যাত্রী নিরাপত্তা ও চলাচলের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্টেশন ও ট্রেনের ভেতর পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের শুটিং বা লাইভ স্ট্রিমিং নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া দেওয়া মেট্রোরেল এখন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং অনেকের কাছেই এটি বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে এই ট্রেন ও স্টেশন চত্বরে খামখেয়ালিভাবে ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ‘কনটেন্ট’ তৈরি করার প্রবণতা এবার নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মেট্রোরেল এলাকায় যেকোনো ধরনের অপেশাদার ভিডিও ও ফটোগ্রাফিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ডিএমটিসিএলের পরিচালক (প্রশাসন) এ. কে. এম. খায়রুল আলম স্বাক্ষরিত এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে যেমন সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়মিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে ডিএমটিসিএল
ডিএমটিসিএলের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে,
মেট্রোরেল স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, কনকোর্স হল, এমনকি ট্রেনের ভেতরেও পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ধরনের ভিডিও ধারণ করা যাবে না। প্রবেশ ও বহির্গমন পথেও এই নিয়ম কার্যকর থাকবে।
বিশেষ করে যারা ইউটিউব বা ফেসবুকের জন্য শর্ট ভিডিও (রিলস), লাইভ স্ট্রিমিং কিংবা ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ক্যামেরা নিয়ে শুটিং করেন, তাদের জন্য এই নির্দেশনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, কেউ যদি এই নিয়ম অমান্য করে কিংবা অনুমতি ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদারকি করার জন্য স্টেশনে দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীদেরও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যাত্রী সাধারণের স্বস্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
কেন হঠাৎ এই ধরনের কড়াকড়ি? এই প্রশ্নের উত্তরে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের দাবি—যাত্রী সাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। অনেক সময় দেখা যায়, ট্রেনের ভেতরে বা স্টেশনে ভিডিও করার সময় সাধারণ যাত্রীদের গোপনীয়তা বিঘ্নিত হয়। কখনো কখনো ট্রাইপড বা বড় ক্যামেরা নিয়ে শুটিং করার ফলে চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী হাসান আহমেদ বলেন, "মাঝে মাঝে দেখা যায় ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন ফোন উঁচিয়ে লাইভ করছেন বা নাচানাচি করছেন। এতে অন্য যাত্রীরা অস্বস্তিতে পড়েন। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের জন্য বিষয়টি বিব্রতকর হতে পারে। এই সিদ্ধান্তটি আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।"
অন্যদিকে, নিরাপত্তাকর্মীদের মতে, মেট্রোরেল একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। এখানে অবাধে ভিডিও ধারণ করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর তৈরি হতে পারে। তাই নিয়ম মেনে চলাই সবার জন্য মঙ্গল।
বাণিজ্যিক কনটেন্ট ও নীতিমালা
ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, তারা সৃজনশীল কাজ বা বাণিজ্যিক শুটিংয়ের বিরোধী নয়; বরং সেটি হতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে। যদি কেউ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মেট্রোরেল এলাকায় শুটিং বা ফটোগ্রাফি করতে চান, তবে তাকে ‘বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া/ইজারা নীতিমালা ২০২৩’ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে অনুমতি সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা গণপরিবহনে ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের নীতিমালা প্রয়োগ করা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও পেশাদার ও নিরাপদ করে তুলবে। তবে ব্যক্তিগত স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাধারণ ছবি তোলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কতটা নমনীয় হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আপাতত, রাজধানীর এই স্বপ্নের বাহনে চড়ে স্মার্টফোনে ভিডিও শুরু করার আগে অনুমতি আছে কি না, তা একবার ভেবে দেখাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
যাত্রী নিরাপত্তা ও চলাচলের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্টেশন ও ট্রেনের ভেতর পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের শুটিং বা লাইভ স্ট্রিমিং নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া দেওয়া মেট্রোরেল এখন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং অনেকের কাছেই এটি বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে এই ট্রেন ও স্টেশন চত্বরে খামখেয়ালিভাবে ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ‘কনটেন্ট’ তৈরি করার প্রবণতা এবার নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মেট্রোরেল এলাকায় যেকোনো ধরনের অপেশাদার ভিডিও ও ফটোগ্রাফিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ডিএমটিসিএলের পরিচালক (প্রশাসন) এ. কে. এম. খায়রুল আলম স্বাক্ষরিত এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে যেমন সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়মিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে ডিএমটিসিএল
ডিএমটিসিএলের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে,
মেট্রোরেল স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, কনকোর্স হল, এমনকি ট্রেনের ভেতরেও পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ধরনের ভিডিও ধারণ করা যাবে না। প্রবেশ ও বহির্গমন পথেও এই নিয়ম কার্যকর থাকবে।
বিশেষ করে যারা ইউটিউব বা ফেসবুকের জন্য শর্ট ভিডিও (রিলস), লাইভ স্ট্রিমিং কিংবা ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ক্যামেরা নিয়ে শুটিং করেন, তাদের জন্য এই নির্দেশনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, কেউ যদি এই নিয়ম অমান্য করে কিংবা অনুমতি ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদারকি করার জন্য স্টেশনে দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীদেরও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যাত্রী সাধারণের স্বস্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
কেন হঠাৎ এই ধরনের কড়াকড়ি? এই প্রশ্নের উত্তরে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের দাবি—যাত্রী সাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। অনেক সময় দেখা যায়, ট্রেনের ভেতরে বা স্টেশনে ভিডিও করার সময় সাধারণ যাত্রীদের গোপনীয়তা বিঘ্নিত হয়। কখনো কখনো ট্রাইপড বা বড় ক্যামেরা নিয়ে শুটিং করার ফলে চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী হাসান আহমেদ বলেন, "মাঝে মাঝে দেখা যায় ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন ফোন উঁচিয়ে লাইভ করছেন বা নাচানাচি করছেন। এতে অন্য যাত্রীরা অস্বস্তিতে পড়েন। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের জন্য বিষয়টি বিব্রতকর হতে পারে। এই সিদ্ধান্তটি আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।"
অন্যদিকে, নিরাপত্তাকর্মীদের মতে, মেট্রোরেল একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। এখানে অবাধে ভিডিও ধারণ করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর তৈরি হতে পারে। তাই নিয়ম মেনে চলাই সবার জন্য মঙ্গল।
বাণিজ্যিক কনটেন্ট ও নীতিমালা
ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, তারা সৃজনশীল কাজ বা বাণিজ্যিক শুটিংয়ের বিরোধী নয়; বরং সেটি হতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে। যদি কেউ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মেট্রোরেল এলাকায় শুটিং বা ফটোগ্রাফি করতে চান, তবে তাকে ‘বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া/ইজারা নীতিমালা ২০২৩’ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে অনুমতি সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা গণপরিবহনে ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের নীতিমালা প্রয়োগ করা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও পেশাদার ও নিরাপদ করে তুলবে। তবে ব্যক্তিগত স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাধারণ ছবি তোলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কতটা নমনীয় হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আপাতত, রাজধানীর এই স্বপ্নের বাহনে চড়ে স্মার্টফোনে ভিডিও শুরু করার আগে অনুমতি আছে কি না, তা একবার ভেবে দেখাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
