শিক্ষাঙ্গন
একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, এনটিআরসিএ-র নিবন্ধন সনদ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার টেবুলেশন শিট এবং মাউশির প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে এই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে এক প্রকার বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৬৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৬২ জনের নিয়োগই সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত। তদন্তে দেখা গেছে, বেশির ভাগ শিক্ষকের কোনো বৈধ শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই; অনেকে তো চাকুরির জন্য কোনো আবেদনই করেননি, এমনকি পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি ক্লাসরুমে ঢুকে গেছেন। নথিপত্রের এই বিশাল শূন্যতা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের পকেট ভারী করতেই এই ভুতুড়ে নিয়োগ বাণিজ্য চালানো হয়েছিল।
বিগত ২০১০ সাল থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন খাতে হওয়া আর্থিক নয়ছয়ের পরিমাণ আকাশচুম্বী। ডিআইএ-র তদন্ত দল মোট ৬০৫ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪২ টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। এই মহালুটের প্রধান খাতগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ভাউচারহীন ভূতুড়ে নির্মাণকাজ: ভবন নির্মাণ ও মেরামত খাতে সবচেয়ে বড় অনিয়মটি হয়েছে। কোনো ধরনের ভাউচার, খরচের প্রক্রিয়া বা গভর্নিং বডির রেজল্যুশন ছাড়াই ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
অবৈধ ‘একাডেমিক ও নগর ভাতা’: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা বা অনুমোদন ছাড়াই ৮১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ভাতার নামে দেওয়া হয়েছে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
নিজস্ব প্রেস থাকতেও মুদ্রণ কেলেঙ্কারি: প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র ও খাতা ছাপানোর নামে ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যা সরাসরি ‘আত্মসাৎ’ হিসেবে গণ্য করেছে তদন্ত দল।
ম্যাগাজিন না ছেপেই কোটি টাকা গায়েব: বছরের পর বছর কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ না করেই স্রেফ কাগজ-কলমে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে।
ক্যান্টিন ও শাখার অর্থ লোপাট: ইব্রাহিমপুর শাখার আদায়কৃত ৬৬.৫৩ লাখ টাকা এবং ক্যানটিন বাবদ সংগৃহীত ৭৯.২০ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে সরাসরি পকেটস্থ করা হয়েছে।
পাবলিক ফান্ড থেকে পকেট মানি: নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা সম্মানী বা সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ তুলে নিয়েছেন ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
"মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রকৃত অর্থে শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে একটি বৃহৎ শিক্ষার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে। বিগত সরকারের সময়ে শুরু হওয়া দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সীমাহীন অর্থ আদায় এখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।"
— ডিআইএ-র তদন্ত প্রতিবেদন
২৯ হাজার ২০৯ জন শিক্ষার্থীর এই বিশাল সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রভাতি ও দিবা মিলিয়ে মোট ১৪টি শিফট চালানো হচ্ছিল। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৪টি শিফটের; অর্থাৎ বাকি ১০টি শিফটই সম্পূর্ণ অবৈধ। এত বড় অনিয়ম বছরের পর বছর টিকে থাকার নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক আশকারা।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে এই প্রতিষ্ঠানের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি তথা সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার ও তাঁর পরিবারের হাতে। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় তিনি কারাগারে থাকলেও, তাঁর রেখে যাওয়া দুর্নীতির ক্ষতচিহ্ন এখন বহন করছে এই বিদ্যাপীঠ।
ডিআইএ-র পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, এই চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আত্মসাৎকৃত অর্থ ও বকেয়া ভ্যাটসহ (প্রায় ৩৬.৭৫ কোটি টাকা) সমস্ত অবৈধ ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, একক ব্যবস্থাপনায় এই বিপুল শিক্ষার্থী পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব ও জটিল হওয়ায়, মনিপুরের বর্তমান ছয়টি শাখা ক্যাম্পাসকে ভেঙে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন ছয়টি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করার একটি বৈপ্লবিক পরামর্শও দিয়েছে তদন্ত কমিটি। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ‘শিক্ষা কারখানা’কে টেনে হিঁচড়ে আবার পবিত্র আলোয় ফিরিয়ে আনতে কতটা দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়।
সূত্রঃ আজকের পত্রিকা
2.png)
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, এনটিআরসিএ-র নিবন্ধন সনদ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার টেবুলেশন শিট এবং মাউশির প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে এই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে এক প্রকার বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৬৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৬২ জনের নিয়োগই সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত। তদন্তে দেখা গেছে, বেশির ভাগ শিক্ষকের কোনো বৈধ শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই; অনেকে তো চাকুরির জন্য কোনো আবেদনই করেননি, এমনকি পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি ক্লাসরুমে ঢুকে গেছেন। নথিপত্রের এই বিশাল শূন্যতা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের পকেট ভারী করতেই এই ভুতুড়ে নিয়োগ বাণিজ্য চালানো হয়েছিল।
বিগত ২০১০ সাল থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন খাতে হওয়া আর্থিক নয়ছয়ের পরিমাণ আকাশচুম্বী। ডিআইএ-র তদন্ত দল মোট ৬০৫ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪২ টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। এই মহালুটের প্রধান খাতগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ভাউচারহীন ভূতুড়ে নির্মাণকাজ: ভবন নির্মাণ ও মেরামত খাতে সবচেয়ে বড় অনিয়মটি হয়েছে। কোনো ধরনের ভাউচার, খরচের প্রক্রিয়া বা গভর্নিং বডির রেজল্যুশন ছাড়াই ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
অবৈধ ‘একাডেমিক ও নগর ভাতা’: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা বা অনুমোদন ছাড়াই ৮১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ভাতার নামে দেওয়া হয়েছে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
নিজস্ব প্রেস থাকতেও মুদ্রণ কেলেঙ্কারি: প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র ও খাতা ছাপানোর নামে ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যা সরাসরি ‘আত্মসাৎ’ হিসেবে গণ্য করেছে তদন্ত দল।
ম্যাগাজিন না ছেপেই কোটি টাকা গায়েব: বছরের পর বছর কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ না করেই স্রেফ কাগজ-কলমে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে।
ক্যান্টিন ও শাখার অর্থ লোপাট: ইব্রাহিমপুর শাখার আদায়কৃত ৬৬.৫৩ লাখ টাকা এবং ক্যানটিন বাবদ সংগৃহীত ৭৯.২০ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে সরাসরি পকেটস্থ করা হয়েছে।
পাবলিক ফান্ড থেকে পকেট মানি: নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা সম্মানী বা সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ তুলে নিয়েছেন ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
"মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রকৃত অর্থে শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে একটি বৃহৎ শিক্ষার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে। বিগত সরকারের সময়ে শুরু হওয়া দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সীমাহীন অর্থ আদায় এখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।"
— ডিআইএ-র তদন্ত প্রতিবেদন
২৯ হাজার ২০৯ জন শিক্ষার্থীর এই বিশাল সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রভাতি ও দিবা মিলিয়ে মোট ১৪টি শিফট চালানো হচ্ছিল। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৪টি শিফটের; অর্থাৎ বাকি ১০টি শিফটই সম্পূর্ণ অবৈধ। এত বড় অনিয়ম বছরের পর বছর টিকে থাকার নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক আশকারা।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে এই প্রতিষ্ঠানের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি তথা সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার ও তাঁর পরিবারের হাতে। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় তিনি কারাগারে থাকলেও, তাঁর রেখে যাওয়া দুর্নীতির ক্ষতচিহ্ন এখন বহন করছে এই বিদ্যাপীঠ।
ডিআইএ-র পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, এই চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আত্মসাৎকৃত অর্থ ও বকেয়া ভ্যাটসহ (প্রায় ৩৬.৭৫ কোটি টাকা) সমস্ত অবৈধ ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, একক ব্যবস্থাপনায় এই বিপুল শিক্ষার্থী পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব ও জটিল হওয়ায়, মনিপুরের বর্তমান ছয়টি শাখা ক্যাম্পাসকে ভেঙে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন ছয়টি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করার একটি বৈপ্লবিক পরামর্শও দিয়েছে তদন্ত কমিটি। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ‘শিক্ষা কারখানা’কে টেনে হিঁচড়ে আবার পবিত্র আলোয় ফিরিয়ে আনতে কতটা দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়।
সূত্রঃ আজকের পত্রিকা
2.png)