জাতীয়
টিকিট বিক্রিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে একসময় বরখাস্ত হওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা আশরাফুল আলম এখন প্রতিষ্ঠানটির অত্যন্ত প্রভাবশালী পদ ‘পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস)’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কুয়েত, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অর্থ লোপাট, আসন ব্লক করে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ম্যানুয়াল টিকিট বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব ক্ষুরধার করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কার্যকর শাস্তির বদলে কেবল ‘মৃদু ভর্ৎসনা’র মাধ্যমে তাকে বারবার পুনর্বহাল করা হয়েছে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের অবস্থান আরও সংহত করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে বিমানে কর্মজীবন শুরু করা আশরাফুল আলমের মূল উত্থান ঘটে ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। কুয়েত ও নিউইয়র্ক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার থাকাকালে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে ভুয়া বুকিং ও ফ্রি টিকিট ইস্যু করার গুরুতর অসংগতি অভ্যন্তরীণ অডিটে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে দেশে ফিরে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে সাধারণ প্রবাসীদের পকেট কাটার একচ্ছত্র সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। ২০১৯ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে তাকে এই জালিয়াতির প্রধান হোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, আসন খালি রেখে ফ্লাইট উড়িয়ে এবং নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে টিকিট কুক্ষিগত করার সুযোগ দিয়ে তিনি বিমানের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের কঠোর সুপারিশের মুখে ২০১৯ সালের এপ্রিলে তাকে ওএসডি করা হয় এবং তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করার পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ。 তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিমানের এই অবস্থান বেশিদিন টেকেনি。 ২০২১ সালের শুরুতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার পর এক অদৃশ্য প্রভাবে আশরাফুল আলমকে নামমাত্র 'ভর্ৎসনা' করে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা হয়। পুনর্বহালের পর তার সিন্ডিকেট জেদ্দা ও মদিনা রুটের সাধারণ ইকোনমি ক্লাসের টিকিট প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে প্রবাসীদের জিম্মি করে ফেলে এবং হজ ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ভিআইপি সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক ঢাল তৈরি করা এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অক্ষত থেকে যান। উল্টো অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট এক বিতর্কিত আদেশে জেনারেল ম্যানেজার (ঢাকা) পদ থেকে তাকে সরাসরি মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এই পর্বতপ্রমাণ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আশরাফুল আলম সমস্ত বিষয়কে ‘পুরোনো সমাধান হওয়া ঘটনা’ ও ‘ভুল তথ্য’ বলে দাবি করেন। এদিকে বিমানের ভেতরকার প্রশাসনিক চাদর কতটা নড়বড়ে, তার প্রমাণ মিলেছে একই দিনে পদোন্নতি পাওয়া প্রশাসন বিভাগের অন্য এক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রশীদের ক্ষেত্রেও; তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানের মুখে থাকায় পদোন্নতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
সুত্র: এপি
বিষয় : দূর্নীতি আশ্রাফুল বাংলাদেশ বিমান
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
টিকিট বিক্রিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে একসময় বরখাস্ত হওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা আশরাফুল আলম এখন প্রতিষ্ঠানটির অত্যন্ত প্রভাবশালী পদ ‘পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস)’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কুয়েত, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অর্থ লোপাট, আসন ব্লক করে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ম্যানুয়াল টিকিট বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব ক্ষুরধার করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কার্যকর শাস্তির বদলে কেবল ‘মৃদু ভর্ৎসনা’র মাধ্যমে তাকে বারবার পুনর্বহাল করা হয়েছে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের অবস্থান আরও সংহত করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে বিমানে কর্মজীবন শুরু করা আশরাফুল আলমের মূল উত্থান ঘটে ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। কুয়েত ও নিউইয়র্ক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার থাকাকালে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে ভুয়া বুকিং ও ফ্রি টিকিট ইস্যু করার গুরুতর অসংগতি অভ্যন্তরীণ অডিটে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে দেশে ফিরে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে সাধারণ প্রবাসীদের পকেট কাটার একচ্ছত্র সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। ২০১৯ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে তাকে এই জালিয়াতির প্রধান হোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, আসন খালি রেখে ফ্লাইট উড়িয়ে এবং নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে টিকিট কুক্ষিগত করার সুযোগ দিয়ে তিনি বিমানের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের কঠোর সুপারিশের মুখে ২০১৯ সালের এপ্রিলে তাকে ওএসডি করা হয় এবং তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করার পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ。 তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিমানের এই অবস্থান বেশিদিন টেকেনি。 ২০২১ সালের শুরুতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার পর এক অদৃশ্য প্রভাবে আশরাফুল আলমকে নামমাত্র 'ভর্ৎসনা' করে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা হয়। পুনর্বহালের পর তার সিন্ডিকেট জেদ্দা ও মদিনা রুটের সাধারণ ইকোনমি ক্লাসের টিকিট প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে প্রবাসীদের জিম্মি করে ফেলে এবং হজ ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ভিআইপি সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক ঢাল তৈরি করা এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অক্ষত থেকে যান। উল্টো অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট এক বিতর্কিত আদেশে জেনারেল ম্যানেজার (ঢাকা) পদ থেকে তাকে সরাসরি মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এই পর্বতপ্রমাণ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আশরাফুল আলম সমস্ত বিষয়কে ‘পুরোনো সমাধান হওয়া ঘটনা’ ও ‘ভুল তথ্য’ বলে দাবি করেন। এদিকে বিমানের ভেতরকার প্রশাসনিক চাদর কতটা নড়বড়ে, তার প্রমাণ মিলেছে একই দিনে পদোন্নতি পাওয়া প্রশাসন বিভাগের অন্য এক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রশীদের ক্ষেত্রেও; তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানের মুখে থাকায় পদোন্নতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
সুত্র: এপি
2.png)