৯ মে ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম
আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযানের হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের দামামা কি তবে আবারও বেজে উঠতে চলেছে? শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা যদি কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে না যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না; বরং আরও শক্তিশালী রূপে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান শুরু করবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, সবকিছু ঠিকঠাক না চললে ওয়াশিংটন আবারও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ ফিরে যেতে পারে। তবে এবার তা নিছক পুরনো অভিযান হবে না; এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’। যদিও এই ‘প্লাস’ বা বাড়তি অংশে ঠিক কী ধরনের সামরিক চমক থাকছে, তা কৌশলে গোপন রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তান ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অভিযান শুরু না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প সাময়িকভাবে ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন রণতরীর পাহারায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথ দেওয়া। এর পেছনে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসা প্রবল কূটনৈতিক চাপও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে এনবিসি নিউজ। ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনায় দেরি করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রহস্যময় হাসি দিয়ে কেবল বলেছেন, “আমরা খুব শীঘ্রই তা জানতে পারব।”
তবে আলোচনার টেবিলে যাই ঘটুক, সমুদ্রের নীল জলরাশি এরই মধ্যে বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ইরানি পতাকাবাহী দুটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ওমান উপসাগরের একটি ইরানি বন্দরে প্রবেশের মুখে চালানো এই হামলায় জাহাজ দুটি এখন পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়েছে। হোয়াইট হাউসের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন বারুদের ধোঁয়ায় অন্ধকার। হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মধ্যে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সম্মুখ সংঘাত। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা 'ফার্স নিউজ' জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টা ধরে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় ‘বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ’ চলছে। গত রাতের এক রক্তক্ষয়ী হামলার পর থেকে ওই অঞ্চলে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় মাপের আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
সংঘাতের সূত্রপাত হয় গত রাতে ওমান সাগর ও হরমুজ প্রণালির মধ্যবর্তী মিনাব কাউন্টি সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে একটি ইরানি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে অতর্কিতে হামলা চালায় মার্কিন নৌবাহিনী। হামলায় পণ্যবাহী জাহাজটিতে দ্রুত আগুন ধরে যায় এবং এতে একজন নাবিক নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হন। দক্ষিণ ইরানের মিনাব কাউন্টির গভর্নর মোহাম্মদ রাদমেহর আজ নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ পাঁচ নাবিকের মধ্যে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিদের খোঁজে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ এবং ‘মার্কিন সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই আজ এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ও হঠকারিতার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত।" এদিকে, তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ওয়াশিংটন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতালির রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা আজ শুক্রবারের মধ্যেই ইরানের জবাব প্রত্যাশা করছেন। তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা দেখতে চাই ইরান আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানে কতটা আন্তরিক।"
হরমুজ প্রণালির এই অস্থিতিশীলতা কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বড় হুমকি। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। বর্তমান উত্তেজনার ফলে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এখন পুরো বিশ্বের নজর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—তারা কি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফেরাবে, নাকি হরমুজ প্রণালিতে আরও বড় কোনো সামরিক সংঘাতের সূচনা করবে?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি এখন আক্ষরিক অর্থেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে এবার সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে বড় ধরণের হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তেহরানের ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৭ মে) জাস্ক বন্দরের কাছে তাদের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। আর ঠিক তার পাল্টায় গর্জে উঠেছে ইরানি সামরিক বাহিনী।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার—ইউএসএস ট্রাক্সটন, ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা এবং ইউএসএস মেসনকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। একযোগে জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়। তেহরানের দাবি, তাদের এই আক্রমণে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং ওমান উপসাগরের দিকে পালিয়ে গেছে।
তবে তেহরানের এই বীরত্বগাথাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের দিক থেকে আসা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা মাঝপথেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তাদের কোনো যুদ্ধজাহাজের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি। শুধু প্রতিরোধেই থেমে থাকেনি মার্কিন বাহিনী; এর পরপরই ‘আত্মরক্ষা’র দোহাই দিয়ে ইরানের মূল ভূখণ্ডের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, মিনাব ও সিরিক শহরের ইরানি সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন মার্কিন মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
পুরো ঘটনা নিয়ে হোয়াইট হাউসের সুর কিছুটা সাবধানী হলেও অনড়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা নতুন করে কোনো যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়াতে চান না। তবে নিজ দেশের বাহিনীকে রক্ষা করতে যে কোনো চরম পদক্ষেপ নিতেও তারা দ্বিধাবোধ করবেন না। অন্যদিকে ইরান এই ঘটনাকে স্রেফ উসকানি নয়, বরং মার্কিন আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় এখন বারুদের গন্ধ। কোনো পক্ষেরই পিছু হঠার লক্ষণ নেই, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তাল সময় শেষ হতে চলেছে শীঘ্রই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানে দুই দেশ এখন সমঝোতার একেবারে শেষ পর্যায়ে। এই বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তারা নিশ্চিত করেছে যে, শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে তৈরি এক পৃষ্ঠার খসড়া চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত স্বাক্ষরের অপেক্ষায়।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এই সমঝোতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানের ওই সূত্রটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রতিবেদনটি একদম নির্ভুল। সত্যি বলতে, দুই পক্ষই এখন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুতই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। হোয়াইট হাউস মনে করছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তার অবসান ঘটার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির হাওয়া যুদ্ধ থামার এই জোরালো গুঞ্জনে বিশ্ববাজারে এক ধরনের ইতিবাচক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে নামতে শুরু করেছে—ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক ধাক্কায় ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল এখন ১০০ ডলারের কোটায়। শুধু তেল নয়, বিশ্ব শেয়ারবাজারেও চনমনে ভাব দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন বলে বন্ডের সুদের হারও নিম্নমুখী।
নীরবতা ও পর্যালোচনার খেলা অবশ্য এত কিছুর পরও হোয়াইট হাউস কিংবা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তেহরানের সুর কিছুটা নমনীয়। সিএনবিসি জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাব পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তারা এখন এই প্রস্তাবগুলো খুব নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক যে সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেন, ঠিক তখনই এই সমঝোতার খবরটি সামনে এল। এখন দেখার বিষয়, এক পৃষ্ঠার এই ছোট কাগজটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে কতটা বড় স্বস্তি নিয়ে আসে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে ফ্রান্সের শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ‘চার্লস দ্য গল’। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে নির্বিঘ্ন চলাচল বজায় রাখতেই ফরাসি নৌবহরের এই মহড়া। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্যারিস।
বুধবার ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সুয়েজ খাল অতিক্রম করে বিশাল এই নৌবহরটি এখন লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মূলত ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার পরপরই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এই রণতরী মোতায়েন করা হয়েছিল। টানা ৪-৫ মাস গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে ফরাসি এই গর্বের।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তরীগুলোকে সম্ভাব্য যেকোনো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ চলাচলের অধিকার রক্ষায় এই মিশনকে একটি বড় ধরণের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি টেকসই আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে চায় ইউরোপের এই দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র যখন দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে, তখন এই নৌবহরের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ বয়ে আনে কি না, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেইজিং সফরে গিয়ে প্রভাবশালী মিত্র রাষ্ট্র চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছে ইরান। বুধবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেবল একটি ‘ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ’ চুক্তিই গ্রহণ করতে আগ্রহী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরাগচির এটিই প্রথম চীন সফর, যা ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ওয়াশিংটনকে তেহরানের স্পষ্ট বার্তা
বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওয়াশিংটনের প্রতি এক প্রকার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আরাগচি ওয়াং ই-এর কাছে উদ্ধৃত করেছেন যে, ইরানের জাতীয় স্বার্থ সুনিশ্চিত করে এমন কোনো স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান ছাড়া তেহরান অন্য কোনো সমঝোতা মেনে নেবে না। তিনি চীনকে ইরানের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে অবিহিত করেন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের অনড় অবস্থান ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আরাগচি আরও আশা ব্যক্ত করেছেন যে, চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুসংহত ও সুদৃঢ় হবে।
শান্তি বজায় রাখতে বেইজিংয়ের আহ্বান
বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সংঘাত এড়াতে চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষকেই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার জোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে বেইজিং। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ইরানের এই অনড় অবস্থান এবং চীনের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-কেন্দ্রিক বিদ্যমান সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন ইসরায়েলি থিংক-ট্যাংক 'আইএনএসএস'-এর ইরান বিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক বেনি সাবতি। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে সতর্ক করেছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনের কূটনৈতিক পথগুলো এখন প্রায় রুদ্ধ। এই অচলাবস্থা ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উচিত পুনরায় সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধের পথে প্রত্যাবর্তন করা বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
গবেষক বেনি সাবতি দাবি করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের অনমনীয় মানসিকতা বা ‘দম্ভ’ কোনো প্রকার চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, “ইরানের দম্ভ এখন আকাশচুম্বী; তারা বাস্তব পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।” ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদল অশুভ মানুষ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সাবতির মতে, ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এখন একটি ভয়াবহ সামরিক শাসনে রূপান্তরিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে এই বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্প একদিকে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেন, আবার পরক্ষণেই আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েন। এই ধরনের দ্বিচারিতা ও স্ববিরোধী অবস্থান ইরানের মনোবল বৃদ্ধি করছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্সির মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে ক্ষুণ্ণ করছে। যদি ট্রাম্প আলোচনার জন্য হন্যে হয়ে না বেড়াতেন, তবে বর্তমান বিশ্ব আরও নিরাপদ অবস্থানে থাকত বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে বেনি সাবতি ইরানকে একটি ‘ভাইরাস’-এর সাথে তুলনা করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, শরীর অসুস্থ হলে ভাইরাস যেমন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, ইরানও নিজেকে হুমকিগ্রস্ত মনে করে বর্তমানে ঠিক তা-ই করছে। সাবতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেহরান সরাসরি ইসরায়েলকে আক্রমণের সাহস পায় না; বরং তারা বাহরাইন বা ওমানের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইরান সর্বদা অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা খুঁজে বেড়ায়—যা তারা আশির দশকে লেবাননে করেছিল।
পরিশেষে ইসরায়েলি এই গবেষক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনার টেবিলে পড়ে থাকলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং এই ব্যবস্থার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; অন্যথায় এই সংকট থেকে উত্তরণের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ফের নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে বেসামরিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। তেহরান থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সরদার আতাস এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র পূর্বে দাবি করেছিল যে তারা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তেহরান সেই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, আক্রান্ত নৌযানগুলো কোনোভাবেই ইরানের বিশেষায়িত বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) ছিল না; বরং সেগুলো ছিল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির এই ঘটনায় ইরানের নৌবাহিনীও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে বলে তেহরান থেকে দাবি করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন ডেস্ট্রয়ার বা যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের রাডার পুরোপুরি বন্ধ রেখে অত্যন্ত গোপনে প্রণালিতে প্রবেশের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তবে এই অঞ্চলে ইরানি নৌবাহিনীর সার্বক্ষণিক ও তীক্ষ্ণ নজরদারির কারণে রাডার চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন জাহাজগুলো শনাক্ত হয়ে যায়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলোকে চিহ্নিত করার পরপরই সেগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানি নৌবাহিনী সতর্কতামূলক গোলাবর্ষণ করে। সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক কমব্যাট ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট ব্যবহার করা হয়। এই নজিরবিহীন প্রতিরোধের মুখে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের অভিযান পরিত্যাগ করতে এবং ফিরে যেতে বাধ্য হয় বলে তেহরান জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী যদি ভবিষ্যতেও আবারও হরমুজ প্রণালিতে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে, তবে তা বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি এবং গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। এই হুশিয়ারির মাধ্যমে ইরান একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা তাদের জলসীমায় কোনো ধরনের বিদেশি অনুপ্রবেশ বা হামলা বরদাশত করবে না। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান এবং মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে, কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো ধরনের সংঘাত পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল–জাজিরা

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের দামামা কি তবে আবারও বেজে উঠতে চলেছে? শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা যদি কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে না যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না; বরং আরও শক্তিশালী রূপে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান শুরু করবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, সবকিছু ঠিকঠাক না চললে ওয়াশিংটন আবারও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ ফিরে যেতে পারে। তবে এবার তা নিছক পুরনো অভিযান হবে না; এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’। যদিও এই ‘প্লাস’ বা বাড়তি অংশে ঠিক কী ধরনের সামরিক চমক থাকছে, তা কৌশলে গোপন রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তান ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অভিযান শুরু না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প সাময়িকভাবে ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন রণতরীর পাহারায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথ দেওয়া। এর পেছনে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসা প্রবল কূটনৈতিক চাপও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে এনবিসি নিউজ। ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনায় দেরি করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রহস্যময় হাসি দিয়ে কেবল বলেছেন, “আমরা খুব শীঘ্রই তা জানতে পারব।”
তবে আলোচনার টেবিলে যাই ঘটুক, সমুদ্রের নীল জলরাশি এরই মধ্যে বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ইরানি পতাকাবাহী দুটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ওমান উপসাগরের একটি ইরানি বন্দরে প্রবেশের মুখে চালানো এই হামলায় জাহাজ দুটি এখন পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়েছে। হোয়াইট হাউসের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
