জাতীয়
তিতাস, বাখরাবাদ ও শ্রীকাইলসহ ৪টি কূপে বিশাল মজুতের সম্ভাবনা; জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ স্থবিরতা ভাঙার সাহসী উদ্যোগ
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রথমবারের মতো ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৬ কিলোমিটার (৬ হাজার মিটার) গভীরে গিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান শুরু করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। মাটির এত গভীরে খনন বা ‘ডিপ ড্রিলিং’ বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম।
পেট্রোবাংলা সূত্র নিশ্চিত করেছে, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস আহরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, কুমিল্লার বাখরাবাদ ও শ্রীকাইল এবং পাবনার সাঁথিয়ার মোবারকপুরে বিশেষ এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সাধারণত বাংলাদেশে ২ হাজার ৬০০ মিটার থেকে ৪ হাজার মিটার গভীরতার মধ্যে কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। তবে এবার সেই প্রথাগত সীমা ভেঙে আরও গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের সাম্প্রতিক ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূ-তাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান গ্যাস স্তরের নিচে থাকা কঠিন শিলার স্তরের গভীরেও বিশাল গ্যাসের আধার থাকতে পারে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীকাইলে ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) এবং তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ বিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই গভীর স্তরে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত থাকতে পারে বলে আশাবাদী প্রকৌশলীরা।
প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (বিজিএফসিএল) অধীনে তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ এবং বাপেক্সের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শ্রীকাইল ও মোবারকপুর কূপে এই খনন কাজ চলবে। এর মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদে ৫ হাজার ৬০平 মিটার পর্যন্ত খননের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
ভূপৃষ্ঠের এত গভীরে খনন কাজ কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেনের মতে, “ডিপ ড্রিলিং সবসময় সফল হয় না। ভারতের কৃষ্ণা গোদাবেড়ি বেসিন বা আজারবাইজানে রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রম ৬-৭ হাজার মিটার গভীরে গিয়েও আশানুরূপ ফল পায়নি। উচ্চচাপ ও কঠিন শিলাস্তর ভেদ করে গ্যাস বের করে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
তবে পেট্রোবাংলার বর্তমান নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, ঝুঁকি থাকলেও এই চেষ্টা অপরিহার্য। গত এক দশকে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে এক ধরনের রহস্যময় স্থবিরতা ছিল। যেখানে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যে ক্ষুদ্র পরিসরে ১৬০টি কূপ খনন করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ১১৩ বছরে কূপ খনন হয়েছে মাত্র ৯৮টি। এই দীর্ঘ অনীহার ফলে দেশ ক্রমশ উচ্চমূল্যের আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ বছরে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে আমদানিতেই সরকারের আগ্রহ বেশি ছিল। তথ্যমতে, বিগত সরকারের সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক এই উদ্যোগকে একটি ‘সাহসী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “বাপেক্সের জরিপে আমরা নিশ্চিত হয়েই এত গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের গ্যাস সংকট মেটাতে আমাদের দেশীয় উৎস অনুসন্ধানে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
তিনি আরও জানান, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মোট ১৫০টি নতুন কূপ খনন ও সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৫টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার গৃহীত নতুন কর্মপরিকল্পনা সফল হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া স্থল ও সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ‘অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মাটির ৬ কিলোমিটার গভীরে খননযন্ত্রের প্রতিটি ইঞ্চি অগ্রযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ। যদি এই ‘ডিপ ড্রিলিং’ সফল হয়, তবে তা কেবল গ্যাসের উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং বিদেশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করবে।
একনজরে প্রকল্পের মানচিত্র:
কূপের সংখ্যা: ৪টি (তিতাস-৩১, বাখরাবাদ-১১, শ্রীকাইল ও মোবারকপুর)।
সর্বোচ্চ গভীরতা: ৫,৬০০ থেকে ৬,০০০ মিটার।
সম্ভাব্য মজুত: প্রায় ২.৫ টিসিএফ।
লক্ষ্য: দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমানো।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
তিতাস, বাখরাবাদ ও শ্রীকাইলসহ ৪টি কূপে বিশাল মজুতের সম্ভাবনা; জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ স্থবিরতা ভাঙার সাহসী উদ্যোগ
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রথমবারের মতো ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৬ কিলোমিটার (৬ হাজার মিটার) গভীরে গিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান শুরু করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। মাটির এত গভীরে খনন বা ‘ডিপ ড্রিলিং’ বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম।
পেট্রোবাংলা সূত্র নিশ্চিত করেছে, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস আহরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, কুমিল্লার বাখরাবাদ ও শ্রীকাইল এবং পাবনার সাঁথিয়ার মোবারকপুরে বিশেষ এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সাধারণত বাংলাদেশে ২ হাজার ৬০০ মিটার থেকে ৪ হাজার মিটার গভীরতার মধ্যে কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। তবে এবার সেই প্রথাগত সীমা ভেঙে আরও গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের সাম্প্রতিক ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূ-তাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান গ্যাস স্তরের নিচে থাকা কঠিন শিলার স্তরের গভীরেও বিশাল গ্যাসের আধার থাকতে পারে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীকাইলে ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) এবং তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ বিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই গভীর স্তরে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত থাকতে পারে বলে আশাবাদী প্রকৌশলীরা।
প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (বিজিএফসিএল) অধীনে তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ এবং বাপেক্সের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শ্রীকাইল ও মোবারকপুর কূপে এই খনন কাজ চলবে। এর মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদে ৫ হাজার ৬০平 মিটার পর্যন্ত খননের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
ভূপৃষ্ঠের এত গভীরে খনন কাজ কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেনের মতে, “ডিপ ড্রিলিং সবসময় সফল হয় না। ভারতের কৃষ্ণা গোদাবেড়ি বেসিন বা আজারবাইজানে রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রম ৬-৭ হাজার মিটার গভীরে গিয়েও আশানুরূপ ফল পায়নি। উচ্চচাপ ও কঠিন শিলাস্তর ভেদ করে গ্যাস বের করে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
তবে পেট্রোবাংলার বর্তমান নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, ঝুঁকি থাকলেও এই চেষ্টা অপরিহার্য। গত এক দশকে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে এক ধরনের রহস্যময় স্থবিরতা ছিল। যেখানে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যে ক্ষুদ্র পরিসরে ১৬০টি কূপ খনন করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ১১৩ বছরে কূপ খনন হয়েছে মাত্র ৯৮টি। এই দীর্ঘ অনীহার ফলে দেশ ক্রমশ উচ্চমূল্যের আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ বছরে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে আমদানিতেই সরকারের আগ্রহ বেশি ছিল। তথ্যমতে, বিগত সরকারের সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক এই উদ্যোগকে একটি ‘সাহসী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “বাপেক্সের জরিপে আমরা নিশ্চিত হয়েই এত গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের গ্যাস সংকট মেটাতে আমাদের দেশীয় উৎস অনুসন্ধানে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
তিনি আরও জানান, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মোট ১৫০টি নতুন কূপ খনন ও সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৫টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার গৃহীত নতুন কর্মপরিকল্পনা সফল হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া স্থল ও সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ‘অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মাটির ৬ কিলোমিটার গভীরে খননযন্ত্রের প্রতিটি ইঞ্চি অগ্রযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ। যদি এই ‘ডিপ ড্রিলিং’ সফল হয়, তবে তা কেবল গ্যাসের উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং বিদেশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করবে।
একনজরে প্রকল্পের মানচিত্র:
কূপের সংখ্যা: ৪টি (তিতাস-৩১, বাখরাবাদ-১১, শ্রীকাইল ও মোবারকপুর)।
সর্বোচ্চ গভীরতা: ৫,৬০০ থেকে ৬,০০০ মিটার।
সম্ভাব্য মজুত: প্রায় ২.৫ টিসিএফ।
লক্ষ্য: দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমানো।
