২৭ মে ২০২৬, ০৫:৩৬ এএম
হরমুজে নতুন মার্কিন হামলা: থমকে শান্তি আলোচনা
কাতারের দোহায় যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা জট খোলার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালির কাছে নতুন করে মার্কিন হামলার ঘটনা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও মাইন বসাতে যাওয়া ইরানি নৌকায় হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই ‘আত্মরক্ষা’র আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেন আরও উসকে দিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে থাকলেও তার নজর এখন হরমুজ প্রণালির ওপর। তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের জ্বালানি চলাচলের এই প্রধান পথটি যেকোনো উপায়ে খোলা রাখতে হবে। ওদিকে তেহরানও ছেড়ে কথা বলছে না। ইরানের দাবি, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী ড্রোন ও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে তারা পালটা গুলি ছুঁড়েছে। সেই সঙ্গে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এখানে বেশ কড়া। তার মতে, চুক্তি হবে দুর্দান্ত নয়তো হবে না—মাঝামাঝি কোনো পথ নেই। দোহায় ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি শান্তি আলোচনার ক্ষীণ আশা দেখালেও, ট্রাম্পের এই ‘সরাসরি যুদ্ধ’ বা ‘পূর্ণাঙ্গ চুক্তি’র আল্টিমেটাম পুরো বিষয়টিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে আব্রাহাম চুক্তির মতো ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোকে এই শান্তি আলোচনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়াতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা—চুক্তি না হলে সংঘাতের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়বে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা আর মধ্যপ্রাচ্যের এই রণকৌশল এখন সাধারণ মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে। একদিকে আলোচনার টেবিলে সমঝোতার হাতছানি, অন্যদিকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে যুদ্ধের ঘনঘটা—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের শেষ নেই।
ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনার টেবিলে বসে নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের এই জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি এবার নতুন এক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, এই সমঝোতার অংশ হিসেবে অন্তত ছয়টি মুসলিম প্রধান দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ স্বাক্ষর করতে হবে। তার এই আকস্মিক অবস্থানে নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গন।
সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে, তবে এটি সবার জন্যই একটি ‘ভালো চুক্তি’ হতে হবে। নতুবা কোনো চুক্তিই হবে না। আলোচনার ফলাফল নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা সফল না হলে বিকল্প হিসেবে আগের চেয়ে আরও বড় ও শক্তিশালীভাবে যুদ্ধের পথে হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময় ট্রাম্প এই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বিশেষভাবে সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও জর্ডানের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা রাখছে, তার বিপরীতে এসব দেশের একযোগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করা উচিত। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি সৌদি আরব ও কাতারের দ্রুত স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দরকার। পরবর্তীতে অন্য দেশগুলোরও এগিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়। কেউ যদি এতে অংশ নিতে না চায়, তবে সেটি তাদের ‘খারাপ উদ্দেশ্যের’ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের এই আবদার বা শর্তকে ঘিরে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এর আগে তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। এবার ট্রাম্প চাইছেন সেই তালিকায় আরও বড় বড় দেশের নাম যুক্ত হোক। যদিও ট্রাম্পের এই দীর্ঘ পোস্টের কোথাও সরাসরি ইসরায়েলের নাম নেওয়া হয়নি, তবুও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের প্রসঙ্গটি সরাসরি সেই রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গেই জড়িত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বার্তা আসলে একাধারে অনুরোধ এবং চাপ। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারকে তিনি সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের পথে আসার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি হলো, ট্রাম্প যাদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাদের কেউই এখনো পর্যন্ত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা ইতিবাচক অবস্থান জানায়নি। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পথ পরিহার নাকি নতুন এই কূটনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার—কোন পথে হাঁটবে মুসলিম বিশ্বের এই প্রভাবশালী দেশগুলো, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব রাজনীতি।
চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে ভারত অবস্থান করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দিল্লিতে গতকাল রোববার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের চলমান অস্থিরতা নিরসনে শান্তিচুক্তি নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। দিনের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে ‘সুসংবাদ’ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রুবিও বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সুখবর আসতে পারে। এই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি কেবল হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান উদ্বেগই নিরসন করবে না, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নতুন পথের সূচনা করবে—যেখানে আর কোনো পারমাণবিক ভীতি থাকবে না।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত এই সমঝোতার অন্যতম শর্ত হিসেবে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যদিও তেহরান শুরু থেকেই এমন দাবি জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে এক ঘণ্টা দূরে থাকার রোমহর্ষক স্বীকারোক্তির পরপরই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। ইরান বুধবার এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফের কোনো ধরনের আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়, তবে তার পরিণতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না; যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর। তেহরানের এই বার্তা সরাসরি ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঘাঁটিকে লক্ষ করে দেওয়া হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, নেপথ্যে কূটনীতির চেষ্টা চললেও ইরান নিজেদের অবস্থানে অনড়। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে প্রস্তাব হাজির করেছে, তার প্রতিটি শর্তই ট্রাম্প প্রশাসন আগে নাকচ করে দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি, সব মিলিয়ে পুরোনো দাবিনামাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে তারা। অথচ ট্রাম্প গত সোমবার দাবি করেছিলেন, বড় ধরনের সামরিক হামলার ঠিক আগমুহূর্তে কূটনীতির সুযোগ দিতে তিনি পিছিয়ে এসেছেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি হামলার সিদ্ধান্তের থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে ছিলাম।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। তাদের দাবি, ইরানের ওপর যদি আবার আগ্রাসন চালানো হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি ভূ-সীমানার বাইরেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না তারা। এদিকে, নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন নিয়ে এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবির। যুদ্ধবিরতির পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একেক সময় একেক ধরনের কথাবার্তা—কখনও কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি, আবার কখনও শান্তি চুক্তির আশাবাদ—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে অস্থির করে তুলেছে।
যদিও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শান্তি আলোচনার অগ্রগতির কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছেন, তবুও বিশ্ববাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান। বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কিছুটা নিচে নেমে এলেও বাজারজুড়ে উদ্বেগ কমেনি। ট্রাম্পের অস্থির সিদ্ধান্ত ও তেহরানের এমন কঠোর হুঙ্কার এখন বিশ্ব রাজনীতির পারদকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পরিকল্পিত সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ট্রাম্পের এই আকস্মিক বিবৃতির পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার থেকে এক ধাক্কায় ১০৯ ডলারে নেমে আসে। বিবিসি জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধংদেহী মনোভাব কিছুটা শিথিল হওয়ার আভাসে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এর আগে অবশ্য সোমবার দিনভর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল চরম ওঠানামার মধ্যে। সপ্তাহান্তে ট্রাম্প ইরানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, সমঝোতার জন্য তেহরানের হাতে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এরপর সোমবার সকালেও তিনি এক পোস্টে লেখেন, ইরানকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নইলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন কঠোর অবস্থানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে মঙ্গলবার শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা ছিল ট্রাম্পের।
মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় সাময়িক এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছিল। ফলে এই অঞ্চলের শান্তি আলোচনা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির সামান্যতম খবরের ওপর ভিত্তি করেই তেলের বাজার দ্রুত ওঠানামা করছে।
পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় ঘোরে যখন ইরানের একটি সংবাদ সংস্থা দাবি করে, আলোচনার টেবিলে তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে সম্মত হয়েছে হোয়াইট হাউস। এই খবরের পর বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা পড়তে শুরু করে। পরবর্তীতে ট্রাম্প নিজেই জানান যে মধ্যপ্রাচ্যে এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের বিশেষ অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের পরিকল্পিত সামরিক অভিযান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেছেন, ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য হবে। তবে একই সাথে তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। সমঝোতা ব্যর্থ হলে যেকোনো মুহূর্তে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের নোটিশে ইরানের বিরুদ্ধে বিশাল পরিসরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে বলেও হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। মার্কিন প্রশাসনের এই দফানি দফানি অবস্থান ও হুশিয়ারি নিয়ে ইরান অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি খসড়া প্রস্তাবকে সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ট্রাম্পের মতে, ইরানের প্রস্তাবিত শর্তগুলো মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী এবং তা কোনোভাবেই আলোচনার ভিত্তি হতে পারে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরানের পাঠানো চিঠিতে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ইরানের ওপর আরোপিত সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। এবং তৃতীয়ত, বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দিতে হবে। ইরানের প্রস্তাব অনুসারে, একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ৩০ দিনের আলোচনা চলবে, তবে এই সময়ের মধ্যেই তেল বিক্রির ওপর থেকে সব বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রস্তাবগুলো ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি আকাশচুম্বী। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান কোনো নমনীয় অবস্থান দেখাবে কি না, সে বিষয়ে চিঠিতে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
"ইরান পরিস্থিতি সামলানো একান্তই আমার কাজ, অন্য কারও নয়।"
এদিকে, তেহরান ট্রাম্পের এই প্রতিক্রিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। দেশটির একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ট্রাম্পের সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে আলোচনা চলবে না। তাদের দাবি, ট্রাম্পের অসন্তোষই প্রমাণ করে যে ইরান সঠিক পথে দরকষাকষি করছে।
তবে ওয়াশিংটনে ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইতিমধ্যে ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থগিত হওয়া ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’ পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে সমাধানের চেয়ে বর্তমানে সংঘাতের মেঘই বেশি ঘনীভূত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের দামামা কি তবে আবারও বেজে উঠতে চলেছে? শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা যদি কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে না যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না; বরং আরও শক্তিশালী রূপে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান শুরু করবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, সবকিছু ঠিকঠাক না চললে ওয়াশিংটন আবারও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ ফিরে যেতে পারে। তবে এবার তা নিছক পুরনো অভিযান হবে না; এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’। যদিও এই ‘প্লাস’ বা বাড়তি অংশে ঠিক কী ধরনের সামরিক চমক থাকছে, তা কৌশলে গোপন রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তান ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অভিযান শুরু না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প সাময়িকভাবে ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন রণতরীর পাহারায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথ দেওয়া। এর পেছনে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসা প্রবল কূটনৈতিক চাপও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে এনবিসি নিউজ। ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনায় দেরি করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রহস্যময় হাসি দিয়ে কেবল বলেছেন, “আমরা খুব শীঘ্রই তা জানতে পারব।”
তবে আলোচনার টেবিলে যাই ঘটুক, সমুদ্রের নীল জলরাশি এরই মধ্যে বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ইরানি পতাকাবাহী দুটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ওমান উপসাগরের একটি ইরানি বন্দরে প্রবেশের মুখে চালানো এই হামলায় জাহাজ দুটি এখন পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়েছে। হোয়াইট হাউসের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন বারুদের ধোঁয়ায় অন্ধকার। হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মধ্যে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সম্মুখ সংঘাত। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা 'ফার্স নিউজ' জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টা ধরে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় ‘বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ’ চলছে। গত রাতের এক রক্তক্ষয়ী হামলার পর থেকে ওই অঞ্চলে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় মাপের আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
সংঘাতের সূত্রপাত হয় গত রাতে ওমান সাগর ও হরমুজ প্রণালির মধ্যবর্তী মিনাব কাউন্টি সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে একটি ইরানি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে অতর্কিতে হামলা চালায় মার্কিন নৌবাহিনী। হামলায় পণ্যবাহী জাহাজটিতে দ্রুত আগুন ধরে যায় এবং এতে একজন নাবিক নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হন। দক্ষিণ ইরানের মিনাব কাউন্টির গভর্নর মোহাম্মদ রাদমেহর আজ নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ পাঁচ নাবিকের মধ্যে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিদের খোঁজে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ এবং ‘মার্কিন সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই আজ এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ও হঠকারিতার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত।" এদিকে, তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ওয়াশিংটন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতালির রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা আজ শুক্রবারের মধ্যেই ইরানের জবাব প্রত্যাশা করছেন। তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা দেখতে চাই ইরান আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানে কতটা আন্তরিক।"
হরমুজ প্রণালির এই অস্থিতিশীলতা কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বড় হুমকি। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। বর্তমান উত্তেজনার ফলে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এখন পুরো বিশ্বের নজর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—তারা কি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফেরাবে, নাকি হরমুজ প্রণালিতে আরও বড় কোনো সামরিক সংঘাতের সূচনা করবে?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি এখন আক্ষরিক অর্থেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে এবার সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে বড় ধরণের হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তেহরানের ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৭ মে) জাস্ক বন্দরের কাছে তাদের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। আর ঠিক তার পাল্টায় গর্জে উঠেছে ইরানি সামরিক বাহিনী।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার—ইউএসএস ট্রাক্সটন, ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা এবং ইউএসএস মেসনকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। একযোগে জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়। তেহরানের দাবি, তাদের এই আক্রমণে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং ওমান উপসাগরের দিকে পালিয়ে গেছে।
তবে তেহরানের এই বীরত্বগাথাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের দিক থেকে আসা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা মাঝপথেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তাদের কোনো যুদ্ধজাহাজের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি। শুধু প্রতিরোধেই থেমে থাকেনি মার্কিন বাহিনী; এর পরপরই ‘আত্মরক্ষা’র দোহাই দিয়ে ইরানের মূল ভূখণ্ডের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, মিনাব ও সিরিক শহরের ইরানি সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন মার্কিন মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
পুরো ঘটনা নিয়ে হোয়াইট হাউসের সুর কিছুটা সাবধানী হলেও অনড়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা নতুন করে কোনো যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়াতে চান না। তবে নিজ দেশের বাহিনীকে রক্ষা করতে যে কোনো চরম পদক্ষেপ নিতেও তারা দ্বিধাবোধ করবেন না। অন্যদিকে ইরান এই ঘটনাকে স্রেফ উসকানি নয়, বরং মার্কিন আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় এখন বারুদের গন্ধ। কোনো পক্ষেরই পিছু হঠার লক্ষণ নেই, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তাল সময় শেষ হতে চলেছে শীঘ্রই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানে দুই দেশ এখন সমঝোতার একেবারে শেষ পর্যায়ে। এই বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তারা নিশ্চিত করেছে যে, শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে তৈরি এক পৃষ্ঠার খসড়া চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত স্বাক্ষরের অপেক্ষায়।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এই সমঝোতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানের ওই সূত্রটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রতিবেদনটি একদম নির্ভুল। সত্যি বলতে, দুই পক্ষই এখন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুতই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। হোয়াইট হাউস মনে করছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তার অবসান ঘটার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির হাওয়া যুদ্ধ থামার এই জোরালো গুঞ্জনে বিশ্ববাজারে এক ধরনের ইতিবাচক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে নামতে শুরু করেছে—ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক ধাক্কায় ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল এখন ১০০ ডলারের কোটায়। শুধু তেল নয়, বিশ্ব শেয়ারবাজারেও চনমনে ভাব দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন বলে বন্ডের সুদের হারও নিম্নমুখী।
নীরবতা ও পর্যালোচনার খেলা অবশ্য এত কিছুর পরও হোয়াইট হাউস কিংবা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তেহরানের সুর কিছুটা নমনীয়। সিএনবিসি জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাব পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তারা এখন এই প্রস্তাবগুলো খুব নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক যে সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেন, ঠিক তখনই এই সমঝোতার খবরটি সামনে এল। এখন দেখার বিষয়, এক পৃষ্ঠার এই ছোট কাগজটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে কতটা বড় স্বস্তি নিয়ে আসে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে ফ্রান্সের শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ‘চার্লস দ্য গল’। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে নির্বিঘ্ন চলাচল বজায় রাখতেই ফরাসি নৌবহরের এই মহড়া। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্যারিস।
বুধবার ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সুয়েজ খাল অতিক্রম করে বিশাল এই নৌবহরটি এখন লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মূলত ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার পরপরই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এই রণতরী মোতায়েন করা হয়েছিল। টানা ৪-৫ মাস গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে ফরাসি এই গর্বের।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তরীগুলোকে সম্ভাব্য যেকোনো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ চলাচলের অধিকার রক্ষায় এই মিশনকে একটি বড় ধরণের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি টেকসই আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে চায় ইউরোপের এই দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র যখন দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে, তখন এই নৌবহরের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ বয়ে আনে কি না, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেইজিং সফরে গিয়ে প্রভাবশালী মিত্র রাষ্ট্র চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছে ইরান। বুধবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেবল একটি ‘ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ’ চুক্তিই গ্রহণ করতে আগ্রহী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরাগচির এটিই প্রথম চীন সফর, যা ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ওয়াশিংটনকে তেহরানের স্পষ্ট বার্তা
বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওয়াশিংটনের প্রতি এক প্রকার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আরাগচি ওয়াং ই-এর কাছে উদ্ধৃত করেছেন যে, ইরানের জাতীয় স্বার্থ সুনিশ্চিত করে এমন কোনো স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান ছাড়া তেহরান অন্য কোনো সমঝোতা মেনে নেবে না। তিনি চীনকে ইরানের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে অবিহিত করেন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের অনড় অবস্থান ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আরাগচি আরও আশা ব্যক্ত করেছেন যে, চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুসংহত ও সুদৃঢ় হবে।
শান্তি বজায় রাখতে বেইজিংয়ের আহ্বান
বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সংঘাত এড়াতে চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষকেই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার জোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে বেইজিং। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ইরানের এই অনড় অবস্থান এবং চীনের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-কেন্দ্রিক বিদ্যমান সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন ইসরায়েলি থিংক-ট্যাংক 'আইএনএসএস'-এর ইরান বিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক বেনি সাবতি। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে সতর্ক করেছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনের কূটনৈতিক পথগুলো এখন প্রায় রুদ্ধ। এই অচলাবস্থা ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উচিত পুনরায় সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধের পথে প্রত্যাবর্তন করা বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
গবেষক বেনি সাবতি দাবি করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের অনমনীয় মানসিকতা বা ‘দম্ভ’ কোনো প্রকার চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, “ইরানের দম্ভ এখন আকাশচুম্বী; তারা বাস্তব পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।” ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদল অশুভ মানুষ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সাবতির মতে, ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এখন একটি ভয়াবহ সামরিক শাসনে রূপান্তরিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে এই বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্প একদিকে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেন, আবার পরক্ষণেই আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েন। এই ধরনের দ্বিচারিতা ও স্ববিরোধী অবস্থান ইরানের মনোবল বৃদ্ধি করছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্সির মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে ক্ষুণ্ণ করছে। যদি ট্রাম্প আলোচনার জন্য হন্যে হয়ে না বেড়াতেন, তবে বর্তমান বিশ্ব আরও নিরাপদ অবস্থানে থাকত বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে বেনি সাবতি ইরানকে একটি ‘ভাইরাস’-এর সাথে তুলনা করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, শরীর অসুস্থ হলে ভাইরাস যেমন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, ইরানও নিজেকে হুমকিগ্রস্ত মনে করে বর্তমানে ঠিক তা-ই করছে। সাবতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেহরান সরাসরি ইসরায়েলকে আক্রমণের সাহস পায় না; বরং তারা বাহরাইন বা ওমানের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইরান সর্বদা অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা খুঁজে বেড়ায়—যা তারা আশির দশকে লেবাননে করেছিল।
পরিশেষে ইসরায়েলি এই গবেষক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনার টেবিলে পড়ে থাকলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং এই ব্যবস্থার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; অন্যথায় এই সংকট থেকে উত্তরণের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ফের নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে বেসামরিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। তেহরান থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সরদার আতাস এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র পূর্বে দাবি করেছিল যে তারা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তেহরান সেই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, আক্রান্ত নৌযানগুলো কোনোভাবেই ইরানের বিশেষায়িত বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) ছিল না; বরং সেগুলো ছিল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির এই ঘটনায় ইরানের নৌবাহিনীও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে বলে তেহরান থেকে দাবি করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন ডেস্ট্রয়ার বা যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের রাডার পুরোপুরি বন্ধ রেখে অত্যন্ত গোপনে প্রণালিতে প্রবেশের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তবে এই অঞ্চলে ইরানি নৌবাহিনীর সার্বক্ষণিক ও তীক্ষ্ণ নজরদারির কারণে রাডার চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন জাহাজগুলো শনাক্ত হয়ে যায়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলোকে চিহ্নিত করার পরপরই সেগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানি নৌবাহিনী সতর্কতামূলক গোলাবর্ষণ করে। সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক কমব্যাট ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট ব্যবহার করা হয়। এই নজিরবিহীন প্রতিরোধের মুখে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের অভিযান পরিত্যাগ করতে এবং ফিরে যেতে বাধ্য হয় বলে তেহরান জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী যদি ভবিষ্যতেও আবারও হরমুজ প্রণালিতে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে, তবে তা বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি এবং গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। এই হুশিয়ারির মাধ্যমে ইরান একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা তাদের জলসীমায় কোনো ধরনের বিদেশি অনুপ্রবেশ বা হামলা বরদাশত করবে না। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান এবং মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে, কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো ধরনের সংঘাত পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল–জাজিরা
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে এক ঘণ্টা দূরে থাকার রোমহর্ষক স্বীকারোক্তির পরপরই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। ইরান বুধবার এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফের কোনো ধরনের আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়, তবে তার পরিণতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না; যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর। তেহরানের এই বার্তা সরাসরি ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঘাঁটিকে লক্ষ করে দেওয়া হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, নেপথ্যে কূটনীতির চেষ্টা চললেও ইরান নিজেদের অবস্থানে অনড়। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে প্রস্তাব হাজির করেছে, তার প্রতিটি শর্তই ট্রাম্প প্রশাসন আগে নাকচ করে দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি, সব মিলিয়ে পুরোনো দাবিনামাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে তারা। অথচ ট্রাম্প গত সোমবার দাবি করেছিলেন, বড় ধরনের সামরিক হামলার ঠিক আগমুহূর্তে কূটনীতির সুযোগ দিতে তিনি পিছিয়ে এসেছেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি হামলার সিদ্ধান্তের থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে ছিলাম।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। তাদের দাবি, ইরানের ওপর যদি আবার আগ্রাসন চালানো হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি ভূ-সীমানার বাইরেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না তারা। এদিকে, নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন নিয়ে এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবির। যুদ্ধবিরতির পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একেক সময় একেক ধরনের কথাবার্তা—কখনও কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি, আবার কখনও শান্তি চুক্তির আশাবাদ—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে অস্থির করে তুলেছে।
যদিও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শান্তি আলোচনার অগ্রগতির কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছেন, তবুও বিশ্ববাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান। বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কিছুটা নিচে নেমে এলেও বাজারজুড়ে উদ্বেগ কমেনি। ট্রাম্পের অস্থির সিদ্ধান্ত ও তেহরানের এমন কঠোর হুঙ্কার এখন বিশ্ব রাজনীতির পারদকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
2.png)