মতামত
নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় একটা কথা খুব চলত—দিল্লি দূর হ্যায়, কিন্তু ঢাকা কাছে। ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে কে বসল, তার চেয়েও বাংলাদেশের জন্য বেশি জরুরি ছিল রাইটার্স বিল্ডিং বা নবান্নে কে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান এবং মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকেই তাঁকে 'কট্টর হিন্দুত্ববাদী' বা 'মৌলবাদী' তকমা দিচ্ছেন। কিন্তু রাজনীতির ময়দানটা আসলে সাদাকালো নয়। এখানে রঙের অনেক খেলা আছে। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শুভেন্দু বাবু যতটা না ধর্মীয় মৌলবাদী, তার চেয়ে অনেক বেশি চতুর রাজনৈতিক হিসেবি।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, এই ওলটপালটের কারণে আমাদের বাংলাদেশের সীমানায় কতটা আঁচ লাগবে?
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনটা একটু উল্টেপাল্টে দেখলে একটা মজার বিষয় চোখে পড়ে। তিনি কিন্তু চিরকাল বিজেপির লোক ছিলেন না। জীবনের একটা বড় সময় তিনি তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা ছিলেন এবং তখন তাঁর অন্যতম বড় শক্তি ছিল মুসলিম ভোটব্যাংক। পূর্ব মেদিনীপুর বা নন্দীগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার সংখ্যালঘু মানুষের কাঁধে ভর দিয়েই তিনি আজকের শুভেন্দু হয়েছেন।
কিন্তু দল বদলের পর তাঁর মুখের ভাষাও বদলে গেছে। এখন তিনি 'সনাতনী ভোট' এক করার কথা বলেন। দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক অনির্বাণ ব্যানার্জী মনে করেন, শুভেন্দু অধিকারীর এই ভোলবদল পুরোপুরি ক্ষমতার হিসাব।
তিনি বলেন, 'শুভেন্দুকে যারা কট্টর মৌলবাদী ভাবছেন, তারা ভুল করছেন। তিনি আসলে একজন কট্টর বাস্তববাদী রাজনীতিক। বাংলায় নিজের জমি শক্ত করতে হলে এখন হিন্দু ভোট এক করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় নেই। তাই তিনি এই কার্ডটা খেলছেন।'
সোজা কথায়, শুভেন্দু বাবু ধর্মের প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজনীতি করছেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, কোন বোতামটা টিপলে ভোট বাক্সে লাভ হবে। একে আদর্শগত মৌলবাদ না বলে 'রাজনৈতিক কৌশল' বলাই ঠিক হবে।
কিন্তু তিনি যতই ফায়দা তোলার চেষ্টা করুন না কেন, তাঁর এই মুখের কথার একটা বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের এই বাংলাদেশে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সব মিলিয়ে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত আছে, যার অর্ধেকটাই জড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের সাথে। ফলে কলকাতার বাতাসে সামান্য ধুলো উড়লেও ঢাকার চোখে এসে তা পড়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারী তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার 'অনুপ্রবেশ' আর 'সীমান্ত সুরক্ষা'র কথা তুলেছেন। তিনি বোঝাতে চান, বাংলাদেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে নাকি পশ্চিমবঙ্গের জনমিতি বদলে দিচ্ছে। এই বয়ানটা শুধু ভোটের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এটা ভাবা ঠিক হবেনা, এর একটা স্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
→ একটা মূল কথা: পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্বের কট্টর অবস্থান ঢাকার জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে।
→ প্রমাণ : তিস্তা পানি চুক্তি গত এক দশক ধরে ঝুলে আছে শুধু কলকাতার আপত্তির কারণে, নতুন সরকার এলো বলে সেই জট খুলে যাবে এটা ঠিক নয়।
→ মানে আমাদের উত্তরবঙ্গের মানুষের পানির অধিকার আদায়ের লড়াইটা আরও দীর্ঘ ও কঠিন হতে যাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে:
তিস্তার পানির সংকট: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত মুখে বলতেন যে উত্তরবঙ্গকে শুকিয়ে তিনি বাংলাদেশকে পানি দেবেন না। আর শুভেন্দু অধিকারীর দল সরাসরি ঢাকাকে এক ইঞ্চি বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিরোধী। ফলে আগামী দিনগুলোতে পানির ন্যায্য হিসেব পাওয়া আরও কঠিন হবে।
সীমান্তে কড়াকড়ি ও উত্তেজনা: বিএসএফ বা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর দিল্লির পাশাপাশি এখন রাজ্য সরকারেরও একটা পরোক্ষ চাপ থাকবে। অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে সীমান্তে সাধারণ মানুষের ওপর কড়াকড়ি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাদ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাণিজ্যিক টানাপোড়েন: স্থলবন্দরগুলোর সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গে। রাজনৈতিক সম্পর্কের সামান্য অবনতি হলেও দুই দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর এর বড় প্রভাব পড়ে। কাঁচামাল আমদানিতে দেরি হলে দাম বাড়ে আমাদের বাজারের।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, শুভেন্দু অধিকারী কি চাইলেই বাংলাদেশের ক্ষতি করতে পারবেন? উত্তর হলো—না, অতটা সহজ নয়। ভারতের পররাষ্ট্র নীতি বা অন্য দেশের সাথে কেমন সম্পর্ক থাকবে, তা ঠিক করে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার নয়। দিল্লির বর্তমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থেই বাংলাদেশকে তাদের পাশে প্রয়োজন। তাই কলকাতা চাইলেই হুট করে ঢাকার সাথে যুদ্ধংদেহী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারবে না।
কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে 'ভয়' হিসেবে দেখানোর যে প্রবণতা, তা আমাদের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। বন্ধু দেশ যখন ঘরের ভেতরের রাজনীতিতে অন্য দেশকে খলনায়ক বানায়, তখন বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরে।
বন্ধু থেকে প্রতিপক্ষ হতে বেশি সময় লাগে না — বিশেষত যখন মাঝখানে একটা কাঁটাতারের বেড়া আর রাজনীতির ভোটব্যাংক জড়িয়ে থাকে। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা এই নতুন কলকাতার সাথে কীভাবে দাবার চাল চালে।
বিষয় : শুভেন্দু অধিকারী হিন্দু মৌলবাদ
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় একটা কথা খুব চলত—দিল্লি দূর হ্যায়, কিন্তু ঢাকা কাছে। ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে কে বসল, তার চেয়েও বাংলাদেশের জন্য বেশি জরুরি ছিল রাইটার্স বিল্ডিং বা নবান্নে কে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান এবং মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকেই তাঁকে 'কট্টর হিন্দুত্ববাদী' বা 'মৌলবাদী' তকমা দিচ্ছেন। কিন্তু রাজনীতির ময়দানটা আসলে সাদাকালো নয়। এখানে রঙের অনেক খেলা আছে। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শুভেন্দু বাবু যতটা না ধর্মীয় মৌলবাদী, তার চেয়ে অনেক বেশি চতুর রাজনৈতিক হিসেবি।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, এই ওলটপালটের কারণে আমাদের বাংলাদেশের সীমানায় কতটা আঁচ লাগবে?
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনটা একটু উল্টেপাল্টে দেখলে একটা মজার বিষয় চোখে পড়ে। তিনি কিন্তু চিরকাল বিজেপির লোক ছিলেন না। জীবনের একটা বড় সময় তিনি তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা ছিলেন এবং তখন তাঁর অন্যতম বড় শক্তি ছিল মুসলিম ভোটব্যাংক। পূর্ব মেদিনীপুর বা নন্দীগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার সংখ্যালঘু মানুষের কাঁধে ভর দিয়েই তিনি আজকের শুভেন্দু হয়েছেন।
কিন্তু দল বদলের পর তাঁর মুখের ভাষাও বদলে গেছে। এখন তিনি 'সনাতনী ভোট' এক করার কথা বলেন। দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক অনির্বাণ ব্যানার্জী মনে করেন, শুভেন্দু অধিকারীর এই ভোলবদল পুরোপুরি ক্ষমতার হিসাব।
তিনি বলেন, 'শুভেন্দুকে যারা কট্টর মৌলবাদী ভাবছেন, তারা ভুল করছেন। তিনি আসলে একজন কট্টর বাস্তববাদী রাজনীতিক। বাংলায় নিজের জমি শক্ত করতে হলে এখন হিন্দু ভোট এক করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় নেই। তাই তিনি এই কার্ডটা খেলছেন।'
সোজা কথায়, শুভেন্দু বাবু ধর্মের প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজনীতি করছেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, কোন বোতামটা টিপলে ভোট বাক্সে লাভ হবে। একে আদর্শগত মৌলবাদ না বলে 'রাজনৈতিক কৌশল' বলাই ঠিক হবে।
কিন্তু তিনি যতই ফায়দা তোলার চেষ্টা করুন না কেন, তাঁর এই মুখের কথার একটা বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের এই বাংলাদেশে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সব মিলিয়ে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত আছে, যার অর্ধেকটাই জড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের সাথে। ফলে কলকাতার বাতাসে সামান্য ধুলো উড়লেও ঢাকার চোখে এসে তা পড়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারী তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার 'অনুপ্রবেশ' আর 'সীমান্ত সুরক্ষা'র কথা তুলেছেন। তিনি বোঝাতে চান, বাংলাদেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে নাকি পশ্চিমবঙ্গের জনমিতি বদলে দিচ্ছে। এই বয়ানটা শুধু ভোটের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এটা ভাবা ঠিক হবেনা, এর একটা স্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
→ একটা মূল কথা: পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্বের কট্টর অবস্থান ঢাকার জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে।
→ প্রমাণ : তিস্তা পানি চুক্তি গত এক দশক ধরে ঝুলে আছে শুধু কলকাতার আপত্তির কারণে, নতুন সরকার এলো বলে সেই জট খুলে যাবে এটা ঠিক নয়।
→ মানে আমাদের উত্তরবঙ্গের মানুষের পানির অধিকার আদায়ের লড়াইটা আরও দীর্ঘ ও কঠিন হতে যাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে:
তিস্তার পানির সংকট: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত মুখে বলতেন যে উত্তরবঙ্গকে শুকিয়ে তিনি বাংলাদেশকে পানি দেবেন না। আর শুভেন্দু অধিকারীর দল সরাসরি ঢাকাকে এক ইঞ্চি বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিরোধী। ফলে আগামী দিনগুলোতে পানির ন্যায্য হিসেব পাওয়া আরও কঠিন হবে।
সীমান্তে কড়াকড়ি ও উত্তেজনা: বিএসএফ বা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর দিল্লির পাশাপাশি এখন রাজ্য সরকারেরও একটা পরোক্ষ চাপ থাকবে। অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে সীমান্তে সাধারণ মানুষের ওপর কড়াকড়ি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাদ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাণিজ্যিক টানাপোড়েন: স্থলবন্দরগুলোর সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গে। রাজনৈতিক সম্পর্কের সামান্য অবনতি হলেও দুই দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর এর বড় প্রভাব পড়ে। কাঁচামাল আমদানিতে দেরি হলে দাম বাড়ে আমাদের বাজারের।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, শুভেন্দু অধিকারী কি চাইলেই বাংলাদেশের ক্ষতি করতে পারবেন? উত্তর হলো—না, অতটা সহজ নয়। ভারতের পররাষ্ট্র নীতি বা অন্য দেশের সাথে কেমন সম্পর্ক থাকবে, তা ঠিক করে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার নয়। দিল্লির বর্তমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থেই বাংলাদেশকে তাদের পাশে প্রয়োজন। তাই কলকাতা চাইলেই হুট করে ঢাকার সাথে যুদ্ধংদেহী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারবে না।
কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে 'ভয়' হিসেবে দেখানোর যে প্রবণতা, তা আমাদের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। বন্ধু দেশ যখন ঘরের ভেতরের রাজনীতিতে অন্য দেশকে খলনায়ক বানায়, তখন বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরে।
বন্ধু থেকে প্রতিপক্ষ হতে বেশি সময় লাগে না — বিশেষত যখন মাঝখানে একটা কাঁটাতারের বেড়া আর রাজনীতির ভোটব্যাংক জড়িয়ে থাকে। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা এই নতুন কলকাতার সাথে কীভাবে দাবার চাল চালে।
2.png)