সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

কেন দশকের পর দশক ফাইলবন্দী ছিলো পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প: নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা নাকি রাজনৈতিক অবহেলা

৩৫ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ অনুমোদন পেল একনেকে — কিন্তু এই প্রকল্প কেন দশকের পর দশক ঘুমিয়ে ছিল, সেই গল্পটাও ছোত নয়।

কেন দশকের পর দশক ফাইলবন্দী  ছিলো পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প: নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা নাকি রাজনৈতিক অবহেলা
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

১৩মে ,বুধবার সকালে সচিবালয়ের একনেক বৈঠককক্ষে যখন পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদন হলো, তখন অনেক পানি বিশেষজ্ঞের মনে হয়তো একটাই কথা এলো — এতদিনে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি নতুন নয়। এর পেছনে আছে দশকের পুরনো দাবি, বারবার উপেক্ষিত হওয়ার ইতিহাস এবং ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের নীরব কষ্টের দীর্ঘ আখ্যান।

প্রশ্নটা তাই শুধু প্রকল্পটি কী, সেটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটা হলো — এই প্রকল্প কেন এত বছর আটকে ছিল? কার স্বার্থে? আর এখন যখন অনুমোদন হলো, তখন কি সত্যিই সব বাধা কেটে গেছে?


ফারাক্কার ক্ষত: যে ইতিহাস ভোলা যায় না

গল্পটা শুরু করতে হলে যেতে হবে ১৯৭৫ সালে। সেবছর ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। লক্ষ্য ছিল গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রাখা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হলো বাংলাদেশকে।

শুকনো মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেল। একসময় যে পদ্মা ছিল উত্তাল, প্রমত্তা — শীতকালে সেই নদী পরিণত হলো বালুচরে। রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া, পাবনা থেকে ফরিদপুর — গোটা অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, এমনকি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যন্ত প্রভাবিত হলো।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু বাস্তবে পানির প্রবাহ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বরাবরই সন্দিহান। শুকনো মৌসুমে প্রতিশ্রুত পানি পেয়েছে কিনা বাংলাদেশ — এই প্রশ্নের সৎ উত্তর কখনো সরকারিভাবে সামনে আসেনি।

এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারেজ ছিল একটি স্বাভাবিক জবাব। নদীর যখন পানি থাকে, তখন তা ধরে রাখো। শুকনো মৌসুমে সেই মজুদ কাজে লাগাও। কিন্তু এই যুক্তিটা সরল হলেও এর রাজনীতি ছিল জটিল।

প্রস্তাব থেকে ফাইলবন্দি: রাজনৈতিক নতজানুতার দীর্ঘ ইতিহাস

পদ্মা ব্যারেজের ধারণা নতুন নয়। আশির দশক থেকেই বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পের কথা উঠেছে। পানি বিশেষজ্ঞরা, কৃষিবিদরা, এমনকি সংসদীয় কমিটিগুলোও বারবার এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিবারই কোথাও না কোথাও থেমে গেছে প্রকল্পটি।

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার — বিশেষত যারা দিল্লির সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ককে বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রে রেখেছিল — তারা এই প্রকল্পকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায়নি। কারণটা অনুমান করা কঠিন নয়।

ভারতের দৃষ্টিতে পদ্মা ব্যারেজ মানে বাংলাদেশ নিজেই তার পানির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি এক অর্থে ফারাক্কার উপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র পথ। যে নির্ভরতাটা কূটনৈতিক দরকষাকষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

ফলে যা হয়েছে, তা হলো — প্রকল্পের প্রস্তাব হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, বিদেশি পরামর্শক এসেছেন, রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সবুজ সংকেত মেলেনি। ফাইলটা ঘুরেছে দপ্তর থেকে দপ্তরে।

এই নতজানু নীতির মূল্য দিয়েছেন রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরার কৃষকেরা। যে পদ্মার পানি তাদের মাঠ সজীব রাখত, সেই পদ্মা শুকনো মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। সেচের খরচ বেড়েছে। আর সেই খরচ শেষ পর্যন্ত এসে পড়েছে কৃষকের কাঁধে। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে বার বার। 

প্রকল্পের রূপরেখা: কী হবে, কীভাবে হবে

এবারের একনেক বৈঠকে অনুমোদিত প্রকল্পে রাজবাড়ী জেলায় পদ্মা নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এই প্রকল্প থেকে সরাসরি উপকৃত হবেন। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে পাঁচ বছরে বাস্তবায়িত হবে।

পরিকল্পনার মূল কৌশল হলো — শুকনো মৌসুমে যখন ফারাক্কার কারণে পানির প্রবাহ কমে আসে, তখন ব্যারেজে আগে থেকে মজুদ করা পানি ব্যবহার করা হবে। খাল খননের মাধ্যমে সেই পানি বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষি সেচ, পানীয় জল এবং নদীর পরিবেশগত প্রবাহ বজায় রাখা — এই তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রকল্পটি ডিজাইন করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ একটি কথাও বলেছেন মন্ত্রী — এটি ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিষয়ক কোনো দাবি নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। এই বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ সম্ভবত এটাই যে, প্রকল্পটি যেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কাঠামোয় অযথা বিতর্কিত না হয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিশ্ব কী শেখাচ্ছে

পানি সংরক্ষণ ও ব্যারেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে।

মিসর ও ইথিওপিয়ার সংঘাত এক্ষেত্রে একটি সতর্কতার উদাহরণ। নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নির্মাণ নিয়ে দুটি দেশের মধ্যে দশকব্যাপী উত্তেজনা চলছে। মিসর মনে করে, ভাটিতে পানির প্রাপ্যতা কমে যাবে। ইথিওপিয়া বলছে, এটি তাদের অধিকার। এই দ্বন্দ্বের সমাধান এখনও হয়নি।

তুলনায় মেকং নদীর উদাহরণটা ভিন্ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নদীকে ঘিরে চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম একটি আঞ্চলিক কমিশনের মাধ্যমে — যদিও অপূর্ণভাবে — পানি ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছে। সেখানেও সংঘাত আছে, কিন্তু একটি কাঠামোগত আলোচনার জায়গা তৈরি হয়েছে।

ভারতেরই অভিজ্ঞতা নেওয়া যাক। দেশটির গুজরাট ও রাজস্থানে সরদার সরোবর প্রকল্পের মাধ্যমে মরুপ্রায় অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিতর্ক ছিল, পুনর্বাসনের প্রশ্ন ছিল — কিন্তু পানির অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা হলো — পানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক সাহস ততটাই দরকার।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: সুযোগ ও ঝুঁকি

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের সুফল অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে, শুকনো মৌসুমে নদী পুনরুজ্জীবিত হবে, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে কিছু বাস্তব প্রশ্নও থেকে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় অর্থায়নের সিদ্ধান্ত সাহসী, কিন্তু ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অর্থের যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখা কঠিন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে — বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নের ইতিহাস এটাই বলে।

এছাড়া পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারেজ নির্মাণ মানেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ। মৎস্য পরিযান, পলি বণ্টন এবং নদীর দুই তীরের বাস্তুতন্ত্রের উপর এর প্রভাব কতটা, সেটা বিস্তারিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

আরও একটি প্রশ্ন থেকে যায় — খাল খনন ও বিতরণ ব্যবস্থা। ব্যারেজে পানি মজুদ হলেই চলবে না, সেই পানি সঠিকভাবে ২৪টি জেলায় পৌঁছাতে হবে। এই বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কম চ্যালেঞ্জের বিষয় নয়।

কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যা করতে হবে

প্রকল্প অনুমোদন আর প্রকল্প সফল হওয়া — দুটো এক কথা নয়। বাংলাদেশে অনেক বড় প্রকল্পের শুরু হয়েছে ঢাকঢোল পিটিয়ে, শেষ হয়েছে অর্ধসমাপ্ত কাজ ও লুটপাটের অভিযোগ নিয়ে।

পদ্মা ব্যারেজকে সেই পথে না যেতে দিতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। স্বাধীন মনিটরিং কমিটি থাকতে হবে, যেখানে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব মানুষ নদী ও এর আশপাশে বাস করেন, তাদের মতামত ও স্বার্থ সংরক্ষণ না হলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত দক্ষতা। ব্যারেজ অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে প্রকল্প ডিজাইন করতে হবে। আগামী ৫০ বছরে পদ্মার পানির প্রবাহ কীভাবে বদলাবে — বৃষ্টিপাতের ধরন, হিমালয়ের হিমবাহ গলা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি — এসব হিসাবে নিতে হবে।

 দেরিতে  বাস্তবায়ন হতে যাওয়া একটি স্বপ্ন

পদ্মা ব্যারেজ অনুমোদন একটি ইতিবাচক সংকেত। এটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই সিদ্ধান্ত আরও দুই-তিন দশক আগে নেওয়া উচিত ছিল। সেই দেরির মূল্য দিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ — শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো কৃষকেরা, নদীতে মাছ না পেয়ে পেশা ছেড়ে দেওয়া জেলেরা, আর্সেনিকযুক্ত গভীর নলকূপের পানি পান করতে বাধ্য হওয়া পরিবারেরা।

পানি শুধু সম্পদ নয়, পানি হলো রাজনীতি। যে দেশ নিজের পানি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দেশ পুরোপুরি সার্বভৌম নয় — এই সত্যটা বাংলাদেশকে আর ভুলে থাকলে চলবে না।

পদ্মা ব্যারেজ সফল হলে এটি শুধু একটি সেচ প্রকল্প হবে না। এটি হবে একটি ঘোষণা — যে বাংলাদেশ তার নিজের পানির ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করতে শিখেছে।

সেই ঘোষণাটুকু সত্যিকারের হোক, এটাই এখন প্রত্যাশা।

বিষয় : পদ্মা ব্যারেজ

কেন দশকের পর দশক ফাইলবন্দী ছিলো পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প: নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা নাকি রাজনৈতিক অবহেলা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


কেন দশকের পর দশক ফাইলবন্দী ছিলো পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প: নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা নাকি রাজনৈতিক অবহেলা

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

১৩মে ,বুধবার সকালে সচিবালয়ের একনেক বৈঠককক্ষে যখন পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদন হলো, তখন অনেক পানি বিশেষজ্ঞের মনে হয়তো একটাই কথা এলো — এতদিনে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি নতুন নয়। এর পেছনে আছে দশকের পুরনো দাবি, বারবার উপেক্ষিত হওয়ার ইতিহাস এবং ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের নীরব কষ্টের দীর্ঘ আখ্যান।

প্রশ্নটা তাই শুধু প্রকল্পটি কী, সেটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটা হলো — এই প্রকল্প কেন এত বছর আটকে ছিল? কার স্বার্থে? আর এখন যখন অনুমোদন হলো, তখন কি সত্যিই সব বাধা কেটে গেছে?


ফারাক্কার ক্ষত: যে ইতিহাস ভোলা যায় না

গল্পটা শুরু করতে হলে যেতে হবে ১৯৭৫ সালে। সেবছর ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। লক্ষ্য ছিল গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রাখা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হলো বাংলাদেশকে।

শুকনো মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেল। একসময় যে পদ্মা ছিল উত্তাল, প্রমত্তা — শীতকালে সেই নদী পরিণত হলো বালুচরে। রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া, পাবনা থেকে ফরিদপুর — গোটা অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, এমনকি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যন্ত প্রভাবিত হলো।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু বাস্তবে পানির প্রবাহ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বরাবরই সন্দিহান। শুকনো মৌসুমে প্রতিশ্রুত পানি পেয়েছে কিনা বাংলাদেশ — এই প্রশ্নের সৎ উত্তর কখনো সরকারিভাবে সামনে আসেনি।

এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারেজ ছিল একটি স্বাভাবিক জবাব। নদীর যখন পানি থাকে, তখন তা ধরে রাখো। শুকনো মৌসুমে সেই মজুদ কাজে লাগাও। কিন্তু এই যুক্তিটা সরল হলেও এর রাজনীতি ছিল জটিল।

প্রস্তাব থেকে ফাইলবন্দি: রাজনৈতিক নতজানুতার দীর্ঘ ইতিহাস

পদ্মা ব্যারেজের ধারণা নতুন নয়। আশির দশক থেকেই বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পের কথা উঠেছে। পানি বিশেষজ্ঞরা, কৃষিবিদরা, এমনকি সংসদীয় কমিটিগুলোও বারবার এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিবারই কোথাও না কোথাও থেমে গেছে প্রকল্পটি।

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার — বিশেষত যারা দিল্লির সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ককে বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রে রেখেছিল — তারা এই প্রকল্পকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায়নি। কারণটা অনুমান করা কঠিন নয়।

ভারতের দৃষ্টিতে পদ্মা ব্যারেজ মানে বাংলাদেশ নিজেই তার পানির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি এক অর্থে ফারাক্কার উপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র পথ। যে নির্ভরতাটা কূটনৈতিক দরকষাকষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

ফলে যা হয়েছে, তা হলো — প্রকল্পের প্রস্তাব হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, বিদেশি পরামর্শক এসেছেন, রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সবুজ সংকেত মেলেনি। ফাইলটা ঘুরেছে দপ্তর থেকে দপ্তরে।

এই নতজানু নীতির মূল্য দিয়েছেন রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরার কৃষকেরা। যে পদ্মার পানি তাদের মাঠ সজীব রাখত, সেই পদ্মা শুকনো মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। সেচের খরচ বেড়েছে। আর সেই খরচ শেষ পর্যন্ত এসে পড়েছে কৃষকের কাঁধে। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে বার বার। 

প্রকল্পের রূপরেখা: কী হবে, কীভাবে হবে

এবারের একনেক বৈঠকে অনুমোদিত প্রকল্পে রাজবাড়ী জেলায় পদ্মা নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এই প্রকল্প থেকে সরাসরি উপকৃত হবেন। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে পাঁচ বছরে বাস্তবায়িত হবে।

পরিকল্পনার মূল কৌশল হলো — শুকনো মৌসুমে যখন ফারাক্কার কারণে পানির প্রবাহ কমে আসে, তখন ব্যারেজে আগে থেকে মজুদ করা পানি ব্যবহার করা হবে। খাল খননের মাধ্যমে সেই পানি বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষি সেচ, পানীয় জল এবং নদীর পরিবেশগত প্রবাহ বজায় রাখা — এই তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রকল্পটি ডিজাইন করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ একটি কথাও বলেছেন মন্ত্রী — এটি ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিষয়ক কোনো দাবি নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। এই বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ সম্ভবত এটাই যে, প্রকল্পটি যেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কাঠামোয় অযথা বিতর্কিত না হয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিশ্ব কী শেখাচ্ছে

পানি সংরক্ষণ ও ব্যারেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে।

মিসর ও ইথিওপিয়ার সংঘাত এক্ষেত্রে একটি সতর্কতার উদাহরণ। নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নির্মাণ নিয়ে দুটি দেশের মধ্যে দশকব্যাপী উত্তেজনা চলছে। মিসর মনে করে, ভাটিতে পানির প্রাপ্যতা কমে যাবে। ইথিওপিয়া বলছে, এটি তাদের অধিকার। এই দ্বন্দ্বের সমাধান এখনও হয়নি।

তুলনায় মেকং নদীর উদাহরণটা ভিন্ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নদীকে ঘিরে চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম একটি আঞ্চলিক কমিশনের মাধ্যমে — যদিও অপূর্ণভাবে — পানি ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছে। সেখানেও সংঘাত আছে, কিন্তু একটি কাঠামোগত আলোচনার জায়গা তৈরি হয়েছে।

ভারতেরই অভিজ্ঞতা নেওয়া যাক। দেশটির গুজরাট ও রাজস্থানে সরদার সরোবর প্রকল্পের মাধ্যমে মরুপ্রায় অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিতর্ক ছিল, পুনর্বাসনের প্রশ্ন ছিল — কিন্তু পানির অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা হলো — পানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক সাহস ততটাই দরকার।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: সুযোগ ও ঝুঁকি

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের সুফল অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে, শুকনো মৌসুমে নদী পুনরুজ্জীবিত হবে, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে কিছু বাস্তব প্রশ্নও থেকে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় অর্থায়নের সিদ্ধান্ত সাহসী, কিন্তু ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অর্থের যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখা কঠিন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে — বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নের ইতিহাস এটাই বলে।

এছাড়া পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারেজ নির্মাণ মানেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ। মৎস্য পরিযান, পলি বণ্টন এবং নদীর দুই তীরের বাস্তুতন্ত্রের উপর এর প্রভাব কতটা, সেটা বিস্তারিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

আরও একটি প্রশ্ন থেকে যায় — খাল খনন ও বিতরণ ব্যবস্থা। ব্যারেজে পানি মজুদ হলেই চলবে না, সেই পানি সঠিকভাবে ২৪টি জেলায় পৌঁছাতে হবে। এই বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কম চ্যালেঞ্জের বিষয় নয়।

কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যা করতে হবে

প্রকল্প অনুমোদন আর প্রকল্প সফল হওয়া — দুটো এক কথা নয়। বাংলাদেশে অনেক বড় প্রকল্পের শুরু হয়েছে ঢাকঢোল পিটিয়ে, শেষ হয়েছে অর্ধসমাপ্ত কাজ ও লুটপাটের অভিযোগ নিয়ে।

পদ্মা ব্যারেজকে সেই পথে না যেতে দিতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। স্বাধীন মনিটরিং কমিটি থাকতে হবে, যেখানে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব মানুষ নদী ও এর আশপাশে বাস করেন, তাদের মতামত ও স্বার্থ সংরক্ষণ না হলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত দক্ষতা। ব্যারেজ অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে প্রকল্প ডিজাইন করতে হবে। আগামী ৫০ বছরে পদ্মার পানির প্রবাহ কীভাবে বদলাবে — বৃষ্টিপাতের ধরন, হিমালয়ের হিমবাহ গলা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি — এসব হিসাবে নিতে হবে।

 দেরিতে  বাস্তবায়ন হতে যাওয়া একটি স্বপ্ন

পদ্মা ব্যারেজ অনুমোদন একটি ইতিবাচক সংকেত। এটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই সিদ্ধান্ত আরও দুই-তিন দশক আগে নেওয়া উচিত ছিল। সেই দেরির মূল্য দিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ — শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো কৃষকেরা, নদীতে মাছ না পেয়ে পেশা ছেড়ে দেওয়া জেলেরা, আর্সেনিকযুক্ত গভীর নলকূপের পানি পান করতে বাধ্য হওয়া পরিবারেরা।

পানি শুধু সম্পদ নয়, পানি হলো রাজনীতি। যে দেশ নিজের পানি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দেশ পুরোপুরি সার্বভৌম নয় — এই সত্যটা বাংলাদেশকে আর ভুলে থাকলে চলবে না।

পদ্মা ব্যারেজ সফল হলে এটি শুধু একটি সেচ প্রকল্প হবে না। এটি হবে একটি ঘোষণা — যে বাংলাদেশ তার নিজের পানির ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করতে শিখেছে।

সেই ঘোষণাটুকু সত্যিকারের হোক, এটাই এখন প্রত্যাশা।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত