সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক

অর্থনৈতিক বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতায় বন্ধুত্বের নতুন রূপ নিচ্ছে দুই দেশ। রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুরস্ক এখন বাংলাদেশের এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।

নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
ছবি -সংগৃহীত

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন থাকলেও দীর্ঘ সময় নানা ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক সেভাবে গতি পায়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান এবং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিজেদের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের একের পর এক বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সহায়তার কার্যক্রম দুই দেশের বন্ধুত্বের গভীরতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই সম্পর্ককে আরও বেগবান করতে গত ৫ জুন ঢাকায় আসেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। দুই দিনের এই সফরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের আকার প্রায় ১৩০ কোটি ডলার, যা অদূর ভবিষ্যতে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উভয় পক্ষ। বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব ছাড়াও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দুদেশের অর্থনীতির জন্যই তা বড় সুফল বয়ে আনবে। বর্তমানে বাংলাদেশ তুরস্কে পাট, পোশাক, চামড়া ও সিরামিক রপ্তানি করে এবং তুলা, পেট্রোলিয়াম ও ইস্পাতজাতীয় পণ্য আমদানি করে। তবে ভবিষ্যতে ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতেও তুর্কি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ।

প্রতিরক্ষা খাতেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন বেশ গভীর ও কৌশলগত। বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের যে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেখানে তুরস্ক একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে। বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন, টি১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিংবা মাল্টিপল রকেট লঞ্চ সিস্টেম (এমএলআরএস) ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তুরস্ককে সমরাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে কিছু মহলে ভূরাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা চললেও, এটি মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনের অংশ। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের এমন প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিদ্যমান, ফলে একে কেবল বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যৌক্তিক।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও দুই দেশের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়ছে। তুর্কি ইতিহাসভিত্তিক ড্রামা সিরিজ বা টিভি সিরিয়ালগুলো বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ সমাজ তুর্কি সংস্কৃতি, পোশাক ও খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। স্কলারশিপ নিয়ে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সেতুবন্ধন দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও সহজ করছে। এখন কেবল দরকার ‘ইউনুস এমরে’ কালচারাল সেন্টারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, যা এই সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও টেকসই করতে ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশ ও তুরস্ক একে অপরের পরিপূরক বন্ধু হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

বিষয় : তুরষ্ক বাংলাদেশ সম্পর্ক

নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬


নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন থাকলেও দীর্ঘ সময় নানা ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক সেভাবে গতি পায়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান এবং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিজেদের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের একের পর এক বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সহায়তার কার্যক্রম দুই দেশের বন্ধুত্বের গভীরতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই সম্পর্ককে আরও বেগবান করতে গত ৫ জুন ঢাকায় আসেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। দুই দিনের এই সফরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের আকার প্রায় ১৩০ কোটি ডলার, যা অদূর ভবিষ্যতে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উভয় পক্ষ। বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব ছাড়াও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দুদেশের অর্থনীতির জন্যই তা বড় সুফল বয়ে আনবে। বর্তমানে বাংলাদেশ তুরস্কে পাট, পোশাক, চামড়া ও সিরামিক রপ্তানি করে এবং তুলা, পেট্রোলিয়াম ও ইস্পাতজাতীয় পণ্য আমদানি করে। তবে ভবিষ্যতে ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতেও তুর্কি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ।

প্রতিরক্ষা খাতেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন বেশ গভীর ও কৌশলগত। বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের যে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেখানে তুরস্ক একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে। বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন, টি১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিংবা মাল্টিপল রকেট লঞ্চ সিস্টেম (এমএলআরএস) ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তুরস্ককে সমরাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে কিছু মহলে ভূরাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা চললেও, এটি মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনের অংশ। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের এমন প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিদ্যমান, ফলে একে কেবল বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যৌক্তিক।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও দুই দেশের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়ছে। তুর্কি ইতিহাসভিত্তিক ড্রামা সিরিজ বা টিভি সিরিয়ালগুলো বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ সমাজ তুর্কি সংস্কৃতি, পোশাক ও খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। স্কলারশিপ নিয়ে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সেতুবন্ধন দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও সহজ করছে। এখন কেবল দরকার ‘ইউনুস এমরে’ কালচারাল সেন্টারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, যা এই সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও টেকসই করতে ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশ ও তুরস্ক একে অপরের পরিপূরক বন্ধু হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুলছে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত