আন্তর্জাতিক
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—জাতীয় পদে আসীন হতে হলে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে হবে। সেই সমর্থনের বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন কিংবা লেবাননে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে গুরুত্বহীন মনে করা হতো। কিন্তু সেই পুরোনো সমীকরণ এখন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল যেন সেই পরিবর্তনেরই এক স্পষ্ট সংকেত, যেখানে ফিলিস্তিনপন্থি প্রার্থীরা অভূতপূর্ব বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির ভোটের ফলাফল মার্কিন রাজনীতির আকাশে বড় ধরনের এক পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে। নির্বাচনের রাতে যখন ফলাফল আসা শুরু হলো, তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভোটাররা এবার ভিন্ন পথে হাঁটছেন। বিদায়ী প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যানের পরাজয় এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ইসরায়েলের পক্ষে ও ফিলিস্তিনিদের বিপক্ষ অবস্থান নেওয়াই ছিল গোল্ডম্যানের ট্রেডমার্ক। গাজায় চলমান যুদ্ধ নিয়েও তিনি সোচ্চার অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ভোটাররা যখন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন তার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য কোটি কোটি ডলার অর্থায়নের বিষয়টি জনগণের কাছে হয়ে উঠেছিল চরম আপত্তিকর। এই নীতিই শেষ পর্যন্ত তার কাল হয়ে দাঁড়াল।
একইভাবে চমক দেখিয়েছেন দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। এআইপিএসি (AIPAC)-এর মতো শক্তিশালী লবির কোটি কোটি ডলারের প্রচারণাকেও উপেক্ষা করে তিনি পাঁচবারের ক্ষমতাসীন আদ্রিয়ানো এস্পাইলাটকে পরাজিত করেছেন। বিজয়ের পর তার সমাবেশে ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’ স্লোগান যেন এই নির্বাচনের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ফলাফল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও কঠোর। মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি ভোটারদের ৭৬ শতাংশ এবং অ্যারিজোনার সুইং স্টেট ভোটারদের ৭৬ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েল সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে। নিউ ইয়র্কের ভোটারদের মধ্যেও ৭০ শতাংশ একই মত পোষণ করেন। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের নীতি এবং সাধারণ জনগণের চিন্তার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনী মাঠের এই পরিসংখ্যান থেকে একটি বার্তাই পরিষ্কার—ফিলিস্তিনপন্থি হওয়া এখন আর রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং ভোটারদের সংগঠিত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ভোটাররা একে একটি 'রেড লাইন' ইস্যু হিসেবে দেখছেন, যেখানে মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে অন্য কোনো নীতি গ্রহণের সুযোগ নেই।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটারদের যে অংশটি পার্টির বিমুখ হয়েছিল, তারা মূলত এই ইসরায়েল নীতির কারণেই দূরত্ব তৈরি করেছিল। ২০২৮ সালের নির্বাচনেও যদি একই ধরনের অনমনীয় মনোভাব বজায় থাকে, তবে দলটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে, এই পরিবর্তন শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রিপাবলিকান পার্টির তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থনের বিরুদ্ধে সুর উঠছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের ৬৩ শতাংশ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে। যদিও রিপাবলিকানরা এই ইস্যুকে ব্যবহার করে ‘কঠোর অবস্থান’ গ্রহণের সুযোগ খুঁজছে, কিন্তু মূল সত্যটি হলো—ভোটাররা এখন মানবিক বিপর্যয়ের পাশে দাঁড়াতে পছন্দ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের কাছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া ইস্যুটি এখন অনেক বেশি বিতর্কিত। পার্টি যদি নিজেদের অবস্থান দ্রুত সংশোধন না করে, তবে সরকার গঠনের লড়াইয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীরা কয়েক দশক ধরে যে সংগ্রামের পথ ধরেছিলেন, আজ তার ফসল মিলতে শুরু করেছে। ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন সময় এসেছে সেই মূল্যবোধের পাশে দাঁড়ানোর, যা তারা নিজেদের আদর্শ বলে দাবি করে। অন্যথায়, ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এই দূরত্ব দলকে এক গভীর সংকটের দিকেই ঠেলে দেবে।
বিষয় : যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি
2.png)
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—জাতীয় পদে আসীন হতে হলে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে হবে। সেই সমর্থনের বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন কিংবা লেবাননে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে গুরুত্বহীন মনে করা হতো। কিন্তু সেই পুরোনো সমীকরণ এখন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল যেন সেই পরিবর্তনেরই এক স্পষ্ট সংকেত, যেখানে ফিলিস্তিনপন্থি প্রার্থীরা অভূতপূর্ব বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির ভোটের ফলাফল মার্কিন রাজনীতির আকাশে বড় ধরনের এক পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে। নির্বাচনের রাতে যখন ফলাফল আসা শুরু হলো, তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভোটাররা এবার ভিন্ন পথে হাঁটছেন। বিদায়ী প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যানের পরাজয় এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ইসরায়েলের পক্ষে ও ফিলিস্তিনিদের বিপক্ষ অবস্থান নেওয়াই ছিল গোল্ডম্যানের ট্রেডমার্ক। গাজায় চলমান যুদ্ধ নিয়েও তিনি সোচ্চার অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ভোটাররা যখন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন তার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য কোটি কোটি ডলার অর্থায়নের বিষয়টি জনগণের কাছে হয়ে উঠেছিল চরম আপত্তিকর। এই নীতিই শেষ পর্যন্ত তার কাল হয়ে দাঁড়াল।
একইভাবে চমক দেখিয়েছেন দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। এআইপিএসি (AIPAC)-এর মতো শক্তিশালী লবির কোটি কোটি ডলারের প্রচারণাকেও উপেক্ষা করে তিনি পাঁচবারের ক্ষমতাসীন আদ্রিয়ানো এস্পাইলাটকে পরাজিত করেছেন। বিজয়ের পর তার সমাবেশে ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’ স্লোগান যেন এই নির্বাচনের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ফলাফল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও কঠোর। মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি ভোটারদের ৭৬ শতাংশ এবং অ্যারিজোনার সুইং স্টেট ভোটারদের ৭৬ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েল সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে। নিউ ইয়র্কের ভোটারদের মধ্যেও ৭০ শতাংশ একই মত পোষণ করেন। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের নীতি এবং সাধারণ জনগণের চিন্তার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনী মাঠের এই পরিসংখ্যান থেকে একটি বার্তাই পরিষ্কার—ফিলিস্তিনপন্থি হওয়া এখন আর রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং ভোটারদের সংগঠিত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ভোটাররা একে একটি 'রেড লাইন' ইস্যু হিসেবে দেখছেন, যেখানে মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে অন্য কোনো নীতি গ্রহণের সুযোগ নেই।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটারদের যে অংশটি পার্টির বিমুখ হয়েছিল, তারা মূলত এই ইসরায়েল নীতির কারণেই দূরত্ব তৈরি করেছিল। ২০২৮ সালের নির্বাচনেও যদি একই ধরনের অনমনীয় মনোভাব বজায় থাকে, তবে দলটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে, এই পরিবর্তন শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রিপাবলিকান পার্টির তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থনের বিরুদ্ধে সুর উঠছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের ৬৩ শতাংশ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে। যদিও রিপাবলিকানরা এই ইস্যুকে ব্যবহার করে ‘কঠোর অবস্থান’ গ্রহণের সুযোগ খুঁজছে, কিন্তু মূল সত্যটি হলো—ভোটাররা এখন মানবিক বিপর্যয়ের পাশে দাঁড়াতে পছন্দ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের কাছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া ইস্যুটি এখন অনেক বেশি বিতর্কিত। পার্টি যদি নিজেদের অবস্থান দ্রুত সংশোধন না করে, তবে সরকার গঠনের লড়াইয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীরা কয়েক দশক ধরে যে সংগ্রামের পথ ধরেছিলেন, আজ তার ফসল মিলতে শুরু করেছে। ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন সময় এসেছে সেই মূল্যবোধের পাশে দাঁড়ানোর, যা তারা নিজেদের আদর্শ বলে দাবি করে। অন্যথায়, ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এই দূরত্ব দলকে এক গভীর সংকটের দিকেই ঠেলে দেবে।
2.png)