সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ইরান যুদ্ধইরান যুদ্ধ

তেহরানের বৃষ্টি ঘিরে ‘জলবায়ু যুদ্ধ’ বিতর্ক

আবুধাবির এক গোপন স্থাপনায় হামলার পর ইরানের প্রকৃতির নাটকীয় পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উঠছে পরিবেশকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের শঙ্কা।

তেহরানের বৃষ্টি ঘিরে ‘জলবায়ু যুদ্ধ’ বিতর্ক
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)


বহু বছর ধরেই তেহরানকে দেখা গেছে ধুলিঝড়, পানির সংকট আর দমবন্ধ করা গরমের শহর হিসেবে। ইরানের বহু নদী শুকিয়ে গিয়েছিল, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভয়াবহভাবে নেমে গিয়েছিল, এমনকি দেশটির প্রশাসনিক মহলেও রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার আলোচনা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দৃশ্যপট যেন আচমকাই বদলে গেছে। তেহরানে ফিরেছে বৃষ্টি, কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা কমেছে কয়েক ডিগ্রি, শুকনো খাল-নদীতেও দেখা গেছে পানির প্রবাহ। আর এই পরিবর্তনকে ঘিরেই আন্তর্জাতিক মহলে জন্ম নিয়েছে নতুন এক বিতর্ক—ইরানের আবহাওয়া কি এতদিন কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল?

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আবুধাবিতে সংঘটিত একটি রহস্যময় হামলা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি উঠেছে, সেখানে ধ্বংস হওয়া স্থাপনাটি শুধু সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি ছিল না; বরং সেটি নাকি বৃহৎ কোনো জলবায়ু ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

ইউনিভার্সিটি অব অরেগনের গবেষক ফাতিমা সাদ আল-হাসানি সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, হামলার পরপরই ইরানের আবহাওয়ায় যেভাবে দ্রুত পরিবর্তন দেখা গেছে, তা নিছক প্রাকৃতিক ওঠানামা বলেই উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। তার ভাষায়, “একটি নির্দিষ্ট স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে একটি দেশের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার এমন নাটকীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা জরুরি।”

এই দাবির পক্ষে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। তেহরানের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন পর স্বস্তির বৃষ্টিকে স্বাগত জানালেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বিষয়টিকে দেখছেন আরও গভীর দৃষ্টিতে। তাদের মতে, এটি হয়তো ভবিষ্যতের “জলবায়ু যুদ্ধ”-এর আভাস।

আসলে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় অবস্থিত ‘হার্প’ বা HAARP প্রকল্প নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা জল্পনা রয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যায় এটিকে আয়নোস্ফিয়ার গবেষণাকেন্দ্র বলা হলেও সমালোচকদের অভিযোগ, উচ্চক্ষমতার রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে এটি বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

একইভাবে নরওয়ের ‘ইআইএসকাট’ এবং চীনের ‘তিয়ানহে’ প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে চীন তিব্বত মালভূমিতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত তৈরির যে প্রযুক্তিগত কর্মসূচি চালাচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ তিব্বত থেকেই উৎপত্তি ব্রহ্মপুত্রসহ এ অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে বন্দুক বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পানি, বৃষ্টি, খরা কিংবা বন্যাও হয়ে উঠতে পারে কৌশলগত অস্ত্র।

ইতিহাস ঘাঁটলে এমন নজিরও পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ‘অপারেশন পোপাই’-এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে শত্রুপক্ষের রসদ সরবরাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিল। পরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ ‘ENMOD Convention’ গ্রহণ করে, যেখানে সামরিক উদ্দেশ্যে পরিবেশ পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়।

তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর?

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, আবহাওয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ এবং মৌসুমি পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

তারপরও বাস্তবতা হলো, ইরানের সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিবর্তন নতুন করে বিশ্বকে ভাবতে বাধ্য করেছে। যদি সত্যিই কোনো রাষ্ট্র বা গোপন নেটওয়ার্ক আবহাওয়াকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা অর্জন করে থাকে, তবে সেটি শুধু একটি দেশের নয়, গোটা মানবসভ্যতার নিরাপত্তার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে না ট্যাংক কিংবা পারমাণবিক বোমা—হবে আকাশ, মেঘ আর বৃষ্টি।

বিষয় : তেহরান আবহাওয়া পরিবর্তন ইরান খরা সংকট জলবায়ু যুদ্ধ HAARP আবুধাবি হামলা

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬


তেহরানের বৃষ্টি ঘিরে ‘জলবায়ু যুদ্ধ’ বিতর্ক

প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬

featured Image


বহু বছর ধরেই তেহরানকে দেখা গেছে ধুলিঝড়, পানির সংকট আর দমবন্ধ করা গরমের শহর হিসেবে। ইরানের বহু নদী শুকিয়ে গিয়েছিল, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভয়াবহভাবে নেমে গিয়েছিল, এমনকি দেশটির প্রশাসনিক মহলেও রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার আলোচনা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দৃশ্যপট যেন আচমকাই বদলে গেছে। তেহরানে ফিরেছে বৃষ্টি, কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা কমেছে কয়েক ডিগ্রি, শুকনো খাল-নদীতেও দেখা গেছে পানির প্রবাহ। আর এই পরিবর্তনকে ঘিরেই আন্তর্জাতিক মহলে জন্ম নিয়েছে নতুন এক বিতর্ক—ইরানের আবহাওয়া কি এতদিন কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল?

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আবুধাবিতে সংঘটিত একটি রহস্যময় হামলা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি উঠেছে, সেখানে ধ্বংস হওয়া স্থাপনাটি শুধু সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি ছিল না; বরং সেটি নাকি বৃহৎ কোনো জলবায়ু ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

ইউনিভার্সিটি অব অরেগনের গবেষক ফাতিমা সাদ আল-হাসানি সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, হামলার পরপরই ইরানের আবহাওয়ায় যেভাবে দ্রুত পরিবর্তন দেখা গেছে, তা নিছক প্রাকৃতিক ওঠানামা বলেই উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। তার ভাষায়, “একটি নির্দিষ্ট স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে একটি দেশের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার এমন নাটকীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা জরুরি।”

এই দাবির পক্ষে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। তেহরানের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন পর স্বস্তির বৃষ্টিকে স্বাগত জানালেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বিষয়টিকে দেখছেন আরও গভীর দৃষ্টিতে। তাদের মতে, এটি হয়তো ভবিষ্যতের “জলবায়ু যুদ্ধ”-এর আভাস।

আসলে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় অবস্থিত ‘হার্প’ বা HAARP প্রকল্প নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা জল্পনা রয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যায় এটিকে আয়নোস্ফিয়ার গবেষণাকেন্দ্র বলা হলেও সমালোচকদের অভিযোগ, উচ্চক্ষমতার রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে এটি বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

একইভাবে নরওয়ের ‘ইআইএসকাট’ এবং চীনের ‘তিয়ানহে’ প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে চীন তিব্বত মালভূমিতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত তৈরির যে প্রযুক্তিগত কর্মসূচি চালাচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ তিব্বত থেকেই উৎপত্তি ব্রহ্মপুত্রসহ এ অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে বন্দুক বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পানি, বৃষ্টি, খরা কিংবা বন্যাও হয়ে উঠতে পারে কৌশলগত অস্ত্র।

ইতিহাস ঘাঁটলে এমন নজিরও পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ‘অপারেশন পোপাই’-এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে শত্রুপক্ষের রসদ সরবরাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিল। পরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ ‘ENMOD Convention’ গ্রহণ করে, যেখানে সামরিক উদ্দেশ্যে পরিবেশ পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়।

তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর?

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, আবহাওয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ এবং মৌসুমি পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

তারপরও বাস্তবতা হলো, ইরানের সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিবর্তন নতুন করে বিশ্বকে ভাবতে বাধ্য করেছে। যদি সত্যিই কোনো রাষ্ট্র বা গোপন নেটওয়ার্ক আবহাওয়াকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা অর্জন করে থাকে, তবে সেটি শুধু একটি দেশের নয়, গোটা মানবসভ্যতার নিরাপত্তার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে না ট্যাংক কিংবা পারমাণবিক বোমা—হবে আকাশ, মেঘ আর বৃষ্টি।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত