মতামত
বিশ্বরাজনীতিতে চিরন্তন সখ্যতা বলে কিছু নেই।আছে কেবলই গাণিতিক স্বার্থ। আপাতদৃষ্টিতে যে সমীকরণকে চিরন্তন মনে হয়, প্রয়োজনের তাগিদে তা মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার পাশে চীনের শক্ত অবস্থানকে অনেকেই এক দীর্ঘমেয়াদি আদর্শগত সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। যদি কোনো কারণে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে, তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির পুরো খেলাই উল্টে যাবে, যার প্রথম ও সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগবে মস্কোর ক্রেমলিনে।
বাস্তবতা হলো, বেইজিং কখনোই মস্কোর নিঃশর্ত বন্ধু ছিল না, বরং মার্কিন আধিপত্যকে একাকী মোকাবিলা করার বিপুল ব্যয় ও ঝুঁকি এড়াতে রাশিয়াকে একটি ভূ-রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ক্রেমলিনকে সরাসরি বাধাও দেয়নি, আবার তাদের সব পদক্ষেপকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করেনি চীন। বেইজিংয়ের এই অত্যন্ত পরিমাপ করা অবস্থান প্রমাণ করে যে, একটি দুর্বল ও তাদের ওপর নির্ভরশীল রাশিয়া চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক হলেও, রাশিয়ার সম্পূর্ণ পতন তারা চায় না। কিন্তু এই সমীকরণের স্থায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের দূরত্বের ওপর।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে রাশিয়ার চেয়ে পশ্চিমা বাজার ও মার্কিন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বেইজিংয়ের কাছে অনেক বেশি সংবেদনশীল। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং বিশাল রপ্তানি বাজারের চাবিকাঠি এখনও পশ্চিমাদের হাতে। ফলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সামান্যতম সুযোগ তৈরি হলে বেইজিং যে তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দীর্ঘমেয়াদে কেবল সস্তা জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়া কখনোই চীনের আধুনিক ও উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিকল্প হতে পারে না।
ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্য বেইজিংয়ের দিকে ব্যাপকভাবে হেলে পড়েছে। একসময়ের পরাশক্তি রাশিয়া এখন সস্তায় জ্বালানি বিক্রি করতে, বিকল্প প্রযুক্তি খুঁজতে এবং আন্তর্জাতিক একাকীত্ব ঘুচাতে বহুলাংশে চীনের নীরব সমর্থনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেইজিং এখন এই সম্পর্কের স্পষ্ট চালকের আসনে আসীন। তবে ওয়াশিংটনের সাথে সমঝোতা হলেই চীন একঝটকায় রাশিয়াকে ছুড়ে ফেলবে না, কারণ এককেন্দ্রিক মার্কিন বিশ্বব্যবস্থাকে রুখতে বেইজিংয়ের সবসময়ই একজন কৌশলগত অংশীদার প্রয়োজন। তবে সেক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আন্তরিকতা ও অগ্রাধিকারের জায়গাটি চরমভাবে হ্রাস পাবে। আবেগহীন ও অত্যন্ত বাস্তববাদী কূটনীতির জন্য পরিচিত বেইজিং যে কোনো মুহূর্তে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, আর এই নির্মম সত্যটি ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য হুমকির চেয়েও মস্কোকে বেশি শঙ্কিত করে তোলে।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
বিশ্বরাজনীতিতে চিরন্তন সখ্যতা বলে কিছু নেই।আছে কেবলই গাণিতিক স্বার্থ। আপাতদৃষ্টিতে যে সমীকরণকে চিরন্তন মনে হয়, প্রয়োজনের তাগিদে তা মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার পাশে চীনের শক্ত অবস্থানকে অনেকেই এক দীর্ঘমেয়াদি আদর্শগত সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। যদি কোনো কারণে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে, তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির পুরো খেলাই উল্টে যাবে, যার প্রথম ও সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগবে মস্কোর ক্রেমলিনে।
বাস্তবতা হলো, বেইজিং কখনোই মস্কোর নিঃশর্ত বন্ধু ছিল না, বরং মার্কিন আধিপত্যকে একাকী মোকাবিলা করার বিপুল ব্যয় ও ঝুঁকি এড়াতে রাশিয়াকে একটি ভূ-রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ক্রেমলিনকে সরাসরি বাধাও দেয়নি, আবার তাদের সব পদক্ষেপকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করেনি চীন। বেইজিংয়ের এই অত্যন্ত পরিমাপ করা অবস্থান প্রমাণ করে যে, একটি দুর্বল ও তাদের ওপর নির্ভরশীল রাশিয়া চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক হলেও, রাশিয়ার সম্পূর্ণ পতন তারা চায় না। কিন্তু এই সমীকরণের স্থায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের দূরত্বের ওপর।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে রাশিয়ার চেয়ে পশ্চিমা বাজার ও মার্কিন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বেইজিংয়ের কাছে অনেক বেশি সংবেদনশীল। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং বিশাল রপ্তানি বাজারের চাবিকাঠি এখনও পশ্চিমাদের হাতে। ফলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সামান্যতম সুযোগ তৈরি হলে বেইজিং যে তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দীর্ঘমেয়াদে কেবল সস্তা জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়া কখনোই চীনের আধুনিক ও উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিকল্প হতে পারে না।
ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্য বেইজিংয়ের দিকে ব্যাপকভাবে হেলে পড়েছে। একসময়ের পরাশক্তি রাশিয়া এখন সস্তায় জ্বালানি বিক্রি করতে, বিকল্প প্রযুক্তি খুঁজতে এবং আন্তর্জাতিক একাকীত্ব ঘুচাতে বহুলাংশে চীনের নীরব সমর্থনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেইজিং এখন এই সম্পর্কের স্পষ্ট চালকের আসনে আসীন। তবে ওয়াশিংটনের সাথে সমঝোতা হলেই চীন একঝটকায় রাশিয়াকে ছুড়ে ফেলবে না, কারণ এককেন্দ্রিক মার্কিন বিশ্বব্যবস্থাকে রুখতে বেইজিংয়ের সবসময়ই একজন কৌশলগত অংশীদার প্রয়োজন। তবে সেক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আন্তরিকতা ও অগ্রাধিকারের জায়গাটি চরমভাবে হ্রাস পাবে। আবেগহীন ও অত্যন্ত বাস্তববাদী কূটনীতির জন্য পরিচিত বেইজিং যে কোনো মুহূর্তে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, আর এই নির্মম সত্যটি ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য হুমকির চেয়েও মস্কোকে বেশি শঙ্কিত করে তোলে।
2.png)