সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

  বানিজ্য বানিজ্য

সনদ জটে সাভারের ট্যানারি, সস্তায় চামড়া যাচ্ছে চীনে

সাভারের ১৪০টি সচল কারখানার মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মাত্র ৮টির; সিইটিপির বেহাল দশায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হারিয়ে এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে রপ্তানি।

সনদ জটে সাভারের ট্যানারি, সস্তায় চামড়া যাচ্ছে চীনে
ছবি -সংগৃহীত

সাভারের ১৪০টি সচল কারখানার মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মাত্র ৮টির; সিইটিপির বেহাল দশায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হারিয়ে এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে রপ্তানি।

পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কারখানাগুলোর চরম অনগ্রসরতার চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে। আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) প্রটোকল অনুযায়ী পরিচালিত এক অডিটে দেখা গেছে, সাভারের ২০টি শীর্ষ ট্যানারির মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পেতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মাত্র ৫১ শতাংশ। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) দীর্ঘমেয়াদি অকার্যকারিতা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের চামড়া খাত বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বুধবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি) যৌথভাবে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১৪০টি সচল থাকলেও সিংহভাগেরই এলডব্লিউজি সনদ নেই। ফলে তৈরি পোশাকের মতো এই সম্ভাবনাময় খাতটি সরাসরি ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে দেশের উদ্যোক্তারা প্রকৃত মূল্যের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দামে চীনের কাছে চামড়া বিক্রি করছেন। পরবর্তীতে চীন সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ইতালি ও আমেরিকার বাজারে চড়া মূল্যে রপ্তানি করে বিপুল মুনাফা লুফে নিচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করা হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের সিইটিপি নিশ্চিত না করায় এই বিপুল ক্ষতি গুণতে হচ্ছে। এলডব্লিউজি সনদের মোট ১,৭১০ নম্বরের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপি সংশ্লিষ্ট খাতেই রয়েছে ৩০০ নম্বর, আর এখানেই সাভারের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। এছাড়া চামড়া সংরক্ষণে পরিবেশবান্ধব রাসায়নিকের ব্যবহার, পানির জবাবদিহিমূলক হিসাব ও মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে লবণ পুনরুদ্ধারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ট্যানারিগুলোর ঘাটতি স্পষ্ট।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানি ১,১৪৫.০৭ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রায় ৭৩৮.৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, সেখানে কমপ্লায়েন্সের অভাবে বাংলাদেশ বিশাল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই সংকট উত্তরণে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান জানান, বিদ্যমান সিইটিপি রাতারাতি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বিধায় এটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি নতুন আরেকটি সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। আসন্ন কোরবানির ঈদে লবণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, অন্তত ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।


বিষয় : সাভার_ট্যানারি এলডব্লিউজি_সনদ চামড়া_শিল্প বাংলাদেশ_রপ্তানি সিইটিপি_সংকট লেদার_ওয়ার্কিং_গ্রুপ অর্থনীতি_বাংলাদেশ চামড়া_বাজার

সনদ জটে সাভারের ট্যানারি, সস্তায় চামড়া যাচ্ছে চীনে
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


সনদ জটে সাভারের ট্যানারি, সস্তায় চামড়া যাচ্ছে চীনে

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

সাভারের ১৪০টি সচল কারখানার মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মাত্র ৮টির; সিইটিপির বেহাল দশায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হারিয়ে এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে রপ্তানি।

পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কারখানাগুলোর চরম অনগ্রসরতার চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে। আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) প্রটোকল অনুযায়ী পরিচালিত এক অডিটে দেখা গেছে, সাভারের ২০টি শীর্ষ ট্যানারির মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পেতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মাত্র ৫১ শতাংশ। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) দীর্ঘমেয়াদি অকার্যকারিতা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের চামড়া খাত বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বুধবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি) যৌথভাবে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১৪০টি সচল থাকলেও সিংহভাগেরই এলডব্লিউজি সনদ নেই। ফলে তৈরি পোশাকের মতো এই সম্ভাবনাময় খাতটি সরাসরি ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে দেশের উদ্যোক্তারা প্রকৃত মূল্যের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দামে চীনের কাছে চামড়া বিক্রি করছেন। পরবর্তীতে চীন সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ইতালি ও আমেরিকার বাজারে চড়া মূল্যে রপ্তানি করে বিপুল মুনাফা লুফে নিচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করা হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের সিইটিপি নিশ্চিত না করায় এই বিপুল ক্ষতি গুণতে হচ্ছে। এলডব্লিউজি সনদের মোট ১,৭১০ নম্বরের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপি সংশ্লিষ্ট খাতেই রয়েছে ৩০০ নম্বর, আর এখানেই সাভারের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। এছাড়া চামড়া সংরক্ষণে পরিবেশবান্ধব রাসায়নিকের ব্যবহার, পানির জবাবদিহিমূলক হিসাব ও মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে লবণ পুনরুদ্ধারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ট্যানারিগুলোর ঘাটতি স্পষ্ট।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানি ১,১৪৫.০৭ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রায় ৭৩৮.৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, সেখানে কমপ্লায়েন্সের অভাবে বাংলাদেশ বিশাল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই সংকট উত্তরণে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান জানান, বিদ্যমান সিইটিপি রাতারাতি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বিধায় এটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি নতুন আরেকটি সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। আসন্ন কোরবানির ঈদে লবণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, অন্তত ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত