সোশ্যাল ট্রেন্ড
ফেসবুক বা টিকটকের স্ক্রল থামছেই না। সবাই যার যার মতো করে মনের ক্ষোভ ঝাড়ছেন, কাউকে খোঁচা দিচ্ছেন, কিংবা স্রেফ মজা করছেন—আর লেখার শেষে জুড়ে দিচ্ছেন দুটি শব্দ: 'রাগ করলা?' এই মুহূর্তে নেট দুনিয়ায় এটিই সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড। কিন্তু রাস্তার ধুলোবালি থেকে উঠে আসা এই দুই শব্দের নেপথ্যে কি কেবলই বিনোদন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অসুখ?
একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, এই ট্রেন্ডের জন্ম এক স্বঘোষিত কবিরাজের (যিনি আসলে ভাইরাল হওয়ার নেশায় মত্ত এক অভিনেতা) ভিডিও থেকে। ফুটপাতে সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষকে দাঁড় করিয়ে তিনি হাত দেখছেন আর অবলীলায় কিছু চেনা বুলি আউড়ে যাচ্ছেন।
'তুমি মানুষের ভালো করতে চাও, কিন্তু বিনিময়ে ক্ষতি পাও। বলো, ঠিক?' ওপাশ থেকে সরল মানুষটি মাথা নেড়ে সায় দিলেই কবিরাজ মুচকি হেসে বলছেন, 'কী, রাগ করলা?' এরপর তিনি উস্তাদের দোহাই দিয়ে হাজার টাকার কবিরাজি গাছ গছিয়ে দেওয়ার ধান্ধা করছেন।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এই সস্তা প্রতারণার ভেতরেও একটা অদ্ভুত সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমাদের একটু ভাবিয়ে তোলে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, কবিরাজের করা প্রতিটা প্রশ্নই একমুখী। সেখানে কোনো অর্জনের কথা নেই, কেবলই হারানোর আর ঠকে যাওয়ার গল্প।
→ কবিরাজ মানুষের অবচেতন মনের এক চিরন্তন দুঃখকে পুঁজি করে ব্যবসা ফেঁদেছে।
→ 'বিশ্বাস করে ঠকেছ' বা 'বিপদে কাউকে পাশে পাওনি'—এই কথাগুলো পৃথিবীর ৯৯ ভাগ মানুষের জীবনেরই চরম বাস্তব অভিজ্ঞতা।
→ কবিরাজ কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে অতীত বলছেন না, তিনি স্রেফ আমাদের সবার জীবনের এক অতি সাধারণ সত্যকে সামনে এনে চমকে দিচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'বার্নাম ইফেক্ট' (Barnum Effect)। এমন কিছু সাধারণ কথা বলা, যা শুনলে যে কোনো ব্যক্তির মনে হবে—আরে! এ তো হুবহু আমার কথাই বলছে! আমরা জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে কাউকে বিশ্বাস করে ঠকেছি, বন্ধুর বিপদে রাত-বিরাতে ছুটে গিয়েও নিজের দরকারে কাউকে পাশে পাইনি। কবিরাজ নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি, তিনি শুধু আমাদের চেনা ক্ষতগুলোয় আঙুল তুলছেন।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, এত সস্তা আর গৎবাঁধা কথা চেনার পরেও সাধারণ মানুষ কেন তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে? কেন জাদুমন্ত্রের মতো মানুষ তাঁর কথায় বশ হচ্ছে?
এখানেই আসল গল্প। এই চতুর লোকটা আসলে আমাদের সমাজের এক চরম শূন্যতাকে ধরে ফেলেছে। তা হলো—আমাদের একাকীত্ব। আমাদের শহুরে বা গ্রামীণ জীবনে এখন এমন মানুষের বড্ড অভাব, যে একটু সময় নিয়ে আমাদের কষ্টের কথা শুনবে।
আজকের দিনে আমরা প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে একটা করে দুঃখের পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছি। চাকরি, ব্যবসা কিংবা সংসার—সবখানেই এক অদৃশ্য লড়াই। মানুষ মনে মনে এমন একজনকে খোঁজে, যে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলবে, 'আমি জানি তুমি কতটা কষ্ট পেয়েছ।' ফুটপাতের ওই ধুরন্ধর লোকটা কিন্তু সমব্যথী নয়, সে খাঁটি ধান্ধাবাজ। কিন্তু সে নিজের আখের গোছাতে আমাদের ভেতরের সেই অবদমিত সমবেদনা পাওয়ার তীব্র ইচ্ছাকেই অস্ত্র বানিয়েছে।
ভিডিওগুলো দেখে আমরা হাসছি, মিম বানাচ্ছি, বন্ধুদের ট্যাগ করে টিটকারি করছি—সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী স্বাভাবিক। কিন্তু বিনোদনের এই চাদরটা সরিয়ে দিলে যে সত্যটা বেরিয়ে আসে, তা বেশ আশঙ্কাজনক।
একটি কবিরাজি গাছের বাণিজ্য সফল হয় তখনই, যখন একটা গোটা সমাজ ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা আর সমবেদনার কাঙাল হয়ে পড়ে।
'রাগ করলা?' বলে অপরকে ট্রল করার ট্রেন্ড হয়তো কিছুদিন পর হারিয়ে যাবে, নতুন কোনো মিম এসে দখল করবে আমাদের টাইমলাইন। তবে আসল সত্য হলো, বন্ধু থেকে স্রেফ দর্শক হতে আমাদের বেশি সময় লাগে না। আমাদের পাশের মানুষটার দুঃখ শোনার, তাঁর একটু খোঁজ নেওয়ার অভ্যাসটা যদি আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে এমন হাজারো ছদ্মবেশী কবিরাজ আমাদের সরলতার ফায়দা তুলতেই থাকবে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ফেসবুকের ওয়ালেই সমব্যথী সেজে থাকব? নাকি বাস্তবের চায়ের কাপ হাতে পাশের মানুষটার কাঁধে হাত রেখে বলতে পারব—'মন খারাপ করলা?'
বিষয় : কি রাগ করলা?
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
ফেসবুক বা টিকটকের স্ক্রল থামছেই না। সবাই যার যার মতো করে মনের ক্ষোভ ঝাড়ছেন, কাউকে খোঁচা দিচ্ছেন, কিংবা স্রেফ মজা করছেন—আর লেখার শেষে জুড়ে দিচ্ছেন দুটি শব্দ: 'রাগ করলা?' এই মুহূর্তে নেট দুনিয়ায় এটিই সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড। কিন্তু রাস্তার ধুলোবালি থেকে উঠে আসা এই দুই শব্দের নেপথ্যে কি কেবলই বিনোদন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অসুখ?
একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, এই ট্রেন্ডের জন্ম এক স্বঘোষিত কবিরাজের (যিনি আসলে ভাইরাল হওয়ার নেশায় মত্ত এক অভিনেতা) ভিডিও থেকে। ফুটপাতে সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষকে দাঁড় করিয়ে তিনি হাত দেখছেন আর অবলীলায় কিছু চেনা বুলি আউড়ে যাচ্ছেন।
'তুমি মানুষের ভালো করতে চাও, কিন্তু বিনিময়ে ক্ষতি পাও। বলো, ঠিক?' ওপাশ থেকে সরল মানুষটি মাথা নেড়ে সায় দিলেই কবিরাজ মুচকি হেসে বলছেন, 'কী, রাগ করলা?' এরপর তিনি উস্তাদের দোহাই দিয়ে হাজার টাকার কবিরাজি গাছ গছিয়ে দেওয়ার ধান্ধা করছেন।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এই সস্তা প্রতারণার ভেতরেও একটা অদ্ভুত সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমাদের একটু ভাবিয়ে তোলে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, কবিরাজের করা প্রতিটা প্রশ্নই একমুখী। সেখানে কোনো অর্জনের কথা নেই, কেবলই হারানোর আর ঠকে যাওয়ার গল্প।
→ কবিরাজ মানুষের অবচেতন মনের এক চিরন্তন দুঃখকে পুঁজি করে ব্যবসা ফেঁদেছে।
→ 'বিশ্বাস করে ঠকেছ' বা 'বিপদে কাউকে পাশে পাওনি'—এই কথাগুলো পৃথিবীর ৯৯ ভাগ মানুষের জীবনেরই চরম বাস্তব অভিজ্ঞতা।
→ কবিরাজ কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে অতীত বলছেন না, তিনি স্রেফ আমাদের সবার জীবনের এক অতি সাধারণ সত্যকে সামনে এনে চমকে দিচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'বার্নাম ইফেক্ট' (Barnum Effect)। এমন কিছু সাধারণ কথা বলা, যা শুনলে যে কোনো ব্যক্তির মনে হবে—আরে! এ তো হুবহু আমার কথাই বলছে! আমরা জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে কাউকে বিশ্বাস করে ঠকেছি, বন্ধুর বিপদে রাত-বিরাতে ছুটে গিয়েও নিজের দরকারে কাউকে পাশে পাইনি। কবিরাজ নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি, তিনি শুধু আমাদের চেনা ক্ষতগুলোয় আঙুল তুলছেন।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, এত সস্তা আর গৎবাঁধা কথা চেনার পরেও সাধারণ মানুষ কেন তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে? কেন জাদুমন্ত্রের মতো মানুষ তাঁর কথায় বশ হচ্ছে?
এখানেই আসল গল্প। এই চতুর লোকটা আসলে আমাদের সমাজের এক চরম শূন্যতাকে ধরে ফেলেছে। তা হলো—আমাদের একাকীত্ব। আমাদের শহুরে বা গ্রামীণ জীবনে এখন এমন মানুষের বড্ড অভাব, যে একটু সময় নিয়ে আমাদের কষ্টের কথা শুনবে।
আজকের দিনে আমরা প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে একটা করে দুঃখের পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছি। চাকরি, ব্যবসা কিংবা সংসার—সবখানেই এক অদৃশ্য লড়াই। মানুষ মনে মনে এমন একজনকে খোঁজে, যে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলবে, 'আমি জানি তুমি কতটা কষ্ট পেয়েছ।' ফুটপাতের ওই ধুরন্ধর লোকটা কিন্তু সমব্যথী নয়, সে খাঁটি ধান্ধাবাজ। কিন্তু সে নিজের আখের গোছাতে আমাদের ভেতরের সেই অবদমিত সমবেদনা পাওয়ার তীব্র ইচ্ছাকেই অস্ত্র বানিয়েছে।
ভিডিওগুলো দেখে আমরা হাসছি, মিম বানাচ্ছি, বন্ধুদের ট্যাগ করে টিটকারি করছি—সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী স্বাভাবিক। কিন্তু বিনোদনের এই চাদরটা সরিয়ে দিলে যে সত্যটা বেরিয়ে আসে, তা বেশ আশঙ্কাজনক।
একটি কবিরাজি গাছের বাণিজ্য সফল হয় তখনই, যখন একটা গোটা সমাজ ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা আর সমবেদনার কাঙাল হয়ে পড়ে।
'রাগ করলা?' বলে অপরকে ট্রল করার ট্রেন্ড হয়তো কিছুদিন পর হারিয়ে যাবে, নতুন কোনো মিম এসে দখল করবে আমাদের টাইমলাইন। তবে আসল সত্য হলো, বন্ধু থেকে স্রেফ দর্শক হতে আমাদের বেশি সময় লাগে না। আমাদের পাশের মানুষটার দুঃখ শোনার, তাঁর একটু খোঁজ নেওয়ার অভ্যাসটা যদি আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে এমন হাজারো ছদ্মবেশী কবিরাজ আমাদের সরলতার ফায়দা তুলতেই থাকবে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ফেসবুকের ওয়ালেই সমব্যথী সেজে থাকব? নাকি বাস্তবের চায়ের কাপ হাতে পাশের মানুষটার কাঁধে হাত রেখে বলতে পারব—'মন খারাপ করলা?'
2.png)