লোকাল ফোকাস
সাগরঘেরা ভোলার বিচ্ছিন্ন এক জনপদ মনপুরা। এখানে ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ২টা বাজা মানেই এক অদ্ভুত আতঙ্কের শুরু। ঠিক ওই সময়ের পর দ্বীপ থেকে বের হওয়ার সব নৌযান বন্ধ হয়ে যায়। সোজা কথায়, বিকেলের আগেই বাইরের দুনিয়ার সাথে মনপুরার সব যোগাযোগ চুকেবুকে যায়। আর সন্ধ্যা নামতেই নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। আধুনিক এই বাংলাদেশেও মনপুরা যেন একেকটি রাতে কয়েক শ বছর পেছনের কোনো প্রাচীন জনপদে ফিরে যাচ্ছে।
অন্ধকারে ডুবে থাকা এক আধুনিক দ্বীপ
মনপুরার এই দুর্ভোগের গল্পটা এক-দুই দিনের নয়, প্রায় এক বছর ধরে চলছে। দ্বীপের একমাত্র সোলার মিনিগ্রিডটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা হলেই পুরো এলাকা যেন কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যায়। অথচ একটা সময় এই প্রকল্পটিকে বিশ্বজুড়ে 'মডেল' হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল। এখন সেই মডেলের কঙ্কাল পড়ে আছে, কিন্তু মানুষের ঘরে আলো নেই।
নির্মম এক মজার বিষয় হলো, এই অন্ধকারের দামও সবচেয়ে বেশি দিতেন মনপুরায় মানুষ। দেশের অন্য প্রান্তের মানুষ যখন কম দামে বিদ্যুৎ পান, এখানকার মানুষকে এক ইউনিট বিদ্যুতের জন্য দিতে হতো ৩৫ টাকারও বেশি। দ্বীপবাসী সেই চড়া দামও মেনে নিয়েছিলেন একটু আলোর আশায়। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল থেকে সেই টুকুও উধাও।
হাসপাতাল থেকে পাঠশালা: ভোগান্তি সবখানে
বিদ্যুৎ নেই মানে কেবল বাতি নেভেনি, থেমে গেছে জীবনের অনেক জরুরি কাজও।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা সেবা দেওয়াটা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কিন্তু কেন ফিরছে না আলো? একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, সমস্যাটা যতটা না কারিগরি, তার চেয়ে বেশি প্রশাসনিক জেদের।
সোলার মিনিগ্রিডের ব্যাটারিগুলোর আয়ু ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। অন্য এক এলাকার অব্যবহৃত ব্যাটারি এখানে এনে লাগানোর একটা প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেখানেই আসল গল্প আটকে আছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) সেই পুরনো ব্যাটারির দাম চাচ্ছে ৭৫ লাখ টাকা। আর ওয়েস্টজোন পাওয়ার কোম্পানি (ওজোপাডিকো) বলছে, পুরনো ব্যাটারির জন্য তারা এত টাকা দেবে না।
সোজা কথায়, দুই সরকারি সংস্থার টাকার হিসাব মিলছে না বলে মনপুরার ২০ হাজার মানুষের রাত কাটছে অন্ধকারে। এক পক্ষ চিঠি লেখে, অন্য পক্ষ উত্তর দেয় না—এই চিঠি চালাচালির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের দাবি।
কত দূরে ভোরের আলো?
বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল করিম খান জানিয়েছেন, তিনি সমস্যাটি জানতেন না, তবে এখন দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন। ওজোপাডিকো তিন মেগাওয়াটের একটি বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কথা দিয়েছিল তিন বছর আগে, যা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
আসলে মনপুরায় সমস্যাটা শুধু বিদ্যুতের নয়, সমস্যাটা গুরুত্বের। দেশের সর্বত্র যখন উন্নয়নের আলো নিয়ে আলোচনা হয়, তখন মনপুরার মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন কারও কানে পৌঁছায় না। কবে আবার বিদ্যুৎ ফিরবে, সেই উত্তর আজও কারো কাছে নেই। বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যেমন সময় লাগে না, তেমনি প্রশাসনিক উদাসীনতায় একটি সাজানো জনপদ অন্ধকারে ডুবতেও সময় লাগে না। প্রশ্ন হলো, এই শীতের দীর্ঘ রাতগুলো আর কতদিন কাটবে শুধু সকালের অপেক্ষায়?
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
সাগরঘেরা ভোলার বিচ্ছিন্ন এক জনপদ মনপুরা। এখানে ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ২টা বাজা মানেই এক অদ্ভুত আতঙ্কের শুরু। ঠিক ওই সময়ের পর দ্বীপ থেকে বের হওয়ার সব নৌযান বন্ধ হয়ে যায়। সোজা কথায়, বিকেলের আগেই বাইরের দুনিয়ার সাথে মনপুরার সব যোগাযোগ চুকেবুকে যায়। আর সন্ধ্যা নামতেই নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। আধুনিক এই বাংলাদেশেও মনপুরা যেন একেকটি রাতে কয়েক শ বছর পেছনের কোনো প্রাচীন জনপদে ফিরে যাচ্ছে।
অন্ধকারে ডুবে থাকা এক আধুনিক দ্বীপ
মনপুরার এই দুর্ভোগের গল্পটা এক-দুই দিনের নয়, প্রায় এক বছর ধরে চলছে। দ্বীপের একমাত্র সোলার মিনিগ্রিডটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা হলেই পুরো এলাকা যেন কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যায়। অথচ একটা সময় এই প্রকল্পটিকে বিশ্বজুড়ে 'মডেল' হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল। এখন সেই মডেলের কঙ্কাল পড়ে আছে, কিন্তু মানুষের ঘরে আলো নেই।
নির্মম এক মজার বিষয় হলো, এই অন্ধকারের দামও সবচেয়ে বেশি দিতেন মনপুরায় মানুষ। দেশের অন্য প্রান্তের মানুষ যখন কম দামে বিদ্যুৎ পান, এখানকার মানুষকে এক ইউনিট বিদ্যুতের জন্য দিতে হতো ৩৫ টাকারও বেশি। দ্বীপবাসী সেই চড়া দামও মেনে নিয়েছিলেন একটু আলোর আশায়। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল থেকে সেই টুকুও উধাও।
হাসপাতাল থেকে পাঠশালা: ভোগান্তি সবখানে
বিদ্যুৎ নেই মানে কেবল বাতি নেভেনি, থেমে গেছে জীবনের অনেক জরুরি কাজও।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা সেবা দেওয়াটা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কিন্তু কেন ফিরছে না আলো? একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, সমস্যাটা যতটা না কারিগরি, তার চেয়ে বেশি প্রশাসনিক জেদের।
সোলার মিনিগ্রিডের ব্যাটারিগুলোর আয়ু ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। অন্য এক এলাকার অব্যবহৃত ব্যাটারি এখানে এনে লাগানোর একটা প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেখানেই আসল গল্প আটকে আছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) সেই পুরনো ব্যাটারির দাম চাচ্ছে ৭৫ লাখ টাকা। আর ওয়েস্টজোন পাওয়ার কোম্পানি (ওজোপাডিকো) বলছে, পুরনো ব্যাটারির জন্য তারা এত টাকা দেবে না।
সোজা কথায়, দুই সরকারি সংস্থার টাকার হিসাব মিলছে না বলে মনপুরার ২০ হাজার মানুষের রাত কাটছে অন্ধকারে। এক পক্ষ চিঠি লেখে, অন্য পক্ষ উত্তর দেয় না—এই চিঠি চালাচালির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের দাবি।
কত দূরে ভোরের আলো?
বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল করিম খান জানিয়েছেন, তিনি সমস্যাটি জানতেন না, তবে এখন দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন। ওজোপাডিকো তিন মেগাওয়াটের একটি বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কথা দিয়েছিল তিন বছর আগে, যা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
আসলে মনপুরায় সমস্যাটা শুধু বিদ্যুতের নয়, সমস্যাটা গুরুত্বের। দেশের সর্বত্র যখন উন্নয়নের আলো নিয়ে আলোচনা হয়, তখন মনপুরার মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন কারও কানে পৌঁছায় না। কবে আবার বিদ্যুৎ ফিরবে, সেই উত্তর আজও কারো কাছে নেই। বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যেমন সময় লাগে না, তেমনি প্রশাসনিক উদাসীনতায় একটি সাজানো জনপদ অন্ধকারে ডুবতেও সময় লাগে না। প্রশ্ন হলো, এই শীতের দীর্ঘ রাতগুলো আর কতদিন কাটবে শুধু সকালের অপেক্ষায়?
2.png)