জাতীয়
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের একটা চিরকালের দুঃখ আছে—নদী এখানে যেমন আশীর্বাদ, যোগাযোগের বেলায় তেমনই মস্ত বড় দেয়াল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে বসে থাকা যাদের নিত্যদিনের অভ্যাস, তারা জানেন একটা সেতুর মূল্য কতখানি। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফলের বগা ফেরিঘাটে মঙ্গলবার দুপুরে যা ঘটল, তা এক কথায় নজিরবিহীন। একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে খোদ সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে পড়তে হলো অবরুদ্ধ দশায়। আর এই ঘটনার নেপথ্যে কোনো সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল না, ছিল দুই মিত্র দলের রাজনৈতিক ইগো আর কৃতিত্ব নেওয়ার কাড়াকাড়ি।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, নেতাদের এই রেষারেষির খেসারত শেষ পর্যন্ত কাকে দিতে হচ্ছে?
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ। লোহালিয়া নদীর ওপর নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের কাজ কতটা সম্ভব, তা দেখতেই মন্ত্রী এসেছিলেন বগা ফেরিঘাটে। ভোলা, লক্ষ্মীপুর আর পটুয়াখালীকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য এই সেতুটি ভীষণ জরুরি। নদীর পূর্বপাড়ে একটি সভার আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। মন্ত্রী ফেরি পার হয়ে ওপাড়ে পা রাখতেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
সেখানে আগে থেকেই জড়ো হওয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা হঠাৎ মন্ত্রীকে ঘিরে ধরেন। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে তৈরি হয় তুমুল উত্তেজনা। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি স্লোগান। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, মন্ত্রী তাঁর গাড়িবহর নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বাইরে থেকে এটাকে হঠাৎ তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা মনে হলেও, এর ভেতরে ছিল অন্য হিসাব। বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজের কথায় সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সভাস্থলের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি না থাকায় কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সোজা কথায়, ঘরের ভেতরে মান-অভিমানের যে আগুন জ্বলছিল, তারই আঁচ এসে লাগল মন্ত্রীর গায়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, এই ঝামেলার মূলে রয়েছে 'ক্রেডিট' বা কৃতিত্ব নেওয়ার রাজনীতি। স্থানীয় মানুষের মুখে এখন একটাই আলোচনা—যদি বগা সেতুটি তৈরি হয়, তবে তার পুরো বাহবা চলে যাবে জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের ঝুলিতে। আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে যা বিএনপিকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পারে। আর এই ভয় থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
→ উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই জনভোগান্তি বাড়ায়।
→বিএনপির একাংশ মনে করছে সেতু হলে জামায়াত ফায়দা পাবে, আবার মহিলা দল নেত্রী বলছেন সেতু করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এখানে ক্রেডিট নিয়ে স্পষ্ট ভাগাভাগি দৃশ্যমান।
→ সেতুটি সময়মতো না হলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ফেরিঘাটের দুর্ভোগ পোহাতে হবে, যার জন্য দায়ী কেবল রাজনৈতিক জেদ।
অবশ্য পটুয়াখালী মহিলা দলের সদস্য নাজমুন্নাহার নাজু এই জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুরো অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জনগণের কল্যাণের জন্য এই সেতু অতি দ্রুত নির্মাণ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নেতারা যে যার মতো যুক্তি দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মন্ত্রী যেভাবে বিরক্ত হয়ে ওপার থেকে ফিরে এসে পটুয়াখালীর পথ ধরলেন এবং সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বললেন না, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার—ধাক্কাটা শুধু মন্ত্রীর গাড়িবহরে লাগেনি, লেগেছে সেতুর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।
পুলিশের সহায়তায় মন্ত্রী সে যাত্রায় পার পেয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু বাউফলের সাধারণ মানুষের মনের শঙ্কা দূর হয়নি। রাজনীতির মাঠে কে কার চেয়ে বড়, কার ছবি ব্যানারে থাকবে আর কে ফিতা কাটবে—এই দ্বন্দ্বে এর আগেও দেশের বহু বড় বড় প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে গেছে।
বাউফলের সাধারণ মানুষ এখন ভাবছেন, বিএনপি আর জামায়াতের এই অভ্যন্তরীণ রেষারেষির কারণে বগা সেতুর ফাইলটা আবার লাল ফিতের বাঁধনে আটকে যাবে না তো?
বন্ধুত্ব আর জোটের রাজনীতিতে মান-অভিমান থাকতেই পারে, কিন্তু যখন মাটির ওপর কংক্রিটের সেতু গড়ে তোলার স্বপ্ন থমকে যায়, তখন ক্ষতিটা কোনো দলের হয় না, ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। প্রশ্ন হলো, নেতারা কি নিজেদের হিসাব মেলাবেন, নাকি মানুষের কষ্টের কথা ভেবে একটু ছাড় দেবেন?
বিষয় : শেখ রবিউল আলম বাউফল সেতুমন্ত্রী
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের একটা চিরকালের দুঃখ আছে—নদী এখানে যেমন আশীর্বাদ, যোগাযোগের বেলায় তেমনই মস্ত বড় দেয়াল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে বসে থাকা যাদের নিত্যদিনের অভ্যাস, তারা জানেন একটা সেতুর মূল্য কতখানি। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফলের বগা ফেরিঘাটে মঙ্গলবার দুপুরে যা ঘটল, তা এক কথায় নজিরবিহীন। একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে খোদ সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে পড়তে হলো অবরুদ্ধ দশায়। আর এই ঘটনার নেপথ্যে কোনো সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল না, ছিল দুই মিত্র দলের রাজনৈতিক ইগো আর কৃতিত্ব নেওয়ার কাড়াকাড়ি।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, নেতাদের এই রেষারেষির খেসারত শেষ পর্যন্ত কাকে দিতে হচ্ছে?
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ। লোহালিয়া নদীর ওপর নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের কাজ কতটা সম্ভব, তা দেখতেই মন্ত্রী এসেছিলেন বগা ফেরিঘাটে। ভোলা, লক্ষ্মীপুর আর পটুয়াখালীকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য এই সেতুটি ভীষণ জরুরি। নদীর পূর্বপাড়ে একটি সভার আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। মন্ত্রী ফেরি পার হয়ে ওপাড়ে পা রাখতেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
সেখানে আগে থেকেই জড়ো হওয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা হঠাৎ মন্ত্রীকে ঘিরে ধরেন। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে তৈরি হয় তুমুল উত্তেজনা। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি স্লোগান। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, মন্ত্রী তাঁর গাড়িবহর নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বাইরে থেকে এটাকে হঠাৎ তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা মনে হলেও, এর ভেতরে ছিল অন্য হিসাব। বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজের কথায় সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সভাস্থলের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি না থাকায় কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সোজা কথায়, ঘরের ভেতরে মান-অভিমানের যে আগুন জ্বলছিল, তারই আঁচ এসে লাগল মন্ত্রীর গায়ে।
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, এই ঝামেলার মূলে রয়েছে 'ক্রেডিট' বা কৃতিত্ব নেওয়ার রাজনীতি। স্থানীয় মানুষের মুখে এখন একটাই আলোচনা—যদি বগা সেতুটি তৈরি হয়, তবে তার পুরো বাহবা চলে যাবে জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের ঝুলিতে। আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে যা বিএনপিকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পারে। আর এই ভয় থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
→ উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই জনভোগান্তি বাড়ায়।
→বিএনপির একাংশ মনে করছে সেতু হলে জামায়াত ফায়দা পাবে, আবার মহিলা দল নেত্রী বলছেন সেতু করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এখানে ক্রেডিট নিয়ে স্পষ্ট ভাগাভাগি দৃশ্যমান।
→ সেতুটি সময়মতো না হলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ফেরিঘাটের দুর্ভোগ পোহাতে হবে, যার জন্য দায়ী কেবল রাজনৈতিক জেদ।
অবশ্য পটুয়াখালী মহিলা দলের সদস্য নাজমুন্নাহার নাজু এই জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুরো অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জনগণের কল্যাণের জন্য এই সেতু অতি দ্রুত নির্মাণ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নেতারা যে যার মতো যুক্তি দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মন্ত্রী যেভাবে বিরক্ত হয়ে ওপার থেকে ফিরে এসে পটুয়াখালীর পথ ধরলেন এবং সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বললেন না, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার—ধাক্কাটা শুধু মন্ত্রীর গাড়িবহরে লাগেনি, লেগেছে সেতুর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।
পুলিশের সহায়তায় মন্ত্রী সে যাত্রায় পার পেয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু বাউফলের সাধারণ মানুষের মনের শঙ্কা দূর হয়নি। রাজনীতির মাঠে কে কার চেয়ে বড়, কার ছবি ব্যানারে থাকবে আর কে ফিতা কাটবে—এই দ্বন্দ্বে এর আগেও দেশের বহু বড় বড় প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে গেছে।
বাউফলের সাধারণ মানুষ এখন ভাবছেন, বিএনপি আর জামায়াতের এই অভ্যন্তরীণ রেষারেষির কারণে বগা সেতুর ফাইলটা আবার লাল ফিতের বাঁধনে আটকে যাবে না তো?
বন্ধুত্ব আর জোটের রাজনীতিতে মান-অভিমান থাকতেই পারে, কিন্তু যখন মাটির ওপর কংক্রিটের সেতু গড়ে তোলার স্বপ্ন থমকে যায়, তখন ক্ষতিটা কোনো দলের হয় না, ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। প্রশ্ন হলো, নেতারা কি নিজেদের হিসাব মেলাবেন, নাকি মানুষের কষ্টের কথা ভেবে একটু ছাড় দেবেন?
2.png)