সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বাংলাদেশবাংলাদেশ

ডুবছে হাওরের ধান, বিপন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা

অকালবন্যা আর বাঁধ ভাঙা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। শুধু ত্রাণ নয়, এখন প্রয়োজন হাওরকে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা ও স্থায়ী সমাধান।

ডুবছে হাওরের ধান, বিপন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা
ছবি -সংগৃহীত

সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ কিংবা নেত্রকোণা—বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল জুড়ে এখন শুধু কান্নার শব্দ। যে সময়টাতে কৃষকের ঘরে সোনালি বোরো ধান ওঠার কথা, সেই সময়টাতেই প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাসে সব ওলটপালট হয়ে গেল। উজানের ঢল আর অকাল বন্যায় মাঠের পর মাঠ ধান এখন পানির নিচে। দিনরাত এক করে ফলানো ফসল যখন চোখের সামনে পচে নষ্ট হয়, তখন সেই হাহাকার আর শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত থাকে না; ওটা আসলে আমাদের রাষ্ট্রের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

আসলে প্রতি বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তবে জেনেশুনেই প্রতি বছর কৃষকদের ডুবতে দিচ্ছি?

প্রকৃতি না কি অব্যবস্থাপনা?

হাওরের কৃষি পুরোপুরি প্রকৃতি-নির্ভর, এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও তো ঠিক যে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এখন অনেক বেশি তীব্র। উজানের আকস্মিক ঢল মোকাবিলায় আমাদের যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার ছিল, সেখানে বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি আর দুর্নীতির অভিযোগ তো নতুন কিছু নয়। সোজা কথায়, নিম্নমানের বাঁধ যখন পানির চাপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, তখন তার খেসারত দিতে হয় মেহনতি কৃষকদের। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।

মজার বিষয় হলো, হাওরকে আমরা দেশের 'খাদ্যভাণ্ডার' বলি, অথচ সেই ভাণ্ডার রক্ষায় আমাদের কোনো বিশেষ কৃষিনীতি নেই। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার মতো স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন কিংবা কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

টান পড়বে আপনার পকেটেও

হাওরের এই ক্ষতিকে যারা কেবল ওই অঞ্চলের সমস্যা ভাবছেন, তারা বড় ভুল করছেন। মনে রাখা দরকার, আমাদের মোট চাল উৎপাদনের একটা বিশাল অংশ আসে এই হাওরের বোরো ধান থেকে। ফলে সেখানে ফলন বিপর্যয় মানেই বাজারে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি। অর্থাৎ, হাওরের কৃষকের বুকফাটা কান্না শেষ পর্যন্ত শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলবে। এটা সরাসরি আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এক বিরাট আঘাত।

এখন যা করা জরুরি

পরিস্থিতি যে পর্যায়ে ঠেকেছে, তাতে কালক্ষেপণ করার আর কোনো সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে আমাদের দাবি হওয়া উচিত:

  • দুর্গত এলাকা ঘোষণা: ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলকে দ্রুত ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে।

  • কৃষিঋণ মওকুফ: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সব ধরনের কৃষিঋণ মওকুফ করে তাদের আবার চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার দিতে হবে।

  • আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা: উজানের পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ একটি আন্তঃসীমান্ত ইস্যু। তাই প্রতিবেশী দেশের সাথে সমন্বয় করে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

  • জবাবদিহি নিশ্চিত করা: বাঁধ নির্মাণে যারা অনিয়ম করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছতা না থাকলে হাজার কোটি টাকার ‘মেগা প্রজেক্ট’ কোনো কাজে আসবে না।

আমাদের বুঝতে হবে, হাওরের কৃষক কেবল ফসল ফলায় না, তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাদের এই দুর্দশাকে উপেক্ষা করা মানে আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। আজ যদি আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, তবে সামনের দিনগুলোতে এই সংকট আরও ভয়াবহ হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক সহানুভূতি নয়, হাওরবাসীর এখন দরকার বাঁচার মতো শক্ত অবলম্বন।

বিষয় : হাওরাঞ্চল বাঁধ ভাঙা পানি

ডুবছে হাওরের ধান, বিপন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


ডুবছে হাওরের ধান, বিপন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা

প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ কিংবা নেত্রকোণা—বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল জুড়ে এখন শুধু কান্নার শব্দ। যে সময়টাতে কৃষকের ঘরে সোনালি বোরো ধান ওঠার কথা, সেই সময়টাতেই প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাসে সব ওলটপালট হয়ে গেল। উজানের ঢল আর অকাল বন্যায় মাঠের পর মাঠ ধান এখন পানির নিচে। দিনরাত এক করে ফলানো ফসল যখন চোখের সামনে পচে নষ্ট হয়, তখন সেই হাহাকার আর শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত থাকে না; ওটা আসলে আমাদের রাষ্ট্রের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

আসলে প্রতি বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তবে জেনেশুনেই প্রতি বছর কৃষকদের ডুবতে দিচ্ছি?

প্রকৃতি না কি অব্যবস্থাপনা?

হাওরের কৃষি পুরোপুরি প্রকৃতি-নির্ভর, এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও তো ঠিক যে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এখন অনেক বেশি তীব্র। উজানের আকস্মিক ঢল মোকাবিলায় আমাদের যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার ছিল, সেখানে বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি আর দুর্নীতির অভিযোগ তো নতুন কিছু নয়। সোজা কথায়, নিম্নমানের বাঁধ যখন পানির চাপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, তখন তার খেসারত দিতে হয় মেহনতি কৃষকদের। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।

মজার বিষয় হলো, হাওরকে আমরা দেশের 'খাদ্যভাণ্ডার' বলি, অথচ সেই ভাণ্ডার রক্ষায় আমাদের কোনো বিশেষ কৃষিনীতি নেই। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার মতো স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন কিংবা কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

টান পড়বে আপনার পকেটেও

হাওরের এই ক্ষতিকে যারা কেবল ওই অঞ্চলের সমস্যা ভাবছেন, তারা বড় ভুল করছেন। মনে রাখা দরকার, আমাদের মোট চাল উৎপাদনের একটা বিশাল অংশ আসে এই হাওরের বোরো ধান থেকে। ফলে সেখানে ফলন বিপর্যয় মানেই বাজারে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি। অর্থাৎ, হাওরের কৃষকের বুকফাটা কান্না শেষ পর্যন্ত শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলবে। এটা সরাসরি আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এক বিরাট আঘাত।

এখন যা করা জরুরি

পরিস্থিতি যে পর্যায়ে ঠেকেছে, তাতে কালক্ষেপণ করার আর কোনো সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে আমাদের দাবি হওয়া উচিত:

  • দুর্গত এলাকা ঘোষণা: ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলকে দ্রুত ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে।

  • কৃষিঋণ মওকুফ: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সব ধরনের কৃষিঋণ মওকুফ করে তাদের আবার চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার দিতে হবে।

  • আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা: উজানের পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ একটি আন্তঃসীমান্ত ইস্যু। তাই প্রতিবেশী দেশের সাথে সমন্বয় করে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

  • জবাবদিহি নিশ্চিত করা: বাঁধ নির্মাণে যারা অনিয়ম করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছতা না থাকলে হাজার কোটি টাকার ‘মেগা প্রজেক্ট’ কোনো কাজে আসবে না।

আমাদের বুঝতে হবে, হাওরের কৃষক কেবল ফসল ফলায় না, তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাদের এই দুর্দশাকে উপেক্ষা করা মানে আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। আজ যদি আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, তবে সামনের দিনগুলোতে এই সংকট আরও ভয়াবহ হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক সহানুভূতি নয়, হাওরবাসীর এখন দরকার বাঁচার মতো শক্ত অবলম্বন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত