সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

এক বেডে পাঁচ শিশু: ঢামেক শিশু ওয়ার্ডে চরম অব্যবস্থাপনা

ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি রোগী হওয়ায় ভেঙে পড়েছে চিকিৎসা সেবা; অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জনবল সংকটে দিশেহারা শিশু ও অভিভাবকরা।

এক বেডে পাঁচ শিশু: ঢামেক শিশু ওয়ার্ডে চরম অব্যবস্থাপনা
ছবি -সংগৃহীত

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে তাকালে যেন এক দমবন্ধকর পরিস্থিতির দেখা মেলে। হাসপাতালের ২০৭, ২০৮ ও ২১০ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্রটা এখন রীতিমতো উদ্বেগজনক। জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন অভিভাবকরা, কিন্তু ওয়ার্ডে প্রবেশের পর তাদের সেই আশা পরিণত হয় চরম দুর্ভোগে। ১৪টি বেডের বিপরীতে ৮২ জন রোগী, কিংবা ২০টি বেডের বিপরীতে ৬৪ জন—এ যেন কোনো হাসপাতাল নয়, বরং ঠাসাঠাসি করে গাদাগাদি করে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই।

হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ এতটাই নাজুক যে, সুস্থ শিশুও যেন অসুস্থ হয়ে পড়ে। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুম পারভেজের মতো অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত গরম আর ভিড়ের কারণে শিশুদের কষ্ট দেখার মতো নয়। এর ওপর রাতের বেলায় নার্সদের সেবার অভাব, আয়া ও কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার এবং নোংরা টয়লেট ব্যবহারের অক্ষমতায় তারা এক প্রকার অসহায়। ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদেরও জায়গা হচ্ছে এই সাধারণ শিশু ওয়ার্ডেই, যেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামায় পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে অসহ্য, এক বেডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা যেন তাদের যন্ত্রণার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

হাসপাতালের কর্মীরাও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নার্স জানালেন, এই অমানুষিক চাপের মধ্যে তাদের পক্ষে মানসম্মত সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। একদিকে ৮০ জন রোগীর ওষুধের ডোজ মেইনটেইন করা, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ দাপ্তরিক কাজ—সব মিলিয়ে নার্সদের কাজের পরিধি এখন শারীরিক সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এই বিশৃঙ্খলার পেছনে রোগীদের সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত স্বজনদের চাপকেও দায়ী করছেন তারা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, সমস্যার মূলে রয়েছে রোগীদের মাত্রাতিরিক্ত চাপ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রোগী ভাগাভাগি করার পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের তুলনায় নার্স ও কর্মচারীর সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় সেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হামের প্রকোপসহ নানা কারণে শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখার ফলে হাসপাতালের ভেতরই নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে শিশুদের জন্য আলাদা বেড সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য বলছেন, এই পুরনো সমস্যার সমাধানে তারা নতুন ৩২ তলা ভবন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। আগামী অর্থবছরে এ সংক্রান্ত কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে সেই নতুন ভবনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত, এই গাদাগাদির পরিবেশে শিশু ও তাদের স্বজনদের যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তার দায় কে নেবে—সেই প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

বিষয় : ঢামেক শিশু ওয়ার্ড

এক বেডে পাঁচ শিশু: ঢামেক শিশু ওয়ার্ডে চরম অব্যবস্থাপনা
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


এক বেডে পাঁচ শিশু: ঢামেক শিশু ওয়ার্ডে চরম অব্যবস্থাপনা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে তাকালে যেন এক দমবন্ধকর পরিস্থিতির দেখা মেলে। হাসপাতালের ২০৭, ২০৮ ও ২১০ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্রটা এখন রীতিমতো উদ্বেগজনক। জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন অভিভাবকরা, কিন্তু ওয়ার্ডে প্রবেশের পর তাদের সেই আশা পরিণত হয় চরম দুর্ভোগে। ১৪টি বেডের বিপরীতে ৮২ জন রোগী, কিংবা ২০টি বেডের বিপরীতে ৬৪ জন—এ যেন কোনো হাসপাতাল নয়, বরং ঠাসাঠাসি করে গাদাগাদি করে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই।

হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ এতটাই নাজুক যে, সুস্থ শিশুও যেন অসুস্থ হয়ে পড়ে। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুম পারভেজের মতো অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত গরম আর ভিড়ের কারণে শিশুদের কষ্ট দেখার মতো নয়। এর ওপর রাতের বেলায় নার্সদের সেবার অভাব, আয়া ও কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার এবং নোংরা টয়লেট ব্যবহারের অক্ষমতায় তারা এক প্রকার অসহায়। ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদেরও জায়গা হচ্ছে এই সাধারণ শিশু ওয়ার্ডেই, যেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামায় পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে অসহ্য, এক বেডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা যেন তাদের যন্ত্রণার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

হাসপাতালের কর্মীরাও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নার্স জানালেন, এই অমানুষিক চাপের মধ্যে তাদের পক্ষে মানসম্মত সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। একদিকে ৮০ জন রোগীর ওষুধের ডোজ মেইনটেইন করা, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ দাপ্তরিক কাজ—সব মিলিয়ে নার্সদের কাজের পরিধি এখন শারীরিক সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এই বিশৃঙ্খলার পেছনে রোগীদের সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত স্বজনদের চাপকেও দায়ী করছেন তারা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, সমস্যার মূলে রয়েছে রোগীদের মাত্রাতিরিক্ত চাপ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রোগী ভাগাভাগি করার পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের তুলনায় নার্স ও কর্মচারীর সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় সেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হামের প্রকোপসহ নানা কারণে শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখার ফলে হাসপাতালের ভেতরই নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে শিশুদের জন্য আলাদা বেড সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য বলছেন, এই পুরনো সমস্যার সমাধানে তারা নতুন ৩২ তলা ভবন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। আগামী অর্থবছরে এ সংক্রান্ত কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে সেই নতুন ভবনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত, এই গাদাগাদির পরিবেশে শিশু ও তাদের স্বজনদের যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তার দায় কে নেবে—সেই প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত