মতামত
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবেগের স্থান যতটা জোরালো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতার কথা বারবার উচ্চারিত হলেও, শীতল বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আকার পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই ক্রয়ক্ষমতাই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ঢাকাকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করে, যার বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নির্দেশ করে যে, ভারত তার উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারের ওপর কতটা নির্ভরশীল। পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়েই এই পণ্যের সিংহভাগ বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা সরাসরি সেখানকার স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থাকে সচল রাখে। এছাড়া কলকাতার পর্যটন, খুচরা বস্ত্র ব্যবসা এবং চিকিৎসা সেবা খাত মূলত বাংলাদেশি সেবাগ্রহীতাদের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ক্ষমতা থাকে ক্রেতার হাতে; আর বাংলাদেশ এখানে ভারতের জন্য এক বিশাল ও অপরিহার্য ক্রেতা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলোর সিংহভাগই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য বা মনোপলি নেই। এই বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং নিরবচ্ছিন্ন রফতানি সুবিধা নিশ্চিত করতেই দিল্লি দীর্ঘকাল ঢাকার সাথে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমীকরণ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ ব্যাকরণ অনুযায়ী, বিক্রেতাকে সবসময় ক্রেতার চাহিদাকে সম্মান দিয়ে চলতে হয়। সারা বিশ্বে ভারতের সাথে উন্নত দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে এই সাধারণ ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার অভাব প্রায়ই দেখা যায়। তারা অদুরদর্শী বক্তব্যও দিয়ে থাকেন প্রকাশ্যে। পেঁয়াজ দিবেনা, চিকিৎসার জন্য যেতে দেবেনা বলে অনেক হুমকি গণমাধ্যমে এসেছে। অথচ বাস্তবতা হল, পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকলেও শুধু দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়ে দেশের চাহিদা পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে কম মূল্যেই হচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জনগোষ্ঠী যখন কেন্দ্রের শাসন কাঠামোর নানা সমীকরণে আবর্তিত, তখন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার মানুষের এই পৃথক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচয় প্রাপ্তিই আজকের এই অর্থনৈতিক সক্ষমতার পথ প্রশস্ত করেছে। প্রতিবেশী হিসেবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য কাম্য হলেও, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে বাণিজ্যিক বাস্তবতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মানের ওপর। ভারতের নীতিনির্ধারকদের এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা এখন এক অনস্বীকার্য সত্য।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবেগের স্থান যতটা জোরালো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতার কথা বারবার উচ্চারিত হলেও, শীতল বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আকার পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই ক্রয়ক্ষমতাই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ঢাকাকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করে, যার বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নির্দেশ করে যে, ভারত তার উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারের ওপর কতটা নির্ভরশীল। পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়েই এই পণ্যের সিংহভাগ বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা সরাসরি সেখানকার স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থাকে সচল রাখে। এছাড়া কলকাতার পর্যটন, খুচরা বস্ত্র ব্যবসা এবং চিকিৎসা সেবা খাত মূলত বাংলাদেশি সেবাগ্রহীতাদের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ক্ষমতা থাকে ক্রেতার হাতে; আর বাংলাদেশ এখানে ভারতের জন্য এক বিশাল ও অপরিহার্য ক্রেতা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলোর সিংহভাগই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য বা মনোপলি নেই। এই বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং নিরবচ্ছিন্ন রফতানি সুবিধা নিশ্চিত করতেই দিল্লি দীর্ঘকাল ঢাকার সাথে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমীকরণ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ ব্যাকরণ অনুযায়ী, বিক্রেতাকে সবসময় ক্রেতার চাহিদাকে সম্মান দিয়ে চলতে হয়। সারা বিশ্বে ভারতের সাথে উন্নত দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে এই সাধারণ ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার অভাব প্রায়ই দেখা যায়। তারা অদুরদর্শী বক্তব্যও দিয়ে থাকেন প্রকাশ্যে। পেঁয়াজ দিবেনা, চিকিৎসার জন্য যেতে দেবেনা বলে অনেক হুমকি গণমাধ্যমে এসেছে। অথচ বাস্তবতা হল, পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকলেও শুধু দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়ে দেশের চাহিদা পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে কম মূল্যেই হচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জনগোষ্ঠী যখন কেন্দ্রের শাসন কাঠামোর নানা সমীকরণে আবর্তিত, তখন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার মানুষের এই পৃথক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচয় প্রাপ্তিই আজকের এই অর্থনৈতিক সক্ষমতার পথ প্রশস্ত করেছে। প্রতিবেশী হিসেবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য কাম্য হলেও, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে বাণিজ্যিক বাস্তবতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মানের ওপর। ভারতের নীতিনির্ধারকদের এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা এখন এক অনস্বীকার্য সত্য।
