সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

মাইক্রোসফটের ইসরায়েল শাখার প্রধান ইসরায়েলকে সাহায্য করেছিলেন ফিলিস্থিনিদের টার্গেট করতে

অ্যালোন হাইমোভিচ

 মাইক্রোসফটের ইসরায়েল শাখার প্রধান  ইসরায়েলকে সাহায্য করেছিলেন ফিলিস্থিনিদের টার্গেট করতে
ছবি -সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে যখন তীব্র বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এসেছেমাইক্রোসফট-এর ইসরায়েল শাখা। প্রতিষ্ঠানটির ইসরায়েল অফিসের প্রধান অ্যালোন হাইমোভিচ-কে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে—এমন খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। যদিও মাইক্রোসফট আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এটিকে “স্টেপিং ডাউন” বা স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো বলে উল্লেখ করেছে, বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কোম্পানিটির প্রযুক্তিগত সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক ঘিরে নৈতিক ও আইনি বিতর্ক। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরই এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে। তদন্তে মূলত খতিয়ে দেখা হয়, ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট—বিশেষ করে বহুল আলোচিত “ইউনিট ৮২০০”—কীভাবে মাইক্রোসফটের Azure ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করছিল। অভিযোগ উঠেছে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ ফোনকল ও নজরদারির তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে।  

এই বিতর্কের সূত্রপাত আরও আগে। ২০২৫ সালে দ্য গার্ডিয়ান এবং লোকাল কল -এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা ইউনিটগুলো মাইক্রোসফটের Azure ক্লাউড ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ নজরদারি তথ্য সংরক্ষণ করছিল। বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ নজরদারির অভিযোগ সামনে আসে। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—একটি বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির অবকাঠামো কি যুদ্ধ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? 

মাইক্রোসফটের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। কোম্পানিটির বহু কর্মী “No Azure for Apartheid” স্লোগানে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি এমনভাবে ব্যবহার হচ্ছে যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পরবর্তীতে কোম্পানিটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে এবং কিছু সামরিক ইউনিটের সঙ্গে Azure সেবাও বন্ধ করে দেয়। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে মাইক্রোসফটের গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল “স্বচ্ছতার অভাব”। অভিযোগ ওঠে, ইসরায়েল শাখা কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি জানায়নি যে কীভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক ইউনিটগুলো Azure ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ইউরোপভিত্তিক সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণের কারণে ইউরোপীয় গোপনীয়তা আইন ও ডেটা সুরক্ষা নীতিমালা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এরপরই অ্যালোন হাইমোভিচের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেননি, বরং Azure অবকাঠামো ব্যবহারের কিছু দিক গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের কাছে যথেষ্ট স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

তবে মাইক্রোসফট আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সরাসরি “বরখাস্ত” শব্দটি ব্যবহার করেনি। কোম্পানির সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অ্যালোন হাইমোভিচ নতুন পেশাগত যাত্রায় যাচ্ছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে মাইক্রোসফট ইসরায়েল উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাস্তবে একটি “ফোর্সড এক্সিট” বা চাপের মুখে পদত্যাগ। কারণ তাঁর বিদায়ের পর মাইক্রোসফট ইসরায়েলকে সরাসরি Microsoft France-এর অধীনে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ করপোরেট রদবদলের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। 

এই ঘটনার আরেকটি বড় দিক হলো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর “নৈতিক দায়বদ্ধতা” নিয়ে নতুন বিতর্ক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু মাইক্রোসফট নয়, Google এবং Amazon-এর বিরুদ্ধেও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্লাউড ও এআই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে “Project Nimbus” নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও প্রযুক্তিকর্মীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালোন হাইমোভিচের বিদায় শুধু একজন করপোরেট কর্মকর্তার পদত্যাগ নয়; এটি আসলে প্রযুক্তি, যুদ্ধ, নজরদারি এবং করপোরেট নৈতিকতার জটিল সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আর শুধু সফটওয়্যার ব্যবসা করছে না—তারা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা প্রশ্নেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সামান্য গোপনীয়তা বা অস্পষ্টতাও এখন বৈশ্বিক বিতর্কে পরিণত হচ্ছে।

বিষয় : অ্যালোন হাইমোভিচ চ্যাট ট্র্যাকিং ডিজিটাল নজরদারি

মাইক্রোসফটের ইসরায়েল শাখার প্রধান ইসরায়েলকে সাহায্য করেছিলেন ফিলিস্থিনিদের টার্গেট করতে
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


মাইক্রোসফটের ইসরায়েল শাখার প্রধান ইসরায়েলকে সাহায্য করেছিলেন ফিলিস্থিনিদের টার্গেট করতে

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে যখন তীব্র বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এসেছেমাইক্রোসফট-এর ইসরায়েল শাখা। প্রতিষ্ঠানটির ইসরায়েল অফিসের প্রধান অ্যালোন হাইমোভিচ-কে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে—এমন খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। যদিও মাইক্রোসফট আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এটিকে “স্টেপিং ডাউন” বা স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো বলে উল্লেখ করেছে, বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কোম্পানিটির প্রযুক্তিগত সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক ঘিরে নৈতিক ও আইনি বিতর্ক। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরই এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে। তদন্তে মূলত খতিয়ে দেখা হয়, ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট—বিশেষ করে বহুল আলোচিত “ইউনিট ৮২০০”—কীভাবে মাইক্রোসফটের Azure ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করছিল। অভিযোগ উঠেছে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ ফোনকল ও নজরদারির তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে।  

এই বিতর্কের সূত্রপাত আরও আগে। ২০২৫ সালে দ্য গার্ডিয়ান এবং লোকাল কল -এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা ইউনিটগুলো মাইক্রোসফটের Azure ক্লাউড ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ নজরদারি তথ্য সংরক্ষণ করছিল। বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ নজরদারির অভিযোগ সামনে আসে। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—একটি বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির অবকাঠামো কি যুদ্ধ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? 

মাইক্রোসফটের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। কোম্পানিটির বহু কর্মী “No Azure for Apartheid” স্লোগানে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি এমনভাবে ব্যবহার হচ্ছে যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পরবর্তীতে কোম্পানিটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে এবং কিছু সামরিক ইউনিটের সঙ্গে Azure সেবাও বন্ধ করে দেয়। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে মাইক্রোসফটের গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল “স্বচ্ছতার অভাব”। অভিযোগ ওঠে, ইসরায়েল শাখা কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি জানায়নি যে কীভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক ইউনিটগুলো Azure ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ইউরোপভিত্তিক সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণের কারণে ইউরোপীয় গোপনীয়তা আইন ও ডেটা সুরক্ষা নীতিমালা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এরপরই অ্যালোন হাইমোভিচের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেননি, বরং Azure অবকাঠামো ব্যবহারের কিছু দিক গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের কাছে যথেষ্ট স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

তবে মাইক্রোসফট আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সরাসরি “বরখাস্ত” শব্দটি ব্যবহার করেনি। কোম্পানির সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অ্যালোন হাইমোভিচ নতুন পেশাগত যাত্রায় যাচ্ছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে মাইক্রোসফট ইসরায়েল উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাস্তবে একটি “ফোর্সড এক্সিট” বা চাপের মুখে পদত্যাগ। কারণ তাঁর বিদায়ের পর মাইক্রোসফট ইসরায়েলকে সরাসরি Microsoft France-এর অধীনে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ করপোরেট রদবদলের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। 

এই ঘটনার আরেকটি বড় দিক হলো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর “নৈতিক দায়বদ্ধতা” নিয়ে নতুন বিতর্ক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু মাইক্রোসফট নয়, Google এবং Amazon-এর বিরুদ্ধেও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্লাউড ও এআই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে “Project Nimbus” নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও প্রযুক্তিকর্মীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালোন হাইমোভিচের বিদায় শুধু একজন করপোরেট কর্মকর্তার পদত্যাগ নয়; এটি আসলে প্রযুক্তি, যুদ্ধ, নজরদারি এবং করপোরেট নৈতিকতার জটিল সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আর শুধু সফটওয়্যার ব্যবসা করছে না—তারা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা প্রশ্নেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সামান্য গোপনীয়তা বা অস্পষ্টতাও এখন বৈশ্বিক বিতর্কে পরিণত হচ্ছে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত