্ম, যারা
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে বড় হয়েছে, মিম বানাতে জানে, কিন্তু প্রয়োজনে রাস্তায়ও
নামতে পারে।
নেপালেও গত কয়েক বছরে তরুণদের নেতৃত্বে
সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের সময়
তরুণেরা রাষ্ট্রপতির বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। সেই দৃশ্যগুলো সারা বিশ্ব দেখেছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিজে অবশ্য
সতর্ক করছেন—ভারতের আন্দোলনকে বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি বলছেন, এটি সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে থেকে, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথে
এগোবে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ-ক্ষোভের যে ভূকম্পন, তা ইতিমধ্যেই ভারতেও পৌঁছে
গেছে—এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
'তেলাপোকা' কেন এত শক্তিশালী প্রতীক
তেলাপোকা বেঁচে থাকে। যেকোনো পরিবেশে, যেকোনো
বিপদে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরেও তেলাপোকা বেঁচে থাকে—এই মিথটা বৈজ্ঞানিকভাবে
পুরো সত্য না হলেও লোকস্মৃতিতে গেঁথে আছে।
লক্ষ্ণৌর ২৬ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ কানৌজিয়া
বলেছেন ঠিক কথাই: তেলাপোকা স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। প্রতিটি চ্যালেঞ্জের পর আরও
শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
যে প্রধান বিচারপতি এই তুলনাটা করেছিলেন
অবজ্ঞার ভাষায়, তরুণেরা সেটাকেই গৌরবের ব্যাজ বানিয়ে বুকে লাগিয়ে নিল। এই
রূপান্তরটাই সিজেপির সবচেয়ে চমৎকার দিক। অপমানকে উৎসবে বদলে দেওয়ার এই ক্ষমতাটা
নতুন প্রজন্মের নিজস্ব। যেমন বাংলাদেশের জেন-জি রা নিজেদেরকে রাজাকার ব্যাজে মুড়ে নিয়ে
রাস্তায় নেমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছিলো।
ডিজিটাল প্রতিবাদ কি আসল পরিবর্তন আনতে পারে?
সমালোচকেরা বলছেন, এটা নিছক একটা ভাইরাল
ট্রেন্ড। কদিন পরে মিলিয়ে যাবে। অনলাইন ফলোয়ার রাজনৈতিক ভোটে পরিণত হয় না।
এই সমালোচনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি এখনো মাঠপর্যায়ের সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। সোশ্যাল
মিডিয়ায় দেড় কোটি ফলোয়ার মানেই লোকসভায় একটা আসন নয়।
কিন্তু এই যুক্তিটা অসম্পূর্ণ।
প্রথমত, সিজেপি ইতিমধ্যে গুগল ফর্মের মাধ্যমে
চার লাখের বেশি স্বেচ্ছাসেবক পেয়েছে। এদের ৭০ শতাংশেরও বেশির বয়স ১৯ থেকে ২৫
বছর। এতটুকু একটা বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি হয়ে উঠার জন্য যথেষ্ঠ।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনটি রাজপথে গড়াচ্ছে। তরুণেরা
তেলাপোকার পোশাক পরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। অনলাইন থেকে অফলাইনের এই যাত্রাটা
গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখুন। ভারতে
সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে, যে
আন্দোলনকে অর্থহীন মনে করা হয়, তাকে সরকার চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না।
চতুর্থত—এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই আন্দোলন
একটা আলোচনার জায়গা তৈরি করছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, গণমাধ্যমের
স্বাধীনতা—এই বিষয়গুলো এখন কোটি মানুষের নিউজফিডে। এটা ছোট অর্জন নয়।একটা বট বৃক্ষের
বীজ হতেও পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য নিছক প্রতিবেশীর
গল্প নয়।
আমাদের দেশেও একইরকম প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে।
শিক্ষিত বেকার তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়।
রাজনৈতিক পরিসরে তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত। আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা
প্রতি বছর বাড়ছে।
বাংলাদেশ ২০২৪-এ দেখিয়েছে, ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত তরুণ প্রজন্ম কী করতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা এখন নীতিনির্ধারকদের
কাছে বড় সংকেত হওয়া উচিত।
তরুণদের ক্ষোভকে উপেক্ষা করলে তা জমতে থাকে।
একটা সময় গিয়ে সেই ক্ষোভ আর হাস্যরসের ছলে থাকে না, রাস্তায় নেমে আসে।
বাংলাদেশ সরকারের—এবং রাজনৈতিক দলগুলোর—উচিত
তরুণ প্রজন্মের জন্য কার্যকর কর্মসংস্থান নীতি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করা। শুধু ভোটের আগে তরুণ মুখ দিয়ে
বক্তৃতা দিলে হবে না। দুই একটা আসন আর মন্ত্রীত্ব দিয়ে পুরো প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব
নিশ্চিত হয় না।
তেলাপোকা যখন ফিরে আসে
সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার কয়েক
মিনিটের মধ্যে অভিজিৎ নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট দিলেন: "তেলাপোকা ফিরে
এসেছে। ভাবলেন আমাদের সরিয়ে দিতে পারবেন?"
এই একটি মন্তব্যে পুরো আন্দোলনের দর্শন আছে।
দাবিয়ে রাখার চেষ্টা এই প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করে। অবজ্ঞা এদের আরও সংগঠিত
করে। এটা বোঝার সময় হয়েছে।
ভারতের তরুণেরা এখন বলছে: আমরা আছি, আমরা থাকব,
আমরা কথা বলব।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকদের জন্য এটা একটা
সতর্কবার্তা। আর বাকি সবার জন্য এটা একটা নতুন যুগের সংকেত—যেখানে তরুণদের উপেক্ষা
করার সুযোগ আর নেই।
বিষয় : সিজেপি ককরোচ জনতা পার্টি'
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
কয়েক বছর আগের কথা মনে করুন। কোনো বিচারপতি
যদি তরুণদের 'তেলাপোকা' বলতেন, পত্রিকায় দু'দিন সমালোচনা হতো, তারপর চুপ। কিন্তু
এখন সময় বদলেছে। সেই অবজ্ঞাটুকুকেই লাখো তরুণ হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে—আর সেই
হাতিয়ারের নাম 'ককরোচ জনতা পার্টি'।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য
কান্ত গত সপ্তাহে কিছু বেকার তরুণকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন,
এরা চাকরি পায় না, পেশায় জায়গা করতে পারে না, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায়
অ্যাক্টিভিজম করে বেড়ায়। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ভুয়া ডিগ্রিধারীদের কথা
বলেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ধরে গেছে।
অভিজিৎ দিপকে নামে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র
ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ সেই মন্তব্যকে উল্টো ব্যবহার করলেন। তেলাপোকাকেই প্রতীক
বানালেন। আর পাঁচ দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে দেড় কোটি অনুসারী—যেখানে বিশ্বের
বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দাবিদার বিজেপির অনুসারী মাত্র ৯০ লাখের কম।
এটা কি শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার খেলা? নাকি এর
ভেতরে অন্য কিছুর ইঙ্গিত আছে?
হাস্যরস যখন হয়ে ওঠে প্রতিরোধ
রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ইতিহাসের পুরনো অস্ত্র। কিন্তু
ডিজিটাল যুগে এর গতি ও বিস্তার আগের সব হিসাব উল্টে দিয়েছে।
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় মিসর, তিউনিসিয়া
বা লিবিয়ার তরুণেরা ফেসবুক-টুইটার ব্যবহার করে রাস্তায় নেমেছিল। সেই আন্দোলনগুলো
নিয়ে পরে অনেক সমালোচনা হয়েছে—কোথাও গণতন্ত্র এসেছে, কোথাও আসেনি। কিন্তু একটা
বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জনমত গঠনের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে
দিয়েছে।
কোরিয়াতেও দেখা গেছে এমন দৃষ্টান্ত। ২০১৬-১৭
সালে প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে মিম ও অনলাইন
ব্যঙ্গ বড় ভূমিকা রেখেছিল। তরুণেরা মোমবাতি হাতে রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু সেই
নামার আগে অনলাইনে মাসের পর মাস আলোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক কন্টেন্ট তৈরি হয়েছিল।
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলনে কিংবা ব্রাজিলে
বলসোনারো-সমালোচনায় মিম কালচার রাজনৈতিক চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে
উঠেছিল।
সিজেপির ঘটনাটা এই ধারারই সর্বশেষ বড় উদাহরণ।
তবে এটি একটু আলাদা—কারণ এটি শুধু কোনো নেতার বিরুদ্ধে নয়, একটি ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের তরুণ: সংখ্যায় বিশাল, সুযোগে বঞ্চিত
ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি
তরুণ। বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। কাগজে-কলমে এটা একটা বিশাল 'ডেমোগ্রাফিক
ডিভিডেন্ড'। কিন্তু বাস্তবে?
প্রতি বছর প্রায় এক কোটি তরুণ চাকরির বাজারে
আসে। সরকারি তথ্যই বলছে, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ডেলয়েট গ্লোবালের
সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, ভারতের জেন-জি প্রজন্ম ভয়াবহ আর্থিক চাপে
আছে—বাড়িভাড়া মেটানো কঠিন, সঞ্চয় করা তো দূরের কথা।
এর ওপরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলো রীতিমতো
মনোবল ভেঙে দিয়েছে। জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায়
প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থীর বছরের পর বছরের পরিশ্রম বৃথা গেছে। এই একটি ঘটনা ভারতের
কোটি পরিবারে যে হতাশা ছড়িয়েছে, তা পরিমাপ করার কোনো উপায় নেই।
তাহলে ক্ষোভটা কোথায় যাবে? কার দিকে অভিযোগের তীর
ছোঁড়া হবে? রাজনৈতিক দলের দিকে? সেখানে তরুণদের
জায়গা কই? ভোটে? সেটা পাঁচ বছরে একবার। রাস্তায়? সেখানে ঝুঁকি আছে। তাই এই
প্রজন্ম খুঁজে নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম, মিম আর ব্যঙ্গের ভাষা।
দক্ষিণ এশিয়ার প্যাটার্ন: বাংলাদেশ থেকে নেপাল
বাংলাদেশের কথা আমরা নিজেরাই জানি। ২০২৪ সালে
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ছোট একটি দাবি নিয়ে। কিন্তু যখন সেই দাবি
উপেক্ষা করা হলো, যখন ছাত্রদের ওপর বল প্রয়োগ হলো—তখন সেই আন্দোলন রূপ নিল এক
ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। নেতৃত্বে ছিল সেই একই জেন-জি প্রজন্ম, যারা
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে বড় হয়েছে, মিম বানাতে জানে, কিন্তু প্রয়োজনে রাস্তায়ও
নামতে পারে।
নেপালেও গত কয়েক বছরে তরুণদের নেতৃত্বে
সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের সময়
তরুণেরা রাষ্ট্রপতির বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। সেই দৃশ্যগুলো সারা বিশ্ব দেখেছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিজে অবশ্য
সতর্ক করছেন—ভারতের আন্দোলনকে বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি বলছেন, এটি সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে থেকে, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথে
এগোবে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ-ক্ষোভের যে ভূকম্পন, তা ইতিমধ্যেই ভারতেও পৌঁছে
গেছে—এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
'তেলাপোকা' কেন এত শক্তিশালী প্রতীক
তেলাপোকা বেঁচে থাকে। যেকোনো পরিবেশে, যেকোনো
বিপদে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরেও তেলাপোকা বেঁচে থাকে—এই মিথটা বৈজ্ঞানিকভাবে
পুরো সত্য না হলেও লোকস্মৃতিতে গেঁথে আছে।
লক্ষ্ণৌর ২৬ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ কানৌজিয়া
বলেছেন ঠিক কথাই: তেলাপোকা স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। প্রতিটি চ্যালেঞ্জের পর আরও
শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
যে প্রধান বিচারপতি এই তুলনাটা করেছিলেন
অবজ্ঞার ভাষায়, তরুণেরা সেটাকেই গৌরবের ব্যাজ বানিয়ে বুকে লাগিয়ে নিল। এই
রূপান্তরটাই সিজেপির সবচেয়ে চমৎকার দিক। অপমানকে উৎসবে বদলে দেওয়ার এই ক্ষমতাটা
নতুন প্রজন্মের নিজস্ব। যেমন বাংলাদেশের জেন-জি রা নিজেদেরকে রাজাকার ব্যাজে মুড়ে নিয়ে
রাস্তায় নেমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছিলো।
ডিজিটাল প্রতিবাদ কি আসল পরিবর্তন আনতে পারে?
সমালোচকেরা বলছেন, এটা নিছক একটা ভাইরাল
ট্রেন্ড। কদিন পরে মিলিয়ে যাবে। অনলাইন ফলোয়ার রাজনৈতিক ভোটে পরিণত হয় না।
এই সমালোচনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি এখনো মাঠপর্যায়ের সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। সোশ্যাল
মিডিয়ায় দেড় কোটি ফলোয়ার মানেই লোকসভায় একটা আসন নয়।
কিন্তু এই যুক্তিটা অসম্পূর্ণ।
প্রথমত, সিজেপি ইতিমধ্যে গুগল ফর্মের মাধ্যমে
চার লাখের বেশি স্বেচ্ছাসেবক পেয়েছে। এদের ৭০ শতাংশেরও বেশির বয়স ১৯ থেকে ২৫
বছর। এতটুকু একটা বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি হয়ে উঠার জন্য যথেষ্ঠ।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনটি রাজপথে গড়াচ্ছে। তরুণেরা
তেলাপোকার পোশাক পরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। অনলাইন থেকে অফলাইনের এই যাত্রাটা
গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখুন। ভারতে
সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে, যে
আন্দোলনকে অর্থহীন মনে করা হয়, তাকে সরকার চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না।
চতুর্থত—এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই আন্দোলন
একটা আলোচনার জায়গা তৈরি করছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, গণমাধ্যমের
স্বাধীনতা—এই বিষয়গুলো এখন কোটি মানুষের নিউজফিডে। এটা ছোট অর্জন নয়।একটা বট বৃক্ষের
বীজ হতেও পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য নিছক প্রতিবেশীর
গল্প নয়।
আমাদের দেশেও একইরকম প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে।
শিক্ষিত বেকার তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়।
রাজনৈতিক পরিসরে তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত। আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা
প্রতি বছর বাড়ছে।
বাংলাদেশ ২০২৪-এ দেখিয়েছে, ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত তরুণ প্রজন্ম কী করতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা এখন নীতিনির্ধারকদের
কাছে বড় সংকেত হওয়া উচিত।
তরুণদের ক্ষোভকে উপেক্ষা করলে তা জমতে থাকে।
একটা সময় গিয়ে সেই ক্ষোভ আর হাস্যরসের ছলে থাকে না, রাস্তায় নেমে আসে।
বাংলাদেশ সরকারের—এবং রাজনৈতিক দলগুলোর—উচিত
তরুণ প্রজন্মের জন্য কার্যকর কর্মসংস্থান নীতি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করা। শুধু ভোটের আগে তরুণ মুখ দিয়ে
বক্তৃতা দিলে হবে না। দুই একটা আসন আর মন্ত্রীত্ব দিয়ে পুরো প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব
নিশ্চিত হয় না।
তেলাপোকা যখন ফিরে আসে
সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার কয়েক
মিনিটের মধ্যে অভিজিৎ নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট দিলেন: "তেলাপোকা ফিরে
এসেছে। ভাবলেন আমাদের সরিয়ে দিতে পারবেন?"
এই একটি মন্তব্যে পুরো আন্দোলনের দর্শন আছে।
দাবিয়ে রাখার চেষ্টা এই প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করে। অবজ্ঞা এদের আরও সংগঠিত
করে। এটা বোঝার সময় হয়েছে।
ভারতের তরুণেরা এখন বলছে: আমরা আছি, আমরা থাকব,
আমরা কথা বলব।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকদের জন্য এটা একটা
সতর্কবার্তা। আর বাকি সবার জন্য এটা একটা নতুন যুগের সংকেত—যেখানে তরুণদের উপেক্ষা
করার সুযোগ আর নেই।
2.png)