আন্তর্জাতিক
ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্যের জেরে চীনা শোধনাগারগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বেইজিং। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের 'একতরফা আধিপত্য' মোকাবিলায় এই প্রথমবার নিজেদের তৈরি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার ব্যবহার করল চীন। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক অভাবনীয় ‘নিষেধাজ্ঞা আদেশ’ জারির মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজ দেশের পাঁচটি তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন কোনো বিধিবিধান তারা মেনে নেবে না।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর চীনের পাঁচটি বৃহৎ স্বতন্ত্র তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের দাবি ছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলো তেহরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে ইরানের সামরিক তহবিল সমৃদ্ধ করছে। তবে বেইজিং এই পদক্ষেপকে 'অযৌক্তিক' এবং 'আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী' হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
শনিবার এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, 'হেংলি পেট্রোকেমিক্যালসহ' অভিযুক্ত শোধনাগারগুলোর ওপর মার্কিন আইনি প্রভাব কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, জাতিসংঘের অনুমোদনহীন যেকোনো একতরফা অবরোধের ঘোর বিরোধী চীন।
২০২১ সালে প্রণীত চীনের এই বিশেষ আইনটি মূলত বেইজিংয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। এই আইনের আওতায়:
কোনো বিদেশি নিষেধাজ্ঞা চীনা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করলে তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারকে অবহিত করতে হয়।
তদন্তে ‘অযৌক্তিকতা’ প্রমাণিত হলে সরকার পাল্টা আদেশ জারি করে ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার আইনি সুরক্ষা দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো প্রয়োজনে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতেও দ্বারস্থ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া মার্কিন চাপের মুখে বেইজিং যে কতটা কোণঠাসা বোধ করছিল, এই আইনটি তারই এক সুসংগঠিত জবাব। নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিচ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ নায়মেহ মাসুমি বলছেন, চীন এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মার্কিন প্রভাবকে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে আইনি পথে হাঁটছে।
বেইজিংয়ের এই কঠোর অবস্থানের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে লিপ্ত কোম্পানিগুলো এক কঠিন গোলকধাঁধায় পড়তে যাচ্ছে। যারা মার্কিন ডলার বা মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ওয়াশিংটনের কথা অমান্য করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যাদের মূল ব্যবসা চীনকেন্দ্রিক, তাদের জন্য বেইজিংয়ের সুরক্ষা কবচ গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক ডমিনিক চিউ মনে করেন, বেইজিং এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক। ফলে সামনের দিনগুলোতে কোম্পানিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি ওয়াশিংটনের নিয়ম মেনে চীনের বিরাগভাজন হবে, নাকি বেইজিংয়ের পক্ষ নিয়ে মার্কিন ব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে।
চীনের এই সাহসী পদক্ষেপ কেবল তাদের নিজস্ব সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো প্রচার করছে যে, মার্কিন খবরদারি মোকাবিলায় অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোও ভবিষ্যতে চীনের এই ‘অ্যান্টি-স্যাংশন’ মডেল অনুসরণ করে নিজস্ব ঢাল তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, ইরানের বৃহত্তম তেল ক্রেতা হিসেবে চীনের এই অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে আইনই হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র।
বিষয় : ‘অ্যান্টি-স্যাংশন’

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্যের জেরে চীনা শোধনাগারগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বেইজিং। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের 'একতরফা আধিপত্য' মোকাবিলায় এই প্রথমবার নিজেদের তৈরি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার ব্যবহার করল চীন। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক অভাবনীয় ‘নিষেধাজ্ঞা আদেশ’ জারির মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজ দেশের পাঁচটি তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন কোনো বিধিবিধান তারা মেনে নেবে না।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর চীনের পাঁচটি বৃহৎ স্বতন্ত্র তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের দাবি ছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলো তেহরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে ইরানের সামরিক তহবিল সমৃদ্ধ করছে। তবে বেইজিং এই পদক্ষেপকে 'অযৌক্তিক' এবং 'আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী' হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
শনিবার এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, 'হেংলি পেট্রোকেমিক্যালসহ' অভিযুক্ত শোধনাগারগুলোর ওপর মার্কিন আইনি প্রভাব কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, জাতিসংঘের অনুমোদনহীন যেকোনো একতরফা অবরোধের ঘোর বিরোধী চীন।
২০২১ সালে প্রণীত চীনের এই বিশেষ আইনটি মূলত বেইজিংয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। এই আইনের আওতায়:
কোনো বিদেশি নিষেধাজ্ঞা চীনা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করলে তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারকে অবহিত করতে হয়।
তদন্তে ‘অযৌক্তিকতা’ প্রমাণিত হলে সরকার পাল্টা আদেশ জারি করে ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার আইনি সুরক্ষা দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো প্রয়োজনে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতেও দ্বারস্থ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া মার্কিন চাপের মুখে বেইজিং যে কতটা কোণঠাসা বোধ করছিল, এই আইনটি তারই এক সুসংগঠিত জবাব। নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিচ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ নায়মেহ মাসুমি বলছেন, চীন এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মার্কিন প্রভাবকে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে আইনি পথে হাঁটছে।
বেইজিংয়ের এই কঠোর অবস্থানের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে লিপ্ত কোম্পানিগুলো এক কঠিন গোলকধাঁধায় পড়তে যাচ্ছে। যারা মার্কিন ডলার বা মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ওয়াশিংটনের কথা অমান্য করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যাদের মূল ব্যবসা চীনকেন্দ্রিক, তাদের জন্য বেইজিংয়ের সুরক্ষা কবচ গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক ডমিনিক চিউ মনে করেন, বেইজিং এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক। ফলে সামনের দিনগুলোতে কোম্পানিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি ওয়াশিংটনের নিয়ম মেনে চীনের বিরাগভাজন হবে, নাকি বেইজিংয়ের পক্ষ নিয়ে মার্কিন ব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে।
চীনের এই সাহসী পদক্ষেপ কেবল তাদের নিজস্ব সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো প্রচার করছে যে, মার্কিন খবরদারি মোকাবিলায় অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোও ভবিষ্যতে চীনের এই ‘অ্যান্টি-স্যাংশন’ মডেল অনুসরণ করে নিজস্ব ঢাল তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, ইরানের বৃহত্তম তেল ক্রেতা হিসেবে চীনের এই অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে আইনই হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র।
