মতামত
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে বাড়ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। সম্প্রতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এই সরু পানিপথ এখন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তেহরান সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে না গিয়ে কেবল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কড়া নজরদারির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করছে। মাত্র দুই মাইল চওড়া এই নৌপথে চলাচলকারী বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বিশ্ব বাণিজ্যকে অস্থির রাখাই এখন এই সংকটের মূল কৌশল।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগরের উত্তর তীরে থাকা ইরান এই রুটে একচেটিয়া সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বের বড় একটা অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই পথ সামান্য বন্ধ হলেও পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিতে তার বড় ধাক্কা লাগে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এই ঝুঁকি অনেক আগে থেকেই জানতেন। রাজনীতিতে আসার আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত ভূমিকার কথা বলে আসছিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জন্য সব সময়ই এমন এক সীমানা, যেখানে একবার জড়িয়ে পড়লে আর পিছু হটার সুযোগ থাকে না।
হরমুজকে ঘিরে এই আধিপত্যের লড়াই অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকাল থেকেই এটি ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই পথ দিয়েই রেশম, মসলা আর দামি রত্ন ইউরোপের বাজারে যেত। চীনা পরিব্রাজক ঝেং হি কিংবা বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলোর লেখাতেও এই পথের গুরুত্ব এবং সমুদ্রযাত্রার বিপদের কথা উল্লেখ আছে। উনিশ শতকে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলের দক্ষিণ উপকূলকে 'জলদস্যুদের উপকূল' বলে ডাকত। আজকের দিনে জলদস্যুদের জায়গা নিয়েছে আধুনিক ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র, তবে বাণিজ্যে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যটা একই রয়ে গেছে।
বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দিকে সৌদি আরব ও বাহরাইনে তেল আবিষ্কারের পর হরমুজের গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। প্রথমে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এবং পরে ইরানের শাহের আমলে এই রুটের নিরাপত্তা পাহারা দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায়। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দুই দেশই তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ শুরু করে, যা 'ট্যাংকার যুদ্ধ' নামে পরিচিত। আজকের পরিস্থিতি যেন সেই পুরোনো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে তুলনামূলক কম সামরিক শক্তির দেশগুলোও গেরিলা কৌশলে পরাশক্তিদের চ্যালেঞ্জ করছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কড়া হুঁশিয়ারি কিংবা রোনাল্ড রিগ্যানের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তগুলো ছিল এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা। সময় বদলেছে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু হরমুজকে কবজায় রাখার আদিম প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক দরজার চাবি শেষ পর্যন্ত কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে বাড়ছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। সম্প্রতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এই সরু পানিপথ এখন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তেহরান সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে না গিয়ে কেবল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কড়া নজরদারির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করছে। মাত্র দুই মাইল চওড়া এই নৌপথে চলাচলকারী বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বিশ্ব বাণিজ্যকে অস্থির রাখাই এখন এই সংকটের মূল কৌশল।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগরের উত্তর তীরে থাকা ইরান এই রুটে একচেটিয়া সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বের বড় একটা অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই পথ সামান্য বন্ধ হলেও পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিতে তার বড় ধাক্কা লাগে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এই ঝুঁকি অনেক আগে থেকেই জানতেন। রাজনীতিতে আসার আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত ভূমিকার কথা বলে আসছিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জন্য সব সময়ই এমন এক সীমানা, যেখানে একবার জড়িয়ে পড়লে আর পিছু হটার সুযোগ থাকে না।
হরমুজকে ঘিরে এই আধিপত্যের লড়াই অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকাল থেকেই এটি ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই পথ দিয়েই রেশম, মসলা আর দামি রত্ন ইউরোপের বাজারে যেত। চীনা পরিব্রাজক ঝেং হি কিংবা বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলোর লেখাতেও এই পথের গুরুত্ব এবং সমুদ্রযাত্রার বিপদের কথা উল্লেখ আছে। উনিশ শতকে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলের দক্ষিণ উপকূলকে 'জলদস্যুদের উপকূল' বলে ডাকত। আজকের দিনে জলদস্যুদের জায়গা নিয়েছে আধুনিক ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র, তবে বাণিজ্যে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যটা একই রয়ে গেছে।
বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দিকে সৌদি আরব ও বাহরাইনে তেল আবিষ্কারের পর হরমুজের গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। প্রথমে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এবং পরে ইরানের শাহের আমলে এই রুটের নিরাপত্তা পাহারা দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায়। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দুই দেশই তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ শুরু করে, যা 'ট্যাংকার যুদ্ধ' নামে পরিচিত। আজকের পরিস্থিতি যেন সেই পুরোনো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে তুলনামূলক কম সামরিক শক্তির দেশগুলোও গেরিলা কৌশলে পরাশক্তিদের চ্যালেঞ্জ করছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কড়া হুঁশিয়ারি কিংবা রোনাল্ড রিগ্যানের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তগুলো ছিল এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা। সময় বদলেছে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু হরমুজকে কবজায় রাখার আদিম প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক দরজার চাবি শেষ পর্যন্ত কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
2.png)