আন্তর্জাতিক
পশ্চিমবঙ্গের ওপাড়ে এখন এক অদ্ভুত সংকট। নতুন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের গবাদি পশু জবাইসংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগমুহূর্তে ১৯৫০ সালের ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের উচ্চ আদালতের একটি পুরনো নির্দেশিকাকে কঠোরভাবে কার্যকরের এই প্রশাসনিক তাগিদ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন ছড়িয়েছে আতঙ্ক, তেমনি এর বড় মাশুল গুনতে হচ্ছে রাজ্যের লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী গো-খামারিকে। আইনি জটিলতার ভয়ে ক্রেতারা বাজারে আসছেন না, যার ফলে মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী ডোমকল হাটসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের পশুর হাটগুলো এখন সম্পূর্ণ জনমানবহীন, ক্রেতাশূন্য।
এই নতুন সরকারি ফরমান অনুযায়ী, কোনো বলদ, গরু বা মহিষ কোরবানি দিতে হলে স্থানীয় পুরসভার চেয়ারম্যান কিংবা পঞ্চায়েত প্রধান এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ লিখিত শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট লাগবে। সেখানে আবার শর্ত দেওয়া হয়েছে, পশুটিকে প্রজনন ও কাজের অযোগ্য এবং অন্তত ১৪ বছরের বেশি বয়সী হতে হবে। এই অবাত্তব নিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সেখানকার প্রভাবশালী বিধায়ক হুমায়ুন কবির প্রশ্ন তুলেছেন, একটি পশুর বয়স ১৪ বছর কি না, তা কীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? গরুর কি কোনো বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্মনিবন্ধন থাকে? খামারিদের দাবি, গরুর স্বাভাবিক গড় আয়ু যেখানে ১২ থেকে ১৫ বছর, সেখানে ১৪ বছর পার হওয়া জরাজূর্ণ পশু কোরবানির বাজারে কে কিনবে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মুসলিম সমাজকে আড়ালে বা নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে কোরবানি করার মৌখিক আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এই নির্দেশ দেখিয়ে বাজারে ভীতি ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় বুমেরাং তৈরি হয়েছে রাজ্যের প্রান্তিক হিন্দু খামারিদের জন্য। সারা বছর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যারা কোরবানির মরসুমকে লক্ষ্য করে গরু লালন-পালন করেছিলেন, তারা এখন ঋণের বোঝা আর লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে চরম দিশেহারা। ক্ষুব্ধ খামারিরা প্রকাশ্যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছেন। ডোমকল হাটের এক প্রান্তিক চাষি ক্ষোভের সাথে জানান, বিক্রি না হলে এই বিপুল পরিমাণ গরুকে খাওনোর সামর্থ্য তাদের নেই, বাধ্য হয়ে এগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিতে হবে কিংবা নিজেদের বিষ খেতে হবে। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, সরকার বা তাদের স্বজাতিরা এসে যেন এসব গোমাতা বিনামূল্যে নিয়ে পূজা করে। চরম হতাশায় খামারিরা দাবি তুলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেন নিজেই সব গরু কিনে নেন এবং কৃষকদের ঘরে ঘরে বিকল্প চাকুরির ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় পৌনে চার কোটি গবাদি পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যাই প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ, যা গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে এই অভ্যন্তরীণ কড়াকড়ির সমান্তরালে এক বিশাল নীতিগত বৈষম্য ও কর্পোরেট একাধিপত্যের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) এবং খোদ ভারত সরকারের নিজস্ব তথ্য বলছে, বিশ্ববাজারে গবাদি পশুর মাংস রপ্তানিতে ভারত শীর্ষ তিন দেশের অন্যতম। ২০২৬ সালের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বছর ভারত থেকে মাংস রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ লাখ টনে ছোঁয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা থেকে দেশটির বার্ষিক রাজস্ব আয় হয় প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি রুপিরও বেশি। উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের বড় বড় কর্পোরেট কসাইখানা থেকে প্রক্রিয়াজাত এই মাংস যখন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মিসর কিংবা সৌদি আরবে অনায়াসে রপ্তানি হচ্ছে, তখন দেশের ভেতরের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা কেন সামান্য পশু বিক্রি করতে গিয়ে আইন ও ঋণের জালে জড়িয়ে দেউলিয়া হবেন—এই মৌলিক প্রশ্নটিই এখন ওপাড়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের ওপাড়ে এখন এক অদ্ভুত সংকট। নতুন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের গবাদি পশু জবাইসংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগমুহূর্তে ১৯৫০ সালের ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের উচ্চ আদালতের একটি পুরনো নির্দেশিকাকে কঠোরভাবে কার্যকরের এই প্রশাসনিক তাগিদ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন ছড়িয়েছে আতঙ্ক, তেমনি এর বড় মাশুল গুনতে হচ্ছে রাজ্যের লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী গো-খামারিকে। আইনি জটিলতার ভয়ে ক্রেতারা বাজারে আসছেন না, যার ফলে মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী ডোমকল হাটসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের পশুর হাটগুলো এখন সম্পূর্ণ জনমানবহীন, ক্রেতাশূন্য।
এই নতুন সরকারি ফরমান অনুযায়ী, কোনো বলদ, গরু বা মহিষ কোরবানি দিতে হলে স্থানীয় পুরসভার চেয়ারম্যান কিংবা পঞ্চায়েত প্রধান এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ লিখিত শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট লাগবে। সেখানে আবার শর্ত দেওয়া হয়েছে, পশুটিকে প্রজনন ও কাজের অযোগ্য এবং অন্তত ১৪ বছরের বেশি বয়সী হতে হবে। এই অবাত্তব নিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সেখানকার প্রভাবশালী বিধায়ক হুমায়ুন কবির প্রশ্ন তুলেছেন, একটি পশুর বয়স ১৪ বছর কি না, তা কীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? গরুর কি কোনো বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্মনিবন্ধন থাকে? খামারিদের দাবি, গরুর স্বাভাবিক গড় আয়ু যেখানে ১২ থেকে ১৫ বছর, সেখানে ১৪ বছর পার হওয়া জরাজূর্ণ পশু কোরবানির বাজারে কে কিনবে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মুসলিম সমাজকে আড়ালে বা নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে কোরবানি করার মৌখিক আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এই নির্দেশ দেখিয়ে বাজারে ভীতি ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় বুমেরাং তৈরি হয়েছে রাজ্যের প্রান্তিক হিন্দু খামারিদের জন্য। সারা বছর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যারা কোরবানির মরসুমকে লক্ষ্য করে গরু লালন-পালন করেছিলেন, তারা এখন ঋণের বোঝা আর লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে চরম দিশেহারা। ক্ষুব্ধ খামারিরা প্রকাশ্যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছেন। ডোমকল হাটের এক প্রান্তিক চাষি ক্ষোভের সাথে জানান, বিক্রি না হলে এই বিপুল পরিমাণ গরুকে খাওনোর সামর্থ্য তাদের নেই, বাধ্য হয়ে এগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিতে হবে কিংবা নিজেদের বিষ খেতে হবে। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, সরকার বা তাদের স্বজাতিরা এসে যেন এসব গোমাতা বিনামূল্যে নিয়ে পূজা করে। চরম হতাশায় খামারিরা দাবি তুলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেন নিজেই সব গরু কিনে নেন এবং কৃষকদের ঘরে ঘরে বিকল্প চাকুরির ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় পৌনে চার কোটি গবাদি পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যাই প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ, যা গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে এই অভ্যন্তরীণ কড়াকড়ির সমান্তরালে এক বিশাল নীতিগত বৈষম্য ও কর্পোরেট একাধিপত্যের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) এবং খোদ ভারত সরকারের নিজস্ব তথ্য বলছে, বিশ্ববাজারে গবাদি পশুর মাংস রপ্তানিতে ভারত শীর্ষ তিন দেশের অন্যতম। ২০২৬ সালের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বছর ভারত থেকে মাংস রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ লাখ টনে ছোঁয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা থেকে দেশটির বার্ষিক রাজস্ব আয় হয় প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি রুপিরও বেশি। উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের বড় বড় কর্পোরেট কসাইখানা থেকে প্রক্রিয়াজাত এই মাংস যখন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মিসর কিংবা সৌদি আরবে অনায়াসে রপ্তানি হচ্ছে, তখন দেশের ভেতরের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা কেন সামান্য পশু বিক্রি করতে গিয়ে আইন ও ঋণের জালে জড়িয়ে দেউলিয়া হবেন—এই মৌলিক প্রশ্নটিই এখন ওপাড়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
2.png)