সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

ইউক্রেন ও ইরান সংকট: রাশিয়ার ‘কৌশলগত জোটের’ অগ্নিপরীক্ষা

ঐতিহাসিক তিক্ততা আর স্বার্থের গাঁটছড়া পেরিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে এখন নড়বড়ে রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মস্কোর বর্তমান নীরবতা ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ।

ইউক্রেন ও ইরান সংকট: রাশিয়ার ‘কৌশলগত জোটের’ অগ্নিপরীক্ষা
ছবি -সংগৃহীত

রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান সম্পর্ককে অনেকেই পোক্ত ‘কৌশলগত জোট’ মনে করলেও, ভূ-রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণে এটি মূলত একটি সাময়িক বোঝাপড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে মস্কো ও তেহরানের এই অংশীদারত্ব এখন এক বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এটি আস্থা বা বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি ছিল পরিস্থিতির প্রয়োজন। আজ থেকে প্রায় ১৯৭ বছর আগে তেহরানে রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দর গ্রিবোয়েদভ নিহত হওয়ার যে করুণ ইতিহাস, তা দীর্ঘদিন দুই দেশের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছিল। এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান তখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে রাশিয়া ইরানকে কাছে টেনে নেয়। জাতিসংঘে ইরানের পক্ষে ভেটো দেওয়া থেকে শুরু করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কিংবা বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বাণিজ্য—সবই ছিল পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ব্রিকস প্লাস জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তি কিংবা সিরিয়ার যুদ্ধে আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে দুই দেশের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সমীকরণ নতুন রূপ নেয়। তেহরান থেকে মস্কোর কাছে ড্রোন ও গোলাবারুদ যাওয়ার পর পশ্চিমা দুনিয়া নতুন করে সোচ্চার হয়। বিনিময়ে রাশিয়াও তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে ইরানকে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছে।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও এখন স্পষ্ট হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটন যদি কোনো বড় সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে ক্রেমলিন যে নির্দ্বিধায় তেহরানের সাথে সম্পর্ক ত্যাগের ঝুঁকি নিতে পারে—এমন গুঞ্জন এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ জোরদার। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক রুশ কূটনীতিকদের মতে, ইউক্রেন নিয়ে পুতিনের যে বড় লক্ষ্য, তার কাছে তেহরানের সাথে এই কৌশলগত সম্পর্ককে কেবল একটি দরকষাকষির সরঞ্জাম হিসেবেই দেখা হয়। ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে অনাগ্রহ এবং সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় মস্কোর পরিবর্তে ইসলামাবাদের উত্থান—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার যে নৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে, তা তাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অকার্যকর করে তুলেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে স্যাটেলাইট তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবেই রাশিয়া হয়তো ইরানকে দেওয়া সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা সংকুচিত করতে পারে। বাস্তবতার এই কঠিন সমীকরণে মস্কো ও তেহরান এখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, ক্ষমতার এই খেলায় ‘স্থায়ী বন্ধু’ নয়, বরং ‘স্বার্থই’ যে শেষ কথা—তা আরও একবার প্রমাণ করছে বৈশ্বিক অস্থিরতা।

বিষয় : রাশিয়া ইরান ইউক্রেন যুদ্ধ

ইউক্রেন ও ইরান সংকট: রাশিয়ার ‘কৌশলগত জোটের’ অগ্নিপরীক্ষা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


ইউক্রেন ও ইরান সংকট: রাশিয়ার ‘কৌশলগত জোটের’ অগ্নিপরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান সম্পর্ককে অনেকেই পোক্ত ‘কৌশলগত জোট’ মনে করলেও, ভূ-রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণে এটি মূলত একটি সাময়িক বোঝাপড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে মস্কো ও তেহরানের এই অংশীদারত্ব এখন এক বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এটি আস্থা বা বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি ছিল পরিস্থিতির প্রয়োজন। আজ থেকে প্রায় ১৯৭ বছর আগে তেহরানে রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দর গ্রিবোয়েদভ নিহত হওয়ার যে করুণ ইতিহাস, তা দীর্ঘদিন দুই দেশের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছিল। এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান তখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে রাশিয়া ইরানকে কাছে টেনে নেয়। জাতিসংঘে ইরানের পক্ষে ভেটো দেওয়া থেকে শুরু করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কিংবা বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বাণিজ্য—সবই ছিল পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ব্রিকস প্লাস জোটে ইরানের অন্তর্ভুক্তি কিংবা সিরিয়ার যুদ্ধে আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে দুই দেশের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সমীকরণ নতুন রূপ নেয়। তেহরান থেকে মস্কোর কাছে ড্রোন ও গোলাবারুদ যাওয়ার পর পশ্চিমা দুনিয়া নতুন করে সোচ্চার হয়। বিনিময়ে রাশিয়াও তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে ইরানকে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছে।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও এখন স্পষ্ট হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটন যদি কোনো বড় সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে ক্রেমলিন যে নির্দ্বিধায় তেহরানের সাথে সম্পর্ক ত্যাগের ঝুঁকি নিতে পারে—এমন গুঞ্জন এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ জোরদার। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক রুশ কূটনীতিকদের মতে, ইউক্রেন নিয়ে পুতিনের যে বড় লক্ষ্য, তার কাছে তেহরানের সাথে এই কৌশলগত সম্পর্ককে কেবল একটি দরকষাকষির সরঞ্জাম হিসেবেই দেখা হয়। ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে অনাগ্রহ এবং সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় মস্কোর পরিবর্তে ইসলামাবাদের উত্থান—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার যে নৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে, তা তাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অকার্যকর করে তুলেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে স্যাটেলাইট তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবেই রাশিয়া হয়তো ইরানকে দেওয়া সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা সংকুচিত করতে পারে। বাস্তবতার এই কঠিন সমীকরণে মস্কো ও তেহরান এখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, ক্ষমতার এই খেলায় ‘স্থায়ী বন্ধু’ নয়, বরং ‘স্বার্থই’ যে শেষ কথা—তা আরও একবার প্রমাণ করছে বৈশ্বিক অস্থিরতা।




কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত