সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 করপোরেটকরপোরেট

মহাকালের দর্পণে প্রযুক্তি: কোডিংয়ের মৃত্যু ও ‘এজেন্টিক’ সভ্যতার উদয়

মহাকালের দর্পণে প্রযুক্তি: কোডিংয়ের মৃত্যু ও ‘এজেন্টিক’ সভ্যতার উদয়
ছবি -সংগৃহীত

মহাকালের চাকা যখন ঘোরে, তখন সে কেবল সময়কে পেছনে ফেলে না, বরং চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় মানুষের তৈরি বহু প্রাচীন ধারণাকে। আজ থেকে এক দশক আগেও যে তরুণটি কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ‘হ্যালো ওয়ার্ল্ড’ লিখে কোডিংয়ের দুনিয়ায় পা রেখে ভেবেছিল তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত, ২০২৬ সালের এই মে দ্বিপ্রহরে এসে সে দেখছে এক অদ্ভুত নীরবতা। সিলিকন ভ্যালির কাচঘেরা দালান থেকে শুরু করে ঢাকার কাওরান বাজারের সফটওয়্যার পাড়া—সবখানেই আজ এক অদৃশ্য ওলটপালট।

প্রযুক্তির এই মহাজাগতিক রূপান্তরকে বুঝতে আমাদের কোনো তাত্ত্বিক গবেষণাগারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা তাকাতে পারি ফাহিম মুনতাসিরের দিকে। চার বছর ধরে যিনি মধ্যম সারির ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। গত বছর বৈশ্বিক এক টেক-জায়ান্টের ‘রিমোট’ কর্মসংস্থানের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে দেশি চাকরিটি ছেড়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববাজারের ঝোড়ো হাওয়ায় সেই কোম্পানিটি রাতারাতি বিলুপ্ত হলে ফাহিম যখন আবার চেনা বাজারে ফিরলেন, তখন দেখলেন চারপাশটা কেমন যেন অচেনা, সংকুচিত এবং নির্মম।

বিগত চার মাস ধরে এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে কড়া নেড়ে ফাহিম বলছেন:

"বাজারের চেনা সমীকরণগুলো ওলটপালট হয়ে গেছে। কোডিং জানা মানুষের সংখ্যা যেখানে বাড়ছে, সেখানে কোডিংয়ের পদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমছে।"


ডেটা-গ্রাফ: ২০২৬-এর নির্মম পরিসংখ্যান

ফাহিমের এই ব্যক্তিগত সংকট আসলে এক বৈশ্বিক মহাপ্রবাহের ক্ষুদ্রতম অংশ। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক মহানির্দেশিকা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানকে গিলে খেতে পারে। কেউ কেউ একে অতি-আশঙ্কা বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের হার্ড-ডেটা কিন্তু অন্য কথা বলছে।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বৈশ্বিক ছাঁটাই: ৪৫,৩৬৩ জন 

এআই ও অটোমেশনের কারণে ছাঁটাই: ৯,২৩৮ জন (২০.৪%) যা,২০২৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ৮%]

একই সাথে বহুজাতিক গবেষণা সংস্থা ‘সিগন্যালফায়ার’ ও ‘লিংকডইন’ এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথাগত এন্ট্রি-লেভেল বা নতুনদের জন্য জুনিয়র পদের নিয়োগ এক ধাক্কায় ২৫% কমে গেছে। অথচ এর বিপরীতে ‘এআই স্পেশালিস্ট’ বা ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার’ এর বিজ্ঞাপনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, যা প্রায় ৩৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।


ঢাকা ডায়েরি: দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের নাভিশ্বাস

এই রূপান্তরের ঢেউ যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলেও আছড়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট করলেন এ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও টেকনোক্র্যাটরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান মেগাটেক সল্যুশনসের প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট ড. তানভীর এজাজ মনে করেন, এবারের পরিবর্তনটি পূর্বের যেকোনো টেক-বিপ্লবের চেয়ে আলাদা। তিনি বলেন:

"যাঁরা স্রেফ সিনট্যাক্স মুখস্থ করে কোড লিখতেন, তাঁদের দিন শেষ। নতুনদের মধ্যে যাঁদের সফটওয়্যার আর্কিটেকচার এবং সিস্টেম ডিজাইনের ওপর গভীর বুৎপত্তি নেই, এই এআই-প্রচলিত বাজারে তাঁদের টিকে থাকা অসম্ভব।"

বাস্তবতা এতটাই কঠিন যে, অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো কর্মী ইস্তফা দিলে সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন করে আর কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে না। ‘টাইগার কোড’ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জামানও স্বীকার করলেন এই সংকোচন নীতির কথা। তিনি জানান, বর্তমানে তাঁরা ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতিতে হাঁটছেন, যার ফলে অনেক টেকনিক্যাল পদ খালিই পড়ে আছে।


দক্ষতা বনাম উৎপাদনশীলতা: দুই সপ্তাহের কাজ দুই ঘণ্টায়

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যে এআই তরুণদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তা কিন্তু করপোরেট দুনিয়ায় উৎপাদনশীলতার এক অবিশ্বাস্য জোয়ার এনেছে। পূর্বে যে জটিল মডিউল বা অ্যালগরিদম তৈরি করতে একজন ডেভেলপারের অন্তত দুই সপ্তাহ বা ১৪ দিন সময় লাগত, বর্তমান ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI) টুল ব্যবহার করে একজন দক্ষ স্থপতি তা মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনছেন। অর্থাৎ, মানুষের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমলেও মেধার তীব্রতা বাড়ছে।

অবশ্য দেশের এই মন্দার পেছনে কেবল এআই-কে এককভাবে দোষ দিতে নারাজ শাহরিয়ার জামান। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সরকারের আমলের বেশ কিছু বড় বড় মেগা আইটি প্রজেক্ট বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের পর্যালোচনার টেবিলে আটকে আছে। নতুন কোনো প্রকল্পও শুরু হয়নি। রাষ্ট্রীয় চাকা সচল হলে বাজারে আবার গতি ফিরবে।


শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রের দর্শন: আতঙ্ক নয়, অভিযোজন

এই মহা-সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের প্রবীণ শিক্ষাবিদেরা অবশ্য আশার বাণী শোনাচ্ছেন। বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মাসুম বিল্লাহর মতে, চাকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে বাষ্পীয় ইঞ্জিন কিংবা ইন্টারনেট—প্রতিটি বড় প্রযুক্তিই মানুষের তৈরি পুরোনো কাজকে ধ্বংস করে নতুন কাজের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন:

"মৌলিক বা সাধারণ কোডিং হয়তো রোবট করবে, কিন্তু একটি সিস্টেমের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি, মানবিক মনস্তত্ত্ব বোঝা, এবং চূড়ান্ত উদ্ভাবনে মানুষের মস্তিষ্কই শেষ কথা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘লাইফ-লং লার্নিং’ বা আজীবন শেখার দর্শনে রূপান্তর করতে হবে।"

ইতিমধ্যেই তাঁর বিভাগ প্রথাগত সিলেবাস ভেঙে ‘এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স’ এর ওপর বিশেষায়িত প্রফেশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে, যেন পেশাজীবীরা নিজেদের রি-স্কিল বা নতুন দক্ষতায় বলীয়ান করতে পারেন।

সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা খাতসমূহ (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী):

                    ১. কাস্টমার সার্ভিস ও কল সেন্টার (৮০% অটোমেশন অবধারিত)

                    ২. ডেটা এন্ট্রি ও ক্ল্যারিকাল ব্যাক-অফিস (৯৫% স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি)

সরকারের অবস্থান:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. শফিকুর রহমান অবশ্য এখনই বড় ধরনের প্যানিক বা আতঙ্ক ছড়াতে নিষেধ করেছেন। তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে জানান:

"বাংলাদেশে এআই-এর কারণে ২৫-৩০% ছাঁটাইয়ের যে গুঞ্জন রয়েছে, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো নেই। আমাদের বাজার এখনো প্রাথমিক স্তরে। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সার ও যুবসমাজকে এই নতুন যুগের জন্য তৈরি করতে দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় সর্বাধুনিক ‘এআই অ্যান্ড অ্যাডভান্সড ফ্রিল্যান্সিং বুটক্যাম্প’ চালু করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।"

ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়েছিল বিশালাকার শরীরের জন্য নয়, বরং বদলে যাওয়া জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার জন্য। ফাহিম বা তার মতো হাজারো কোড-যোদ্ধাদের জন্য কেবল অভিজ্ঞতা আজ ঢাল হয়ে ক্যারিয়ারে সুরক্ষা আনতে পারছেনা । এই সময়টা অলস বসে থাকার সময় নয়; বরং নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। কারণ, আগামী দিনের পৃথিবী তাদেরই হবে, যারা এআই-এর হাত থেকে বাঁচতে লড়বে না, বরং এআই-কে নিজের গোলাম বানিয়ে মহাকালের রথে চড়বে।

মহাকালের দর্পণে প্রযুক্তি: কোডিংয়ের মৃত্যু ও ‘এজেন্টিক’ সভ্যতার উদয়
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


মহাকালের দর্পণে প্রযুক্তি: কোডিংয়ের মৃত্যু ও ‘এজেন্টিক’ সভ্যতার উদয়

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

মহাকালের চাকা যখন ঘোরে, তখন সে কেবল সময়কে পেছনে ফেলে না, বরং চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় মানুষের তৈরি বহু প্রাচীন ধারণাকে। আজ থেকে এক দশক আগেও যে তরুণটি কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ‘হ্যালো ওয়ার্ল্ড’ লিখে কোডিংয়ের দুনিয়ায় পা রেখে ভেবেছিল তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত, ২০২৬ সালের এই মে দ্বিপ্রহরে এসে সে দেখছে এক অদ্ভুত নীরবতা। সিলিকন ভ্যালির কাচঘেরা দালান থেকে শুরু করে ঢাকার কাওরান বাজারের সফটওয়্যার পাড়া—সবখানেই আজ এক অদৃশ্য ওলটপালট।

প্রযুক্তির এই মহাজাগতিক রূপান্তরকে বুঝতে আমাদের কোনো তাত্ত্বিক গবেষণাগারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা তাকাতে পারি ফাহিম মুনতাসিরের দিকে। চার বছর ধরে যিনি মধ্যম সারির ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। গত বছর বৈশ্বিক এক টেক-জায়ান্টের ‘রিমোট’ কর্মসংস্থানের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে দেশি চাকরিটি ছেড়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববাজারের ঝোড়ো হাওয়ায় সেই কোম্পানিটি রাতারাতি বিলুপ্ত হলে ফাহিম যখন আবার চেনা বাজারে ফিরলেন, তখন দেখলেন চারপাশটা কেমন যেন অচেনা, সংকুচিত এবং নির্মম।

বিগত চার মাস ধরে এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে কড়া নেড়ে ফাহিম বলছেন:

"বাজারের চেনা সমীকরণগুলো ওলটপালট হয়ে গেছে। কোডিং জানা মানুষের সংখ্যা যেখানে বাড়ছে, সেখানে কোডিংয়ের পদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমছে।"


ডেটা-গ্রাফ: ২০২৬-এর নির্মম পরিসংখ্যান

ফাহিমের এই ব্যক্তিগত সংকট আসলে এক বৈশ্বিক মহাপ্রবাহের ক্ষুদ্রতম অংশ। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক মহানির্দেশিকা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানকে গিলে খেতে পারে। কেউ কেউ একে অতি-আশঙ্কা বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের হার্ড-ডেটা কিন্তু অন্য কথা বলছে।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বৈশ্বিক ছাঁটাই: ৪৫,৩৬৩ জন 

এআই ও অটোমেশনের কারণে ছাঁটাই: ৯,২৩৮ জন (২০.৪%) যা,২০২৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ৮%]

একই সাথে বহুজাতিক গবেষণা সংস্থা ‘সিগন্যালফায়ার’ ও ‘লিংকডইন’ এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথাগত এন্ট্রি-লেভেল বা নতুনদের জন্য জুনিয়র পদের নিয়োগ এক ধাক্কায় ২৫% কমে গেছে। অথচ এর বিপরীতে ‘এআই স্পেশালিস্ট’ বা ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার’ এর বিজ্ঞাপনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, যা প্রায় ৩৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।


ঢাকা ডায়েরি: দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের নাভিশ্বাস

এই রূপান্তরের ঢেউ যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলেও আছড়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট করলেন এ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও টেকনোক্র্যাটরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান মেগাটেক সল্যুশনসের প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট ড. তানভীর এজাজ মনে করেন, এবারের পরিবর্তনটি পূর্বের যেকোনো টেক-বিপ্লবের চেয়ে আলাদা। তিনি বলেন:

"যাঁরা স্রেফ সিনট্যাক্স মুখস্থ করে কোড লিখতেন, তাঁদের দিন শেষ। নতুনদের মধ্যে যাঁদের সফটওয়্যার আর্কিটেকচার এবং সিস্টেম ডিজাইনের ওপর গভীর বুৎপত্তি নেই, এই এআই-প্রচলিত বাজারে তাঁদের টিকে থাকা অসম্ভব।"

বাস্তবতা এতটাই কঠিন যে, অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো কর্মী ইস্তফা দিলে সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন করে আর কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে না। ‘টাইগার কোড’ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জামানও স্বীকার করলেন এই সংকোচন নীতির কথা। তিনি জানান, বর্তমানে তাঁরা ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতিতে হাঁটছেন, যার ফলে অনেক টেকনিক্যাল পদ খালিই পড়ে আছে।


দক্ষতা বনাম উৎপাদনশীলতা: দুই সপ্তাহের কাজ দুই ঘণ্টায়

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যে এআই তরুণদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তা কিন্তু করপোরেট দুনিয়ায় উৎপাদনশীলতার এক অবিশ্বাস্য জোয়ার এনেছে। পূর্বে যে জটিল মডিউল বা অ্যালগরিদম তৈরি করতে একজন ডেভেলপারের অন্তত দুই সপ্তাহ বা ১৪ দিন সময় লাগত, বর্তমান ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI) টুল ব্যবহার করে একজন দক্ষ স্থপতি তা মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনছেন। অর্থাৎ, মানুষের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমলেও মেধার তীব্রতা বাড়ছে।

অবশ্য দেশের এই মন্দার পেছনে কেবল এআই-কে এককভাবে দোষ দিতে নারাজ শাহরিয়ার জামান। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সরকারের আমলের বেশ কিছু বড় বড় মেগা আইটি প্রজেক্ট বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের পর্যালোচনার টেবিলে আটকে আছে। নতুন কোনো প্রকল্পও শুরু হয়নি। রাষ্ট্রীয় চাকা সচল হলে বাজারে আবার গতি ফিরবে।


শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রের দর্শন: আতঙ্ক নয়, অভিযোজন

এই মহা-সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের প্রবীণ শিক্ষাবিদেরা অবশ্য আশার বাণী শোনাচ্ছেন। বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মাসুম বিল্লাহর মতে, চাকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে বাষ্পীয় ইঞ্জিন কিংবা ইন্টারনেট—প্রতিটি বড় প্রযুক্তিই মানুষের তৈরি পুরোনো কাজকে ধ্বংস করে নতুন কাজের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন:

"মৌলিক বা সাধারণ কোডিং হয়তো রোবট করবে, কিন্তু একটি সিস্টেমের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি, মানবিক মনস্তত্ত্ব বোঝা, এবং চূড়ান্ত উদ্ভাবনে মানুষের মস্তিষ্কই শেষ কথা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘লাইফ-লং লার্নিং’ বা আজীবন শেখার দর্শনে রূপান্তর করতে হবে।"

ইতিমধ্যেই তাঁর বিভাগ প্রথাগত সিলেবাস ভেঙে ‘এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স’ এর ওপর বিশেষায়িত প্রফেশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে, যেন পেশাজীবীরা নিজেদের রি-স্কিল বা নতুন দক্ষতায় বলীয়ান করতে পারেন।

সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা খাতসমূহ (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী):

                    ১. কাস্টমার সার্ভিস ও কল সেন্টার (৮০% অটোমেশন অবধারিত)

                    ২. ডেটা এন্ট্রি ও ক্ল্যারিকাল ব্যাক-অফিস (৯৫% স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি)

সরকারের অবস্থান:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. শফিকুর রহমান অবশ্য এখনই বড় ধরনের প্যানিক বা আতঙ্ক ছড়াতে নিষেধ করেছেন। তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে জানান:

"বাংলাদেশে এআই-এর কারণে ২৫-৩০% ছাঁটাইয়ের যে গুঞ্জন রয়েছে, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো নেই। আমাদের বাজার এখনো প্রাথমিক স্তরে। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সার ও যুবসমাজকে এই নতুন যুগের জন্য তৈরি করতে দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় সর্বাধুনিক ‘এআই অ্যান্ড অ্যাডভান্সড ফ্রিল্যান্সিং বুটক্যাম্প’ চালু করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।"

ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়েছিল বিশালাকার শরীরের জন্য নয়, বরং বদলে যাওয়া জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার জন্য। ফাহিম বা তার মতো হাজারো কোড-যোদ্ধাদের জন্য কেবল অভিজ্ঞতা আজ ঢাল হয়ে ক্যারিয়ারে সুরক্ষা আনতে পারছেনা । এই সময়টা অলস বসে থাকার সময় নয়; বরং নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। কারণ, আগামী দিনের পৃথিবী তাদেরই হবে, যারা এআই-এর হাত থেকে বাঁচতে লড়বে না, বরং এআই-কে নিজের গোলাম বানিয়ে মহাকালের রথে চড়বে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত