শিক্ষাঙ্গন
মুম্বাইয়ের কোলাবার সরু গলি। একপাশে রঙের খেলায় মেতে ওঠা উজ্জ্বল লাল, নীল আর হলুদে রাঙানো বস্তিঘর, অন্যপাশে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত জীবন। এই দুই জগতের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রুবল নাগি দেখিয়েছেন, শিক্ষার আলো ছড়াতে সব সময় ইট-কাঠের দেয়াল বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন হয় না। শিল্পের তুলি আর ভালোবাসার স্পর্শে কীভাবে হাজারো প্রান্তিক শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি জিতে নিয়েছেন এবারের ‘গ্লোবাল টিচার প্রাইজ’। শিক্ষা খাতের অস্কারখ্যাত এই পুরস্কারের মূল্যমান এক মিলিয়ন ডলার।
প্রায় তিন দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় ফেরাতে কাজ করা রুবল নাগি এবার ১৩৯টি দেশের পাঁচ হাজার মনোনয়ন ও আবেদনকারীকে পেছনে ফেলে সেরা নির্বাচিত হয়েছেন। মার্চের শুরুতে ভার্কি ফাউন্ডেশন ও ইউনেসকোর সহযোগিতায় দশমবারের মতো দেওয়া এই পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাঁর উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির বিশ্বস্বীকৃতি মিলল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রুবল নাগি আর্ট ফাউন্ডেশন’ (আরএনএএফ)-এর মাধ্যমে ভারতের ১০০টিরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটিতে গড়ে তোলা হয়েছে ৮০০টির বেশি শিক্ষাকেন্দ্র। ‘লিভিং ওয়ালস অব লার্নিং’ বা জীবন্ত শিক্ষণ দেয়াল প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এক মিলিয়নেরও বেশি শিশুর কাছে শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
রুবল নাগির এই যাত্রার শুরুটা ছিল একদমই অপ্রত্যাশিত। তিন দশক আগে মুম্বাইয়ের এক কর্মশালায় আসা এক শিশুর সঙ্গে কথোপকথন থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, স্কুলের সুযোগ নেই বলেই বস্তির শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি বস্তিগুলোকে শুধু আবাস হিসেবে নয়, বরং ‘উন্মুক্ত আকাশের শ্রেণিকক্ষ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর মতে, কোনো শিশুই শিখতে অনাগ্রহী নয়; কেবল শিখনের মাধ্যমটিকে আকর্ষণীয় করে তোলাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। তাই তিনি শিল্পভিত্তিক শিক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে শিশুরা মাদুর বা কার্পেটে বসেও আনন্দ নিয়ে শিখতে পারে।
এই দীর্ঘ পথচলায় রুবল নাগির কাছে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের অক্ষর শেখে না, বরং একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তার ফাউন্ডেশনের শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না, প্রয়োজনে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কোনো শিক্ষার্থী যদি কয়েক দিন কেন্দ্রে না আসে, স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি তাদের বাড়িতে খোঁজ নিতে যান। রুবল বিশ্বাস করেন, বস্তিতে কাজ করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো কমিউনিটির আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। তাঁর ‘মিসাল’ বা উদাহরণ প্রকল্পের মাধ্যমে দেয়ালে শিক্ষামূলক চিত্র এঁকে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বস্তির বাসিন্দাদের জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
পুরস্কারের এক মিলিয়ন ডলারের অর্থ দিয়ে রুবল নাগি তাঁর কার্যক্রম ভারতের আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চান। বিশেষ করে নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত জম্মু ও কাশ্মীরে একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটারসম্ভব দক্ষতা ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলাই তাঁর এখনকার বড় লক্ষ্য। কোলাবার সেই শিক্ষাকেন্দ্রের দেয়ালে আঁকা প্রাণী আর উদ্ভিদের ছবির দিকে তাকিয়ে যখন সাত বছরের শিশু খুশি স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে সে নিজেই শিক্ষক হবে, তখন রুবল নাগির সাফল্যের আসল সার্থকতা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঝরে পড়া বা পিছিয়ে পড়া শিশুদের হাত ধরে যখন ভবিষ্যতে এক শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠবে, সেই স্বপ্নই প্রতিদিন তাঁকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
মুম্বাইয়ের কোলাবার সরু গলি। একপাশে রঙের খেলায় মেতে ওঠা উজ্জ্বল লাল, নীল আর হলুদে রাঙানো বস্তিঘর, অন্যপাশে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত জীবন। এই দুই জগতের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রুবল নাগি দেখিয়েছেন, শিক্ষার আলো ছড়াতে সব সময় ইট-কাঠের দেয়াল বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন হয় না। শিল্পের তুলি আর ভালোবাসার স্পর্শে কীভাবে হাজারো প্রান্তিক শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি জিতে নিয়েছেন এবারের ‘গ্লোবাল টিচার প্রাইজ’। শিক্ষা খাতের অস্কারখ্যাত এই পুরস্কারের মূল্যমান এক মিলিয়ন ডলার।
প্রায় তিন দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় ফেরাতে কাজ করা রুবল নাগি এবার ১৩৯টি দেশের পাঁচ হাজার মনোনয়ন ও আবেদনকারীকে পেছনে ফেলে সেরা নির্বাচিত হয়েছেন। মার্চের শুরুতে ভার্কি ফাউন্ডেশন ও ইউনেসকোর সহযোগিতায় দশমবারের মতো দেওয়া এই পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাঁর উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির বিশ্বস্বীকৃতি মিলল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রুবল নাগি আর্ট ফাউন্ডেশন’ (আরএনএএফ)-এর মাধ্যমে ভারতের ১০০টিরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটিতে গড়ে তোলা হয়েছে ৮০০টির বেশি শিক্ষাকেন্দ্র। ‘লিভিং ওয়ালস অব লার্নিং’ বা জীবন্ত শিক্ষণ দেয়াল প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এক মিলিয়নেরও বেশি শিশুর কাছে শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
রুবল নাগির এই যাত্রার শুরুটা ছিল একদমই অপ্রত্যাশিত। তিন দশক আগে মুম্বাইয়ের এক কর্মশালায় আসা এক শিশুর সঙ্গে কথোপকথন থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, স্কুলের সুযোগ নেই বলেই বস্তির শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি বস্তিগুলোকে শুধু আবাস হিসেবে নয়, বরং ‘উন্মুক্ত আকাশের শ্রেণিকক্ষ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর মতে, কোনো শিশুই শিখতে অনাগ্রহী নয়; কেবল শিখনের মাধ্যমটিকে আকর্ষণীয় করে তোলাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। তাই তিনি শিল্পভিত্তিক শিক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে শিশুরা মাদুর বা কার্পেটে বসেও আনন্দ নিয়ে শিখতে পারে।
এই দীর্ঘ পথচলায় রুবল নাগির কাছে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের অক্ষর শেখে না, বরং একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তার ফাউন্ডেশনের শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না, প্রয়োজনে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কোনো শিক্ষার্থী যদি কয়েক দিন কেন্দ্রে না আসে, স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি তাদের বাড়িতে খোঁজ নিতে যান। রুবল বিশ্বাস করেন, বস্তিতে কাজ করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো কমিউনিটির আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। তাঁর ‘মিসাল’ বা উদাহরণ প্রকল্পের মাধ্যমে দেয়ালে শিক্ষামূলক চিত্র এঁকে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বস্তির বাসিন্দাদের জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
পুরস্কারের এক মিলিয়ন ডলারের অর্থ দিয়ে রুবল নাগি তাঁর কার্যক্রম ভারতের আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চান। বিশেষ করে নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত জম্মু ও কাশ্মীরে একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটারসম্ভব দক্ষতা ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলাই তাঁর এখনকার বড় লক্ষ্য। কোলাবার সেই শিক্ষাকেন্দ্রের দেয়ালে আঁকা প্রাণী আর উদ্ভিদের ছবির দিকে তাকিয়ে যখন সাত বছরের শিশু খুশি স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে সে নিজেই শিক্ষক হবে, তখন রুবল নাগির সাফল্যের আসল সার্থকতা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঝরে পড়া বা পিছিয়ে পড়া শিশুদের হাত ধরে যখন ভবিষ্যতে এক শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠবে, সেই স্বপ্নই প্রতিদিন তাঁকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়।
2.png)