সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 চিত্র বিচিত্রচিত্র বিচিত্র

প্রাচীন রোমের অদ্ভুত টয়লেট: আড্ডা আর এক স্পঞ্জের গল্প

দেয়ালহীন গণশৌচাগারে বসত রাজনীতি ও ব্যবসার জমজমাট আসর; টয়লেট পেপারের বদলে সবার জন্য বরাদ্দ ছিল একটিমাত্র স্পঞ্জ-লাঠি।

প্রাচীন রোমের অদ্ভুত টয়লেট: আড্ডা আর এক স্পঞ্জের গল্প
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

ধরা যাক, আপনি টাইম মেশিনে চড়ে পাড়ি দিলেন যীশুর জন্মের আগের সেই সোনালী রোমান সাম্রাজ্যে। রাজপ্রাসাদ আর গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখে হঠাৎ আপনার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলো। আপনি একটি গণশৌচাগারে ঢুকলেন এবং ভেতরে যা দেখলেন, তাতে আপনার চোখ চড়কগাছ! আধুনিক মানুষের কাছে যা চরম অস্বস্তিকর আর অবিশ্বাস্য, রোমানদের কাছে সেটাই ছিল প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা।

আজকের দিনে আমরা শৌচাগারে গিয়ে সবার আগে দরজা বন্ধ করি একটু গোপনীয়তার জন্য। কিন্তু প্রাচীন রোমে ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটগুলোতে কোনো দেয়াল বা আড়াল ছিল না। সারি সারি পাথরের আসন পাতা থাকত আর মানুষ একে অপরের পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে নিজেদের কাজ সারত। শুধু তাই নয়, এটাই ছিল তাদের সামাজিক মিলনমেলা বা আড্ডা দেওয়ার অন্যতম প্রধান জায়গা! আজকের দিনে আমরা যেমন রেস্তোরাঁয় বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করি, রোমানরা তেমনি টয়লেটে বসে রাজনীতি, পাড়ার ভালো-মন্দ কিংবা বড় বড় ব্যবসার চুক্তি সেরে নিত। একেই বোধহয় বলে আসল 'টয়লেট টক'!

এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত মানুষ একসাথে বসে আছে, তাহলে দুর্গন্ধ বা ময়লা পরিষ্কার হতো কীভাবে? রোমানরা কিন্তু প্রকৌশল বা নির্মাণবিদ্যায় বেশ ওস্তাদ ছিল। তাদের শৌচাগারের নিচের নকশাটি ছিল দারুণ আধুনিক। পাথরের তৈরি সেই আসনগুলোর ঠিক নিচ দিয়েই সার্বক্ষণিকভাবে তীব্র পানির স্রোত প্রবাহিত হতো। এই স্রোত বর্জ্যকে সরাসরি ভাসিয়ে শহরের মূল ড্রেন বা নর্দমায় নিয়ে যেত। শুধু তাই নয়, আসনগুলোর ঠিক সামনে পায়ের কাছে থাকত আরেকটি সরু নালা, যেখান দিয়ে বয়ে যেত একদম পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি।

এবার আসা যাক সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অদ্ভুত বিষয়ে। সে যুগে তো আর আমাদের মতো কাগজের টয়লেট পেপার বা আধুনিক পানির কল ছিল না। তাহলে তারা নিজেদের পরিষ্কার করত কীভাবে? রোমানরা এর জন্য ব্যবহার করত এক আশ্চর্য যন্ত্র, যার নাম ‘টেরসোরিয়াম’। এটি আসলে আর কিছুই নয়, একটি সাধারণ কাঠের লাঠির মাথায় সমুদ্রের নরম স্পঞ্জ বেঁধে তৈরি করা একধরনের সরঞ্জাম।

এই গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আধুনিক মানুষের জন্য কিছুটা গা গুলিয়ে ওঠা অংশটি এখানেই। এই স্পঞ্জ-লাঠিটি কিন্তু কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না! একজন ব্যবহার করার পর সেটি পায়ের কাছের ওই পরিষ্কার পানির নালায় ভালো করে ধুয়ে রেখে দিতেন। এরপর পরবর্তী জন এসে ঠিক একই স্পঞ্জ-লাঠি ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, একটি পাবলিক টয়লেটে আসা পুরো শহরের মানুষ ঘুরেফিরে ওই একটি বা কয়েকটি স্পঞ্জই শেয়ার করত। আজকের যুগে আমরা যেখানে জীবাণুর ভয়ে অস্থির থাকি, সেখানে রোমানরা পরম শান্তিতে একই লাঠি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে বাড়ি ফিরত। 

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কতশত অদ্ভুত অভ্যাস যে চোখে পড়ে, তার ইয়ত্তা নেই। প্রাচীন রোমানদের এই যৌথ টয়লেট সংস্কৃতি আমাদের আজকের দিনে অদ্ভুত ও অস্বাস্থ্যকর মনে হলেও, তাদের কাছে এটিই ছিল সভ্য ও উন্নত জীবনযাপনের অংশ। সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি, বিজ্ঞান ও অভ্যাস কতটা বদলে যায়, রোমের এই 'টয়লেট টক' তারই এক চমৎকার প্রমাণ।

বিষয় : রোম টয়লেট টক

প্রাচীন রোমের অদ্ভুত টয়লেট: আড্ডা আর এক স্পঞ্জের গল্প
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


প্রাচীন রোমের অদ্ভুত টয়লেট: আড্ডা আর এক স্পঞ্জের গল্প

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

ধরা যাক, আপনি টাইম মেশিনে চড়ে পাড়ি দিলেন যীশুর জন্মের আগের সেই সোনালী রোমান সাম্রাজ্যে। রাজপ্রাসাদ আর গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখে হঠাৎ আপনার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলো। আপনি একটি গণশৌচাগারে ঢুকলেন এবং ভেতরে যা দেখলেন, তাতে আপনার চোখ চড়কগাছ! আধুনিক মানুষের কাছে যা চরম অস্বস্তিকর আর অবিশ্বাস্য, রোমানদের কাছে সেটাই ছিল প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা।

আজকের দিনে আমরা শৌচাগারে গিয়ে সবার আগে দরজা বন্ধ করি একটু গোপনীয়তার জন্য। কিন্তু প্রাচীন রোমে ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটগুলোতে কোনো দেয়াল বা আড়াল ছিল না। সারি সারি পাথরের আসন পাতা থাকত আর মানুষ একে অপরের পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে নিজেদের কাজ সারত। শুধু তাই নয়, এটাই ছিল তাদের সামাজিক মিলনমেলা বা আড্ডা দেওয়ার অন্যতম প্রধান জায়গা! আজকের দিনে আমরা যেমন রেস্তোরাঁয় বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করি, রোমানরা তেমনি টয়লেটে বসে রাজনীতি, পাড়ার ভালো-মন্দ কিংবা বড় বড় ব্যবসার চুক্তি সেরে নিত। একেই বোধহয় বলে আসল 'টয়লেট টক'!

এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত মানুষ একসাথে বসে আছে, তাহলে দুর্গন্ধ বা ময়লা পরিষ্কার হতো কীভাবে? রোমানরা কিন্তু প্রকৌশল বা নির্মাণবিদ্যায় বেশ ওস্তাদ ছিল। তাদের শৌচাগারের নিচের নকশাটি ছিল দারুণ আধুনিক। পাথরের তৈরি সেই আসনগুলোর ঠিক নিচ দিয়েই সার্বক্ষণিকভাবে তীব্র পানির স্রোত প্রবাহিত হতো। এই স্রোত বর্জ্যকে সরাসরি ভাসিয়ে শহরের মূল ড্রেন বা নর্দমায় নিয়ে যেত। শুধু তাই নয়, আসনগুলোর ঠিক সামনে পায়ের কাছে থাকত আরেকটি সরু নালা, যেখান দিয়ে বয়ে যেত একদম পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি।

এবার আসা যাক সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অদ্ভুত বিষয়ে। সে যুগে তো আর আমাদের মতো কাগজের টয়লেট পেপার বা আধুনিক পানির কল ছিল না। তাহলে তারা নিজেদের পরিষ্কার করত কীভাবে? রোমানরা এর জন্য ব্যবহার করত এক আশ্চর্য যন্ত্র, যার নাম ‘টেরসোরিয়াম’। এটি আসলে আর কিছুই নয়, একটি সাধারণ কাঠের লাঠির মাথায় সমুদ্রের নরম স্পঞ্জ বেঁধে তৈরি করা একধরনের সরঞ্জাম।

এই গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আধুনিক মানুষের জন্য কিছুটা গা গুলিয়ে ওঠা অংশটি এখানেই। এই স্পঞ্জ-লাঠিটি কিন্তু কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না! একজন ব্যবহার করার পর সেটি পায়ের কাছের ওই পরিষ্কার পানির নালায় ভালো করে ধুয়ে রেখে দিতেন। এরপর পরবর্তী জন এসে ঠিক একই স্পঞ্জ-লাঠি ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, একটি পাবলিক টয়লেটে আসা পুরো শহরের মানুষ ঘুরেফিরে ওই একটি বা কয়েকটি স্পঞ্জই শেয়ার করত। আজকের যুগে আমরা যেখানে জীবাণুর ভয়ে অস্থির থাকি, সেখানে রোমানরা পরম শান্তিতে একই লাঠি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে বাড়ি ফিরত। 

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কতশত অদ্ভুত অভ্যাস যে চোখে পড়ে, তার ইয়ত্তা নেই। প্রাচীন রোমানদের এই যৌথ টয়লেট সংস্কৃতি আমাদের আজকের দিনে অদ্ভুত ও অস্বাস্থ্যকর মনে হলেও, তাদের কাছে এটিই ছিল সভ্য ও উন্নত জীবনযাপনের অংশ। সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি, বিজ্ঞান ও অভ্যাস কতটা বদলে যায়, রোমের এই 'টয়লেট টক' তারই এক চমৎকার প্রমাণ।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত