সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

সৌদি - আমিরাত রেষারেষিঃ পুরনো বন্ধুত্ব শেষ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন।

তেলের উৎপাদন নিয়ে ঝগড়াটা কেবল বাইরের ছবি। এর গভীরে জমে আছে দশকের পর দশকের অবিশ্বাস, পুরনো দিনের জেদ আর মধ্যপ্রাচ্যের নেতা হওয়ার লড়াই।

সৌদি - আমিরাত রেষারেষিঃ পুরনো বন্ধুত্ব শেষ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন।
ছবি -সংগৃহীত

সত্তর বছর আগের এক ধূসর বিকেল। সৌদি আরবের রাজপরিবার এক তরুণ শেখকে বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটা মরুদ্যান দখল করা, যেখানে প্রচুর তেলের খনি আছে বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু সেই শেখ নিজের পরিবারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। সেই অকুতোভয় শেখই ছিলেন আধুনিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান। আজ তাঁরই ছেলে মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে এক কঠিন রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্তর বছর আগের সেই মরুদ্যানের ক্ষত যেন আজ আবার নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করেছে।

আসলে এই দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ নেই। বর্তমানে সৌদি আরব আর আরব আমিরাত প্রায় প্রতিটি বিষয়েই একে অপরের উল্টো দিকে দাঁড়িয়েছে। লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে বিশ্ব তেলের বাজার—সবখানেই চলছে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রব পিনফোল্ড মনে করেন, এটা কেবল তেলের লড়াই নয়। তিনি জানিয়েছেন, "সৌদি আরব সব সময় নিজেকে এই এলাকার বড় ভাই বা নেতা মনে করে। কিন্তু আরব আমিরাত ছোট দেশ হলেও এখন তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের এক শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা আর সৌদির ছায়ায় থাকতে রাজি নয়।" সোজা কথায়, একসময় যারা হাতে হাত রেখে চলত, তারা এখন আলাদা পথে হাঁটার জন্য মরিয়া।

মজার বিষয় হলো, এই ঝগড়াটা এখন কেবল তেলের খনিতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইয়েমেন কিংবা সুদানের গৃহযুদ্ধে দুই দেশ এখন দুই পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। সৌদি আরব চায় প্রতিবেশী দেশগুলোর পুরোনো সরকার আর সেনাবাহিনী টিকে থাকুক। কিন্তু আমিরাত সেখানে সমর্থন দিচ্ছে বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোকে। এর পেছনে বড় কারণ হলো—নিজেদের সুবিধার হিসাব। আমিরাত চায় লোহিত সাগরের উপকূলে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখতে, যা সৌদির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ঝগড়াটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে তেলের বাজারে। সম্প্রতি আরব আমিরাত তেলের জোট ‘ওপেক’ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরব চায় তেলের উৎপাদন কমিয়ে দাম চড়া রাখতে। কিন্তু আমিরাত চায় এখনই বেশি করে তেল তুলে প্রচুর মুনাফা করতে। সৌদির তেলের ভাণ্ডার আমিরাতের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি—আর এই বাড়তি সম্পদই রিয়াদকে এতদিন নেতার আসনে বসিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আবুধাবি এখন আর সেই মোড়লতন্ত্র মেনে নিতে চাইছে না।

ইসরায়েল ইস্যুও দুই দেশের মধ্যে একটা বড় দেয়াল তুলে দিয়েছে। আমিরাত যেখানে ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে, সৌদি আরব সেখানে সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্টের কথা ভেবে কিছুটা দূরে সরে এসেছে। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধের পর সৌদি যুবরাজ এখন আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করছেন, যা আমিরাতের হঠকারী সিদ্ধান্তের চেয়ে কিছুটা আলাদা।

বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে আসলে খুব বেশি সময় লাগে না—বিশেষত যখন মাটির নিচে অঢেল তেল আর মনে পুরনো দিনের ক্ষোভ জমে থাকে। এই দুই দেশের লড়াই কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। তবে এটুকু নিশ্চিত—এই রেষারেষির দাম শেষ পর্যন্ত এশিয়ার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ইউরোপের তেলের বাজারকেও দিতে হবে।


বিষয় : ওপেক তেলের বাজার মোহাম্মদ বিন সালমান মোহাম্মদ বিন জায়েদ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

কাল মহাকাল

রোববার, ১০ মে ২০২৬


সৌদি - আমিরাত রেষারেষিঃ পুরনো বন্ধুত্ব শেষ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন।

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

সত্তর বছর আগের এক ধূসর বিকেল। সৌদি আরবের রাজপরিবার এক তরুণ শেখকে বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটা মরুদ্যান দখল করা, যেখানে প্রচুর তেলের খনি আছে বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু সেই শেখ নিজের পরিবারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। সেই অকুতোভয় শেখই ছিলেন আধুনিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান। আজ তাঁরই ছেলে মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে এক কঠিন রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্তর বছর আগের সেই মরুদ্যানের ক্ষত যেন আজ আবার নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করেছে।

আসলে এই দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ নেই। বর্তমানে সৌদি আরব আর আরব আমিরাত প্রায় প্রতিটি বিষয়েই একে অপরের উল্টো দিকে দাঁড়িয়েছে। লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে বিশ্ব তেলের বাজার—সবখানেই চলছে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রব পিনফোল্ড মনে করেন, এটা কেবল তেলের লড়াই নয়। তিনি জানিয়েছেন, "সৌদি আরব সব সময় নিজেকে এই এলাকার বড় ভাই বা নেতা মনে করে। কিন্তু আরব আমিরাত ছোট দেশ হলেও এখন তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের এক শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা আর সৌদির ছায়ায় থাকতে রাজি নয়।" সোজা কথায়, একসময় যারা হাতে হাত রেখে চলত, তারা এখন আলাদা পথে হাঁটার জন্য মরিয়া।

মজার বিষয় হলো, এই ঝগড়াটা এখন কেবল তেলের খনিতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইয়েমেন কিংবা সুদানের গৃহযুদ্ধে দুই দেশ এখন দুই পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। সৌদি আরব চায় প্রতিবেশী দেশগুলোর পুরোনো সরকার আর সেনাবাহিনী টিকে থাকুক। কিন্তু আমিরাত সেখানে সমর্থন দিচ্ছে বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোকে। এর পেছনে বড় কারণ হলো—নিজেদের সুবিধার হিসাব। আমিরাত চায় লোহিত সাগরের উপকূলে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখতে, যা সৌদির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ঝগড়াটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে তেলের বাজারে। সম্প্রতি আরব আমিরাত তেলের জোট ‘ওপেক’ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরব চায় তেলের উৎপাদন কমিয়ে দাম চড়া রাখতে। কিন্তু আমিরাত চায় এখনই বেশি করে তেল তুলে প্রচুর মুনাফা করতে। সৌদির তেলের ভাণ্ডার আমিরাতের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি—আর এই বাড়তি সম্পদই রিয়াদকে এতদিন নেতার আসনে বসিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আবুধাবি এখন আর সেই মোড়লতন্ত্র মেনে নিতে চাইছে না।

ইসরায়েল ইস্যুও দুই দেশের মধ্যে একটা বড় দেয়াল তুলে দিয়েছে। আমিরাত যেখানে ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে, সৌদি আরব সেখানে সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্টের কথা ভেবে কিছুটা দূরে সরে এসেছে। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধের পর সৌদি যুবরাজ এখন আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করছেন, যা আমিরাতের হঠকারী সিদ্ধান্তের চেয়ে কিছুটা আলাদা।

বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে আসলে খুব বেশি সময় লাগে না—বিশেষত যখন মাটির নিচে অঢেল তেল আর মনে পুরনো দিনের ক্ষোভ জমে থাকে। এই দুই দেশের লড়াই কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। তবে এটুকু নিশ্চিত—এই রেষারেষির দাম শেষ পর্যন্ত এশিয়ার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ইউরোপের তেলের বাজারকেও দিতে হবে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত