আন্তর্জাতিক
পঁচাত্তর বছর পার করা মোহাম্মদ রফিক পঞ্চাশ বছর ধরে ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদে আযান দিয়েছেন । দেশভাগের আগে তাঁর দাদাও এই মসজিদের ইমাম ছিলেন। অথচ গত শুক্রবারের পর থেকে সেই মসজিদে পা রাখার অধিকারটুকু তাঁরমত চিরতরে হারিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের এক রায়ে রাতারাতি এই ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদটি এখন পুরোপুরি হিন্দু মন্দিরে পরিণত হয়েছে।
এই বিতর্কটা বহু বছরের পুরনো। মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের এই ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ নিয়ে কয়েক দশক ধরে টানাটানি চলছে। ২০০৩ সাল থেকে এখানে একটা চলনসই নিয়ম ছিল—মঙ্গলবারে হিন্দুরা পূজা করতেন আর শুক্রবারে মুসলিমরা নামাজ পড়তেন। তবে গত ১৫ মে হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ সেই নিয়ম বাতিল করে দিলেন। বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা আর বিচারপতি অলোক অবস্থী তাঁদের রায়ে বললেন, মাটির নিচের প্রমাণ বলছে এটা নাকি রাজা ভোজের আমলের এক সরস্বতী মন্দির ছিল। আদালতের ধারণা, এখানে হিন্দুদের উপাসনা নাকি কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এ যেন ইতিহাস আর বিশ্বাসের এক অদ্ভুত লড়াই। এই রায়টি কিন্তু হুট করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের (এএসআই) টানা ৯৮ দিনের একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। তারা মাটির নিচে তল্লাশি চালিয়ে দুই হাজার পাতার এক বিশাল রিপোর্ট তৈরি করে আদালতে জমা দেয়। তাদের দাবি, বর্তমান মসজিদের কাঠামোটি আসলে পুরনো এক বিশাল হিন্দু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। যার কারণ হিসেবে তারা বলছেন সেখানে নাকি পুরনো মুদ্রা আর শিলালিপি পাওয়া গেছে।
তবে মুসলিম পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালমান খুরশিদ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি আদালতে পরিষ্কার যুক্তি দেন যে, শুধু মাটির নিচে প্রাচীন কোনো কাঠামো পাওয়া গেলেই একটা চালু উপাসনালয়ের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়া যায় না। তিনি সুপ্রিম কোর্টের বাবরি মসজিদ মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, "শুধু বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক অনুমানের ওপর ভর করে কোনো জায়গার আইনি মালিকানা ঠিক করা যায় না।" সোজা কথায়, আদালতের কাজ পুরনো রাজাদের ভুল খোঁজা নয়, আজকের দিনের শান্তি রক্ষা করা।
এই রায় ভারতের নিজস্ব একটি বড় আইনকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশে ১৯৯১ সালের একটা আইন আছে, যা বলে—১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার দিনে যে ধর্মীয় স্থান যেভাবে ছিল, তা আর কখনো বদলানো যাবে না। তবে এই মসজিদটির ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অজুহাতে সেই আইনি সুরক্ষাও আর টিকল না। শুধু মুসলিম নয়, শুনানির সময় জৈন সম্প্রদায়ও দাবি করেছিল এটা নাকি তাদের পুরোনো গুরুকুল ছিল। অর্থাৎ, এ জায়গার ওপর দাবিদারের অভাব নেই।\
২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশজুড়ে প্রাচীন মসজিদগুলোকে মন্দির দাবি করার একটা জোয়ার এসেছে। অযোধ্যার পর এখন কাশী আর মথুরার মসজিদ নিয়েও একই কাণ্ড ঘটছে। এমনকি তাজমহলের নিচেও মন্দিরের খোঁজ চলছে। হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, ধারের এই কামাল মাওলা মসজিদে এই ঘটনা শেষ হচ্ছে না। একটার পর একটা রায় যেন পুরনো ক্ষতগুলোকে আবার নতুন করে তাজা করে তুলছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে ইতিহাসের ভুল সংশোধন করতে গিয়ে কি ভারতের বর্তমানের সম্প্রীতিটাকেই চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে?
এই পরিচয় বদলের ধারা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। বৈশ্বিক বা সামাজিক সম্পর্কে বন্ধু থেকে প্রতিপক্ষ হতে বেশি সময় লাগে না, বিশেষ করে যখন ক্ষমতার অপপ্রয়োগ একবার শুরু হলে তা ধ্বংস হওয়ার আগে থামেনা। এই সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও অধিকার হরণ কোন স্থানীয় বিবাদ নয়,বরং পুরো ভারতজুড়ে চলমান হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন। যা বহুমাত্রিক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়টাই চিরতরে মুছে ফেলার নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
পঁচাত্তর বছর পার করা মোহাম্মদ রফিক পঞ্চাশ বছর ধরে ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদে আযান দিয়েছেন । দেশভাগের আগে তাঁর দাদাও এই মসজিদের ইমাম ছিলেন। অথচ গত শুক্রবারের পর থেকে সেই মসজিদে পা রাখার অধিকারটুকু তাঁরমত চিরতরে হারিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের এক রায়ে রাতারাতি এই ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদটি এখন পুরোপুরি হিন্দু মন্দিরে পরিণত হয়েছে।
এই বিতর্কটা বহু বছরের পুরনো। মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের এই ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ নিয়ে কয়েক দশক ধরে টানাটানি চলছে। ২০০৩ সাল থেকে এখানে একটা চলনসই নিয়ম ছিল—মঙ্গলবারে হিন্দুরা পূজা করতেন আর শুক্রবারে মুসলিমরা নামাজ পড়তেন। তবে গত ১৫ মে হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ সেই নিয়ম বাতিল করে দিলেন। বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা আর বিচারপতি অলোক অবস্থী তাঁদের রায়ে বললেন, মাটির নিচের প্রমাণ বলছে এটা নাকি রাজা ভোজের আমলের এক সরস্বতী মন্দির ছিল। আদালতের ধারণা, এখানে হিন্দুদের উপাসনা নাকি কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এ যেন ইতিহাস আর বিশ্বাসের এক অদ্ভুত লড়াই। এই রায়টি কিন্তু হুট করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের (এএসআই) টানা ৯৮ দিনের একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। তারা মাটির নিচে তল্লাশি চালিয়ে দুই হাজার পাতার এক বিশাল রিপোর্ট তৈরি করে আদালতে জমা দেয়। তাদের দাবি, বর্তমান মসজিদের কাঠামোটি আসলে পুরনো এক বিশাল হিন্দু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। যার কারণ হিসেবে তারা বলছেন সেখানে নাকি পুরনো মুদ্রা আর শিলালিপি পাওয়া গেছে।
তবে মুসলিম পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালমান খুরশিদ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি আদালতে পরিষ্কার যুক্তি দেন যে, শুধু মাটির নিচে প্রাচীন কোনো কাঠামো পাওয়া গেলেই একটা চালু উপাসনালয়ের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়া যায় না। তিনি সুপ্রিম কোর্টের বাবরি মসজিদ মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, "শুধু বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক অনুমানের ওপর ভর করে কোনো জায়গার আইনি মালিকানা ঠিক করা যায় না।" সোজা কথায়, আদালতের কাজ পুরনো রাজাদের ভুল খোঁজা নয়, আজকের দিনের শান্তি রক্ষা করা।
এই রায় ভারতের নিজস্ব একটি বড় আইনকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশে ১৯৯১ সালের একটা আইন আছে, যা বলে—১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার দিনে যে ধর্মীয় স্থান যেভাবে ছিল, তা আর কখনো বদলানো যাবে না। তবে এই মসজিদটির ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অজুহাতে সেই আইনি সুরক্ষাও আর টিকল না। শুধু মুসলিম নয়, শুনানির সময় জৈন সম্প্রদায়ও দাবি করেছিল এটা নাকি তাদের পুরোনো গুরুকুল ছিল। অর্থাৎ, এ জায়গার ওপর দাবিদারের অভাব নেই।\
২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশজুড়ে প্রাচীন মসজিদগুলোকে মন্দির দাবি করার একটা জোয়ার এসেছে। অযোধ্যার পর এখন কাশী আর মথুরার মসজিদ নিয়েও একই কাণ্ড ঘটছে। এমনকি তাজমহলের নিচেও মন্দিরের খোঁজ চলছে। হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, ধারের এই কামাল মাওলা মসজিদে এই ঘটনা শেষ হচ্ছে না। একটার পর একটা রায় যেন পুরনো ক্ষতগুলোকে আবার নতুন করে তাজা করে তুলছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে ইতিহাসের ভুল সংশোধন করতে গিয়ে কি ভারতের বর্তমানের সম্প্রীতিটাকেই চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে?
এই পরিচয় বদলের ধারা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। বৈশ্বিক বা সামাজিক সম্পর্কে বন্ধু থেকে প্রতিপক্ষ হতে বেশি সময় লাগে না, বিশেষ করে যখন ক্ষমতার অপপ্রয়োগ একবার শুরু হলে তা ধ্বংস হওয়ার আগে থামেনা। এই সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও অধিকার হরণ কোন স্থানীয় বিবাদ নয়,বরং পুরো ভারতজুড়ে চলমান হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন। যা বহুমাত্রিক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়টাই চিরতরে মুছে ফেলার নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
2.png)