সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মতামতমতামত

মিডিয়া ট্রায়াল ও ন্যারেটিভযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বি এন পি ; কিন্তু কেন?

বর্তমান সরকারের ভালো উদ্যোগগুলো কেন মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না? সঠিক ন্যারেটিভের অভাব ও মিডিয়া ট্রায়ালের মোকাবিলায় সরকারের প্রচারণার সংকট নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।

মিডিয়া ট্রায়াল ও ন্যারেটিভযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বি এন পি ; কিন্তু কেন?
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো—রাজনীতি এখন আর শুধু মাঠের মিছিল, স্লোগান বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পুরোপুরি “ন্যারেটিভের যুদ্ধ”। কে কত দ্রুত, কত বিশ্বাসযোগ্যভাবে এবং কত দক্ষতার সঙ্গে নিজের অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারছে—সেটিই হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই জায়গাতেই বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি বড় এক সংকটের মুখোমুখি।

সাম্প্রতিক সময়ে “জুলাই সনদ” বিতর্ক ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়; বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটিকে কীভাবে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করবে—সেই সক্ষমতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, বিএনপি অল্প সময়ের মধ্যে কিছু ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—এই উদ্যোগগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরার মতো কার্যকর মুখপাত্র দলটির হাতে খুব কম।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্কৃতি চালু আছে—নেতারা মনে করেন, উচ্চস্বরে বক্তৃতা, আবেগঘন বক্তব্য কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণই জনমত গঠনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমান সময় সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। এখনকার নাগরিক, বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক আবেগে প্রভাবিত হয় না; তারা জানতে চায় সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল। ফলে শুধুমাত্র “গরম বক্তৃতা” দিয়ে আর মানুষের সংশয় দূর করা যাচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো—তাদের এমন কোনো ধারাবাহিক ও গ্রহণযোগ্য মিডিয়া টিম নেই, যারা প্রতিদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় বিশ্লেষণ করে তুলে ধরতে পারে। সরকারের পক্ষে যারা গণমাধ্যমে কথা বলেন, তাঁদের অনেকেই হয় অতিরিক্ত রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন, নয়তো এমন জটিল পরিভাষায় কথা বলেন যা সাধারণ মানুষ সহজে ধরতে পারে না। ফলে সিদ্ধান্তের চেয়ে বিভ্রান্তি বেশি ছড়ায়।

এখানে আরও একটি বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের টেলিভিশন টকশো, ইউটিউবভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ফেসবুককেন্দ্রিক জনমত তৈরির ক্ষেত্র এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিকে ঘিরে নেতিবাচক ব্যাখ্যা, গুজব, অর্ধসত্য তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী মতের বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট বা অনলাইন বিশ্লেষকেরা তখন নিজেদের মতো করে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দাঁড় করান। কিন্তু সরকারের পক্ষে তথ্যভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য পাল্টা বক্তব্য খুব কমই আসে। ফলে জনমনে সংশয় জমাট বেঁধে যায়।

এই জায়গায় অনেকেই রেজাউল করিম রনি কিংবা রাকিব আল হাসান-এর মতো তরুণ বক্তা ও বিশ্লেষকদের নাম উল্লেখ করেন। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য এখনো সেই পর্যায়ের গণগ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি, যেটি একসময় ডা. জাহিদ কিংবা সাইয়েদ আবদুল্লাহদের মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে দেখা যেত। কারণ শুধু তথ্য জানলেই হয় না; সেই তথ্যকে মানুষের আবেগ, বাস্তব জীবন ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করার দক্ষতাও প্রয়োজন হয়। এই জায়গাতেই বর্তমান প্রজন্মের অনেক মুখপাত্র এখনো পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারেননি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো—বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখনো “ডিজিটাল রাজনৈতিক যোগাযোগ”কে পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শিখেনি। অথচ আধুনিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল মানেই এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া স্ট্রাকচার। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, বড় দলগুলো শুধু মুখপাত্র নিয়োগ দেয় না; তারা আলাদা “ন্যারেটিভ টিম”, “র‌্যাপিড রেসপন্স ইউনিট”, “ডিজিটাল কমিউনিকেশন সেল” এবং “ফ্যাক্ট-চেক টিম” তৈরি করে। কোনো বিতর্ক উঠলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তথ্য, গ্রাফিক্স, ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ হাজির করা হয়। বাংলাদেশে এখনো এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

বিএনপির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় করণীয় রয়েছে। প্রথমত, দলটিকে এমন কিছু গ্রহণযোগ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ মুখ তৈরি করতে হবে, যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান দেবেন না; বরং অর্থনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, জ্বালানি, বাজারব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, দলীয় নেতাদেরও বুঝতে হবে—বর্তমান যুগে “কে বেশি চিৎকার করল” সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং “কে বেশি বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি দিল” সেটিই মূল বিষয়। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু প্রচারণার জায়গা হিসেবে না দেখে, জনমত গঠনের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

এছাড়া দলটির উচিত তরুণ গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিবিশ্লেষক ও মিডিয়াকর্মীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিউনিকেশন সেল গড়ে তোলা। প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পর জনগণের জন্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ভিডিও, প্রশ্নোত্তর, ইনফোগ্রাফিক ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করা দরকার। কারণ বাস্তবতা হলো—রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না। আপনি যদি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করেন, তাহলে আপনার প্রতিপক্ষ সেটির ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দেবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু সাংগঠনিক শক্তি বা মাঠের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। তথ্যযুদ্ধ, ন্যারেটিভ নির্মাণ এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাই আগামী দিনের রাজনীতির বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের মনে নিজের গল্পটি সবচেয়ে দ্রুত, পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পৌঁছে দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জনসমর্থনের পাল্লা তার দিকেই ভারী হবে। আর যতদিন পর্যন্ত সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো এই বাস্তবতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পারবে, ততদিন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও নেতিবাচক জনমতের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিনই থেকে যাবে।

বিষয় : সঠিক ন্যারেটিভ প্রচারণার সংকট

মিডিয়া ট্রায়াল ও ন্যারেটিভযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বি এন পি ; কিন্তু কেন?
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


মিডিয়া ট্রায়াল ও ন্যারেটিভযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বি এন পি ; কিন্তু কেন?

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো—রাজনীতি এখন আর শুধু মাঠের মিছিল, স্লোগান বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পুরোপুরি “ন্যারেটিভের যুদ্ধ”। কে কত দ্রুত, কত বিশ্বাসযোগ্যভাবে এবং কত দক্ষতার সঙ্গে নিজের অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারছে—সেটিই হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই জায়গাতেই বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি বড় এক সংকটের মুখোমুখি।

সাম্প্রতিক সময়ে “জুলাই সনদ” বিতর্ক ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়; বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটিকে কীভাবে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করবে—সেই সক্ষমতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, বিএনপি অল্প সময়ের মধ্যে কিছু ইতিবাচক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—এই উদ্যোগগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরার মতো কার্যকর মুখপাত্র দলটির হাতে খুব কম।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্কৃতি চালু আছে—নেতারা মনে করেন, উচ্চস্বরে বক্তৃতা, আবেগঘন বক্তব্য কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণই জনমত গঠনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমান সময় সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। এখনকার নাগরিক, বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক আবেগে প্রভাবিত হয় না; তারা জানতে চায় সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল। ফলে শুধুমাত্র “গরম বক্তৃতা” দিয়ে আর মানুষের সংশয় দূর করা যাচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো—তাদের এমন কোনো ধারাবাহিক ও গ্রহণযোগ্য মিডিয়া টিম নেই, যারা প্রতিদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় বিশ্লেষণ করে তুলে ধরতে পারে। সরকারের পক্ষে যারা গণমাধ্যমে কথা বলেন, তাঁদের অনেকেই হয় অতিরিক্ত রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন, নয়তো এমন জটিল পরিভাষায় কথা বলেন যা সাধারণ মানুষ সহজে ধরতে পারে না। ফলে সিদ্ধান্তের চেয়ে বিভ্রান্তি বেশি ছড়ায়।

এখানে আরও একটি বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের টেলিভিশন টকশো, ইউটিউবভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ফেসবুককেন্দ্রিক জনমত তৈরির ক্ষেত্র এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিকে ঘিরে নেতিবাচক ব্যাখ্যা, গুজব, অর্ধসত্য তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী মতের বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট বা অনলাইন বিশ্লেষকেরা তখন নিজেদের মতো করে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দাঁড় করান। কিন্তু সরকারের পক্ষে তথ্যভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য পাল্টা বক্তব্য খুব কমই আসে। ফলে জনমনে সংশয় জমাট বেঁধে যায়।

এই জায়গায় অনেকেই রেজাউল করিম রনি কিংবা রাকিব আল হাসান-এর মতো তরুণ বক্তা ও বিশ্লেষকদের নাম উল্লেখ করেন। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য এখনো সেই পর্যায়ের গণগ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি, যেটি একসময় ডা. জাহিদ কিংবা সাইয়েদ আবদুল্লাহদের মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে দেখা যেত। কারণ শুধু তথ্য জানলেই হয় না; সেই তথ্যকে মানুষের আবেগ, বাস্তব জীবন ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করার দক্ষতাও প্রয়োজন হয়। এই জায়গাতেই বর্তমান প্রজন্মের অনেক মুখপাত্র এখনো পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারেননি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো—বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখনো “ডিজিটাল রাজনৈতিক যোগাযোগ”কে পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শিখেনি। অথচ আধুনিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল মানেই এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া স্ট্রাকচার। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, বড় দলগুলো শুধু মুখপাত্র নিয়োগ দেয় না; তারা আলাদা “ন্যারেটিভ টিম”, “র‌্যাপিড রেসপন্স ইউনিট”, “ডিজিটাল কমিউনিকেশন সেল” এবং “ফ্যাক্ট-চেক টিম” তৈরি করে। কোনো বিতর্ক উঠলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তথ্য, গ্রাফিক্স, ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ হাজির করা হয়। বাংলাদেশে এখনো এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

বিএনপির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় করণীয় রয়েছে। প্রথমত, দলটিকে এমন কিছু গ্রহণযোগ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ মুখ তৈরি করতে হবে, যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান দেবেন না; বরং অর্থনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, জ্বালানি, বাজারব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, দলীয় নেতাদেরও বুঝতে হবে—বর্তমান যুগে “কে বেশি চিৎকার করল” সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং “কে বেশি বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি দিল” সেটিই মূল বিষয়। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু প্রচারণার জায়গা হিসেবে না দেখে, জনমত গঠনের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

এছাড়া দলটির উচিত তরুণ গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিবিশ্লেষক ও মিডিয়াকর্মীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিউনিকেশন সেল গড়ে তোলা। প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পর জনগণের জন্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ভিডিও, প্রশ্নোত্তর, ইনফোগ্রাফিক ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করা দরকার। কারণ বাস্তবতা হলো—রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না। আপনি যদি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করেন, তাহলে আপনার প্রতিপক্ষ সেটির ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দেবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু সাংগঠনিক শক্তি বা মাঠের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। তথ্যযুদ্ধ, ন্যারেটিভ নির্মাণ এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাই আগামী দিনের রাজনীতির বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের মনে নিজের গল্পটি সবচেয়ে দ্রুত, পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পৌঁছে দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জনসমর্থনের পাল্লা তার দিকেই ভারী হবে। আর যতদিন পর্যন্ত সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো এই বাস্তবতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পারবে, ততদিন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও নেতিবাচক জনমতের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিনই থেকে যাবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত