সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 রাজনীতিরাজনীতি

‘পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না’: বদিউল আলম মজুমদার

স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ ও এমপিদের আধিপত্য সংবিধান ও বিএনপির ৩১ দফার পরিপন্থী; কাঠামোগত মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া শুধু পুলিশের পোশাক বদল কোনো সংস্কার নয়—নাগরিক ঐক্যের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা।

‘পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না’: বদিউল আলম মজুমদার
ছবি -সংগৃহীত

শনিবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং সংস্কারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে বিপুল রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে, সেই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারলে দেশ আবারও পুরোনো অরাজকতার গন্তব্যে ফিরে যাবে।

আলোচনা সভায় সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, "পুরোনো পথে হাঁটলে সেই পুরোনো গন্তব্যেই যাওয়া যায়। আমাদের এখন ঠিক তাই হচ্ছে। সবারই সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালানো উচিত, যাতে আমরা সেই পুরোনো গন্তব্যে না পৌঁছাই; কারণ তা দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।"

জাতীয় সংসদের সদস্যদের (এমপি) নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা পরিষদে ‘বসার জায়গা’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এমপিরা যদি সেখানে বসেন, তবে স্থানীয় প্রশাসনে কার ঘাড়ের কয়টা মাথা আছে যে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলবে! এর অর্থ দাঁড়ায় এমপিরাই স্থানীয় সরকার পরিচালনা করবেন, যা সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদের স্পষ্ট পরিপন্থী।

ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক পয়েন্ট তুলে ধরেন:

  • সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন: স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত না করে প্রশাসক দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো সংবিধানের ৫৯ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

  • দলীয় ইশতেহারের সংঘাত: নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি ও প্রশাসক নিয়োগের এই প্রক্রিয়া বিএনপির নিজস্ব ‘৩১ দফা’ এবং তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

  • জনগণের সার্বভৌমত্ব: জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম, সংসদ নয়। তাই সার্বভৌম জনগণের গণভোটের রায় অবশ্যই পালনীয়।

জরুরি দুটি আইন প্রণয়নের দাবি: > অতীতে এমপি হওয়াই অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার মোক্ষম উপায় ছিল উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক দুটি আইন করার দাবি জানান। প্রথমটি হলো ‘সংসদ সদস্য আচরণবিধি আইন’—যার মাধ্যমে এমপিরা প্রতিবছর নিজেদের সম্পদের হিসাব দেবেন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘোষণা করবেন। দ্বিতীয়টি হলো ‘সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার আইন’

আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘দারোগা ব্যবস্থা’ আজও বহাল রয়েছে। গত দুই বছরে পুলিশের পোশাক দুবার পরিবর্তন করাকে সংস্কার হিসেবে চালানো হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "পুলিশ বাহিনী নিয়ে জনগণের সংকট কি জামাকাপড়ের, নাকি জনগণের নিয়মিত হয়রানির অভিজ্ঞতা? মানুষ সমস্যার মৌলিক পরিবর্তন চায়।"

আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশ উল্টো পিছু হটছে উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন:

  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ এখনো কার্যকর হয়নি।

  • গুমসংক্রান্ত ও মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, তা আলোর মুখ দেখেনি।

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ৮০০-এর বেশি শহীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একটি ‘ন্যাশনাল চার্টার’ (জাতীয় সনদ) তৈরি করে একটি ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ গঠনের মাধ্যমে রাজপথে নামা দরকার।

সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, "কাঠামোগত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন আমরা কাঠামো বুঝব, কাঠামোকে স্পর্শ করতে পারব, তার ভুলটা ধরতে পারব এবং তা সংশোধন করার যথাযথ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারব।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সংসদকে সঠিকভাবে পরিচালনা করবে।

বিষয় : বাংলাদেশ_রাজনীতি বদিউল_আলাম_মজুমদার রাষ্ট্রের_সংস্কার নাগরিক_ঐক্য সংবিধান_লংঘন

‘পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না’: বদিউল আলম মজুমদার
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


‘পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না’: বদিউল আলম মজুমদার

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

শনিবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং সংস্কারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে বিপুল রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে, সেই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারলে দেশ আবারও পুরোনো অরাজকতার গন্তব্যে ফিরে যাবে।

আলোচনা সভায় সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, "পুরোনো পথে হাঁটলে সেই পুরোনো গন্তব্যেই যাওয়া যায়। আমাদের এখন ঠিক তাই হচ্ছে। সবারই সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালানো উচিত, যাতে আমরা সেই পুরোনো গন্তব্যে না পৌঁছাই; কারণ তা দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।"

জাতীয় সংসদের সদস্যদের (এমপি) নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা পরিষদে ‘বসার জায়গা’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এমপিরা যদি সেখানে বসেন, তবে স্থানীয় প্রশাসনে কার ঘাড়ের কয়টা মাথা আছে যে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলবে! এর অর্থ দাঁড়ায় এমপিরাই স্থানীয় সরকার পরিচালনা করবেন, যা সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদের স্পষ্ট পরিপন্থী।

ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক পয়েন্ট তুলে ধরেন:

  • সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন: স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত না করে প্রশাসক দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো সংবিধানের ৫৯ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

  • দলীয় ইশতেহারের সংঘাত: নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি ও প্রশাসক নিয়োগের এই প্রক্রিয়া বিএনপির নিজস্ব ‘৩১ দফা’ এবং তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

  • জনগণের সার্বভৌমত্ব: জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম, সংসদ নয়। তাই সার্বভৌম জনগণের গণভোটের রায় অবশ্যই পালনীয়।

জরুরি দুটি আইন প্রণয়নের দাবি: > অতীতে এমপি হওয়াই অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার মোক্ষম উপায় ছিল উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক দুটি আইন করার দাবি জানান। প্রথমটি হলো ‘সংসদ সদস্য আচরণবিধি আইন’—যার মাধ্যমে এমপিরা প্রতিবছর নিজেদের সম্পদের হিসাব দেবেন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘোষণা করবেন। দ্বিতীয়টি হলো ‘সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার আইন’

আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘দারোগা ব্যবস্থা’ আজও বহাল রয়েছে। গত দুই বছরে পুলিশের পোশাক দুবার পরিবর্তন করাকে সংস্কার হিসেবে চালানো হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "পুলিশ বাহিনী নিয়ে জনগণের সংকট কি জামাকাপড়ের, নাকি জনগণের নিয়মিত হয়রানির অভিজ্ঞতা? মানুষ সমস্যার মৌলিক পরিবর্তন চায়।"

আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশ উল্টো পিছু হটছে উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন:

  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ এখনো কার্যকর হয়নি।

  • গুমসংক্রান্ত ও মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, তা আলোর মুখ দেখেনি।

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ৮০০-এর বেশি শহীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একটি ‘ন্যাশনাল চার্টার’ (জাতীয় সনদ) তৈরি করে একটি ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ গঠনের মাধ্যমে রাজপথে নামা দরকার।

সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, "কাঠামোগত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন আমরা কাঠামো বুঝব, কাঠামোকে স্পর্শ করতে পারব, তার ভুলটা ধরতে পারব এবং তা সংশোধন করার যথাযথ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারব।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সংসদকে সঠিকভাবে পরিচালনা করবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত