শিক্ষাঙ্গন
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশের বহু বিদ্যালয়ে এখনো চক-ডাস্টারের গণ্ডি পেরোতে পারেনি পাঠদান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড, ভার্চুয়াল লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভর পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছে।
সরকারি নানা পরিকল্পনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চকিত প্রচারণার পরও বাস্তবতা বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য, আর মাধ্যমিকেও তা আশানুরূপ নয়। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় বাধা অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয়ের সুপারিশ রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই ২ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। সর্বশেষ অর্থবছরেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশের মতো।
ইউনেসকোর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরেও শিক্ষা ব্যয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। অর্থাৎ, শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি।
অন্যদিকে, যে বাজেট বরাদ্দ করা হয় তার বড় অংশই ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে। নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে, স্কুলের পরিধি বাড়ছে; কিন্তু শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন বা প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণের দিকে প্রয়োজনীয় নজর দেওয়া হচ্ছে না। ফলে শ্রেণিকক্ষে আধুনিক শিক্ষাদানের পরিবেশ গড়ে উঠছে না।
সরকার ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পের কথা বললেও মফস্বলের বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। বহু শিক্ষক এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারে দক্ষ নন। অনেক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব অচল, ইন্টারনেট সুবিধাও সীমিত। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এখন শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট। অনেক শিক্ষক এখনো শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদানের প্রয়োজনীয় কৌশল আয়ত্ত করতে পারেননি। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যা শেখার পরিবেশকে আরও দুর্বল করছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। প্রাথমিক স্তরের বহু শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পাঠ্যবই পড়তে পারে না, এমনকি মৌলিক গণিতেও দুর্বলতা রয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের বাজারে।
বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক তরুণ। নিয়োগদাতারা এখন শুধু সনদ নয়, ব্যবহারিক দক্ষতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছেও দেশের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারছে না। ঝরে পড়ার এই প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে।
সম্প্রতি শিক্ষা খাত নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা ও সেমিনারেও উঠে এসেছে একই চিত্র। শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকেরা স্বীকার করেছেন—দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদারের আশ্বাস দিয়েছে।
গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হবে না। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
তবে শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন, এসব ঘোষণা বাস্তবায়নের গতি কতটা কার্যকর হবে। কারণ অতীতেও শিক্ষা সংস্কারের নানা পরিকল্পনা কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
অধ্যাপক আহসান হাবিব মনে করেন, শুধু প্রযুক্তি কিনলেই শিক্ষার পরিবর্তন হবে না; প্রয়োজন শিক্ষকদের মানসিক প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আমাদের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই শিক্ষা খাতে কার্যকর সংস্কার শুরু না হলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের তরুণেরা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই সময়ের দাবি—কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশের বহু বিদ্যালয়ে এখনো চক-ডাস্টারের গণ্ডি পেরোতে পারেনি পাঠদান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড, ভার্চুয়াল লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভর পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছে।
সরকারি নানা পরিকল্পনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চকিত প্রচারণার পরও বাস্তবতা বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য, আর মাধ্যমিকেও তা আশানুরূপ নয়। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় বাধা অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয়ের সুপারিশ রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই ২ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। সর্বশেষ অর্থবছরেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশের মতো।
ইউনেসকোর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরেও শিক্ষা ব্যয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। অর্থাৎ, শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি।
অন্যদিকে, যে বাজেট বরাদ্দ করা হয় তার বড় অংশই ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে। নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে, স্কুলের পরিধি বাড়ছে; কিন্তু শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন বা প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণের দিকে প্রয়োজনীয় নজর দেওয়া হচ্ছে না। ফলে শ্রেণিকক্ষে আধুনিক শিক্ষাদানের পরিবেশ গড়ে উঠছে না।
সরকার ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পের কথা বললেও মফস্বলের বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। বহু শিক্ষক এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারে দক্ষ নন। অনেক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব অচল, ইন্টারনেট সুবিধাও সীমিত। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এখন শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট। অনেক শিক্ষক এখনো শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদানের প্রয়োজনীয় কৌশল আয়ত্ত করতে পারেননি। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যা শেখার পরিবেশকে আরও দুর্বল করছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। প্রাথমিক স্তরের বহু শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পাঠ্যবই পড়তে পারে না, এমনকি মৌলিক গণিতেও দুর্বলতা রয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের বাজারে।
বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক তরুণ। নিয়োগদাতারা এখন শুধু সনদ নয়, ব্যবহারিক দক্ষতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছেও দেশের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারছে না। ঝরে পড়ার এই প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে।
সম্প্রতি শিক্ষা খাত নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা ও সেমিনারেও উঠে এসেছে একই চিত্র। শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকেরা স্বীকার করেছেন—দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদারের আশ্বাস দিয়েছে।
গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হবে না। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
তবে শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন, এসব ঘোষণা বাস্তবায়নের গতি কতটা কার্যকর হবে। কারণ অতীতেও শিক্ষা সংস্কারের নানা পরিকল্পনা কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
অধ্যাপক আহসান হাবিব মনে করেন, শুধু প্রযুক্তি কিনলেই শিক্ষার পরিবর্তন হবে না; প্রয়োজন শিক্ষকদের মানসিক প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আমাদের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই শিক্ষা খাতে কার্যকর সংস্কার শুরু না হলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের তরুণেরা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই সময়ের দাবি—কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
2.png)