আন্তর্জাতিক
চীন সফর শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে এক ধরনের সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ান। দ্বীপটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছে—তাইওয়ান একটি “স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র”, যার ওপর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি চান না তাইওয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিক। তার ভাষায়, “আমি চাই না কেউ স্বাধীনতা ঘোষণা করুক।” একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেন, তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ তার নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে “৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে” উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি বরং অঞ্চলটিতে শান্তি বজায় থাকুক সেটাই চান।
এই বক্তব্য আসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনচপিং–এর সঙ্গে ট্রাম্পের দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকের পরপরই। বেইজিং বহুদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে রেখেছে। বৈঠকে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে ভুল সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
তবে ট্রাম্প পরিস্থিতিকে অতটা ভয়াবহ হিসেবে দেখছেন না। ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শি জিনপিং যুদ্ধ চান না বলেই তার বিশ্বাস। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতি যেমন আছে তেমন থাকলে চীনও তাতে আপত্তি করবে না।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আজ এক বিবৃতিতে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দ্বীপটি ইতোমধ্যেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণের হাতে। তারা আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কাঠামোর অংশ।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং তে- আগেও একাধিকবার বলেছেন, তাইওয়ানকে নতুন করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে না, কারণ তারা বাস্তবিক অর্থেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এই অবস্থানের বিপরীতে ওয়াশিংটনের নীতি বরাবরই কিছুটা জটিল। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিং সরকারকেই চীনের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে না। আবার একই সঙ্গে মার্কিন আইনে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনকে একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়, অন্যদিকে তাইপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখতে হয়।
সম্প্রতি তাইওয়ানের পার্লামেন্ট প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর বড় একটি অংশ ব্যয় হবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্র কেনায়। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনও তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের রকেট লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং।
ট্রাম্প এখন বলছেন, অস্ত্র চুক্তিটি কার্যকর হবে কি না সে বিষয়ে তিনি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ বিষয়ে তাইওয়ানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যও ওয়াশিংটনের প্রচলিত অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন বার্তা বহন করছে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. লিন চিয়া-লুং বলেছেন, বেইজিংয়ের বাড়তে থাকা সামরিক চাপই বর্তমানে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ। তার অভিযোগ, চীন ধারাবাহিক সামরিক মহড়া ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সতর্ক বার্তা, বেইজিংয়ের কড়া অবস্থান এবং তাইপের পাল্টা সার্বভৌমত্বের ঘোষণা—তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এখন নজর থাকবে, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ভারসাম্য কতটা ধরে রাখতে পারে এবং বেইজিং-তাইপে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
চীন সফর শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে এক ধরনের সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ান। দ্বীপটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছে—তাইওয়ান একটি “স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র”, যার ওপর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি চান না তাইওয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিক। তার ভাষায়, “আমি চাই না কেউ স্বাধীনতা ঘোষণা করুক।” একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেন, তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ তার নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে “৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে” উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি বরং অঞ্চলটিতে শান্তি বজায় থাকুক সেটাই চান।
এই বক্তব্য আসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনচপিং–এর সঙ্গে ট্রাম্পের দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকের পরপরই। বেইজিং বহুদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে রেখেছে। বৈঠকে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে ভুল সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
তবে ট্রাম্প পরিস্থিতিকে অতটা ভয়াবহ হিসেবে দেখছেন না। ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শি জিনপিং যুদ্ধ চান না বলেই তার বিশ্বাস। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতি যেমন আছে তেমন থাকলে চীনও তাতে আপত্তি করবে না।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আজ এক বিবৃতিতে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দ্বীপটি ইতোমধ্যেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণের হাতে। তারা আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কাঠামোর অংশ।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং তে- আগেও একাধিকবার বলেছেন, তাইওয়ানকে নতুন করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে না, কারণ তারা বাস্তবিক অর্থেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এই অবস্থানের বিপরীতে ওয়াশিংটনের নীতি বরাবরই কিছুটা জটিল। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিং সরকারকেই চীনের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে না। আবার একই সঙ্গে মার্কিন আইনে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনকে একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়, অন্যদিকে তাইপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখতে হয়।
সম্প্রতি তাইওয়ানের পার্লামেন্ট প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর বড় একটি অংশ ব্যয় হবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্র কেনায়। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনও তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের রকেট লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং।
ট্রাম্প এখন বলছেন, অস্ত্র চুক্তিটি কার্যকর হবে কি না সে বিষয়ে তিনি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ বিষয়ে তাইওয়ানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যও ওয়াশিংটনের প্রচলিত অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন বার্তা বহন করছে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. লিন চিয়া-লুং বলেছেন, বেইজিংয়ের বাড়তে থাকা সামরিক চাপই বর্তমানে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ। তার অভিযোগ, চীন ধারাবাহিক সামরিক মহড়া ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সতর্ক বার্তা, বেইজিংয়ের কড়া অবস্থান এবং তাইপের পাল্টা সার্বভৌমত্বের ঘোষণা—তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এখন নজর থাকবে, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ভারসাম্য কতটা ধরে রাখতে পারে এবং বেইজিং-তাইপে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
2.png)